চীনের স্টার্টআপ ডিপসিক শুক্রবার নতুন একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল উন্মোচন করেছে, যার ব্যয় ‘নাটকীয়ভাবে কমানো’ হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এক বছরেরও বেশি সময় আগে স্বল্পমূল্যের একটি রিজনিং সিস্টেম দিয়ে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি, যা সক্ষমতার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছিল।
এআই প্রতিযোগিতা চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র করেছে। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউস অভিযোগ করে, চীনা সংস্থাগুলো বৃহৎ পরিসরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি চুরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে বেইজিং এ অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
হাংঝৌভিত্তিক ডিপসিক গত বছরের জানুয়ারিতে তাদের আর১ রিজনিং মডেলচালিত জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট দিয়ে আলোচনায় আসে, যা কৌশলগত এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য নিয়ে ধারণাকে নাড়িয়ে দেয়।
উইচ্যাটে দেওয়া এক বিবৃতিতে ডিপসিক জানিয়েছে, তাদের ডিপসিক-ভি৪ মডেলে রয়েছে ‘অতি-দীর্ঘ কনটেক্সট’ সুবিধা। এক্সে দেওয়া পৃথক ঘোষণায় এটিকে ‘বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়… যেখানে কম্পিউট ও মেমোরি ব্যয় নাটকীয়ভাবে কমানো হয়েছে’ বলে উল্লেখ করা হয়।
এ মডেলটি এক মিলিয়ন ‘টোকেন’—অর্থাৎ শব্দ বা যতিচিহ্নের মতো ক্ষুদ্র টেক্সট উপাদান—সমর্থন করে, যা গুগলের জেমিনির সমতুল্য। কনটেক্সট দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করে একটি মডেল কতটা ইনপুট গ্রহণ করে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।
নতুন সিস্টেমটি দুটি সংস্করণে এসেছে—ডিপসিক-ভি৪-প্রো এবং ডিপসিক-ভি৪-ফ্ল্যাশ। এর মধ্যে ফ্ল্যাশ সংস্করণটিকে ছোট প্যারামিটারের কারণে ‘আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী’ বলা হয়েছে।
‘বিশ্বজ্ঞান’—যা রিজনিং সক্ষমতার একটি মানদণ্ড—এর ক্ষেত্রে ভি৪-প্রো কেবল সর্বশেষ জেমিনি মডেলের পেছনে রয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। ওপেন-সোর্স এ মডেলের একটি ‘প্রিভিউ সংস্করণ’ ইতোমধ্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সংস্করণ প্রকাশের সময়সীমা জানানো হয়নি।
টার্নিং পয়েন্ট
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভি৪-এর আগমন হার্ডওয়্যার দক্ষতা ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে একটি ‘টার্নিং পয়েন্ট’ নির্দেশ করে। বিশ্লেষক ঝাং ই বলেন, ‘দীর্ঘ কনটেক্সট ব্যবহারে যে ধীরগতি ও উচ্চ ব্যয়ের সমস্যা ছিল, তা এ মডেল সমাধান করেছে—যা শিল্পখাতের জন্য প্রকৃত টার্নিং পয়েন্ট।’
তিনি আরও বলেন, ‘শেষ ব্যবহারকারীদের জন্য এটি ব্যাপক সুবিধা নিয়ে আসবে। যেমন, অতি-দীর্ঘ কনটেক্সট যদি মানদণ্ড হয়ে যায়, তবে দীর্ঘ টেক্সট প্রক্রিয়াকরণ উচ্চমানের গবেষণাগার থেকে বেরিয়ে মূলধারার বাণিজ্যিক ব্যবহারে চলে আসবে’।
ডিপসিক জানায়, ভি৪-প্রো মডেলে ১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন প্যারামিটার রয়েছে, আর ভি৪-ফ্ল্যাশে রয়েছে ২৮৪ বিলিয়ন প্যারামিটার—যা সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায়। ক্লাউডকোড, ওপেনক্ল, ওপেনকোড ও কোডবাডির মতো এআই এজেন্ট টুলের জন্যও মডেলটি অপটিমাইজ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, হুয়াওয়ের তৈরি চিপেও এ মডেল চালানো সম্ভব। জাতীয় নিরাপত্তা উদ্বেগে ২০১৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা হুয়াওয়ে বলেছে, তাদের অ্যাসেন্ড সুপারপড পণ্য ভি৪ সিরিজকে সমর্থন করে।
এআই শিল্প বিশ্লেষক ম্যাক্স লিউর মতে, ডিপসিকের এ সর্বশেষ উন্মোচন চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি ‘মাইলফলক’।
তিনি এএফপিকে বলেন, ‘এটি পুরো দেশীয় এআই শিল্পের জন্য ভালো। এটি ব্যবহারকারীদের জন্য আরও উন্নত মডেল দেবে এবং আমরা আরও বেশি পণ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার দেখতে পাব’।
তিনি আরও বলেন, ‘যদি নতুন মডেলটি পশ্চিমা শীর্ষ সিস্টেমগুলোর সমকক্ষ হয়, তবে এটি ডিপসিকের প্রথম আত্মপ্রকাশের মতোই চমকপ্রদ হবে’।
স্পুটনিক মুহূর্ত
গত বছরের তথাকথিত ‘ডিপসিক শক’ এআই-সম্পর্কিত শেয়ারে বিক্রি বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যবসায়িক কৌশল পুনর্বিবেচনায় বাধ্য করে—যাকে কেউ কেউ শিল্পখাতের জন্য ‘স্পুটনিক মুহূর্ত’ হিসেবে আখ্যা দেন।
চ্যাটবটটি চ্যাটজিপিটি ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শীর্ষ সেবার সমতুল্য পারফরম্যান্স দেখালেও এটি তৈরিতে তুলনামূলকভাবে অনেক কম কম্পিউটিং শক্তি প্রয়োজন হয়েছিল।
তবে এর দ্রুত উত্থান ডেটা গোপনীয়তা ও সেন্সরশিপ নিয়ে উদ্বেগও তৈরি করে। বিশেষ করে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন দমন-পীড়নের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে চ্যাটবটটি প্রায়ই অস্বীকৃতি জানাত।
এরপর থেকে ডিপসিকের এআই টুলগুলো চীনের বিভিন্ন পৌরসভা, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাতসহ নানা ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে—যার পেছনে আংশিক কারণ তাদের ওপেন-সোর্স নীতি, যা ওপেন এআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের মালিকানাভিত্তিক মডেলের বিপরীত।
আগামী মাসে বেইজিংয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য বৈঠকের আগে এ সর্বশেষ উন্মোচনটি এলো।
এক্সে দেওয়া পোস্টে মাইকেল ক্রাটসিওস বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রমাণ আছে যে, বিদেশি সংস্থাগুলো, বিশেষ করে চীনে, শিল্প পর্যায়ের ‘ডিস্টিলেশন’ কার্যক্রম চালিয়ে আমেরিকার এআই প্রযুক্তি চুরি করছে।’
ডিস্টিলেশন হলো এআই উন্নয়নের একটি প্রচলিত কৌশল, যার মাধ্যমে ছোট ও আরও দক্ষ মডেল তৈরি করা হয়। তবে চীন এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। এটি চীনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের সাফল্যের বিরুদ্ধে অপবাদমূলক প্রচার’।