আধুনিক অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার কেবল শেয়ার কেনাবেচার স্থান নয়; এটি মূলধন গঠন (Capital Formation), দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, করপোরেট সুশাসন এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিশ্বের যেসব দেশ দ্রুত শিল্পোন্নত হয়েছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকটির উন্নয়নের পেছনে একটি কার্যকর পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে আর্থিক খাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থায়ন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। বিপরীতে পুঁজিবাজারের অবদান এখনও সীমিত। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের বাজার মূলধন (Market Capitalization) সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ৬ থেকে ৭ ট্রিলিয়ন টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে, যা দেশের জিডিপির প্রায় ১৫-১৮ শতাংশের সমান। অথচ ভারতে এই অনুপাত ১২০ শতাংশের বেশি, মালয়েশিয়ায় প্রায় ১০০ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৯০ শতাংশেরও বেশি। এই তুলনা থেকেই স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজার অর্থনীতির প্রকৃত সক্ষমতার তুলনায় এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
অর্থনীতির মৌলিক তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি দেশের সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরের সবচেয়ে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হলো পুঁজিবাজার। অথচ বাংলাদেশের বিপুল সঞ্চয়ের বড় অংশ এখনও জমি, ফ্ল্যাট, স্বর্ণ কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাতে বিনিয়োগ হয়। এসব সম্পদ মূল্যসংরক্ষণে সহায়ক হলেও নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান বা উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে না। একটি কার্যকর পুঁজিবাজার সেই সঞ্চয়কে শিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও উদ্ভাবনী খাতে প্রবাহিত করতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে নানা কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতোমধ্যে দুই লাখ কোটিরও বেশি টাকায় পৌঁছেছে এবং এটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। একই সঙ্গে উচ্চ সুদের হার, কঠোর জামানত নীতি, দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং তারল্য সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে।
এখানেই পুঁজিবাজারের গুরুত্ব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। কারণ, শেয়ারবাজার থেকে সংগৃহীত অর্থ ঋণ নয়; এটি ইক্যুইটি মূলধন। ফলে উদ্যোক্তাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুদসহ অর্থ পরিশোধের বাধ্যবাধকতায় পড়তে হয় না। বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা লাভ-লোকসানের ঝুঁকি যৌথভাবে বহন করে। এই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন ও উদ্ভাবনী বিনিয়োগের জন্য অনেক বেশি উপযোগী। বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে শিল্পায়নের সঙ্গে পুঁজিবাজারের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট, অ্যাপল, অ্যামাজন এবং এনভিডিয়া—সবকটিই প্রাথমিকভাবে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে বিপুল মূলধন সংগ্রহ করে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ও হুন্দাই কিংবা ভারতের রিলায়েন্স, টাটা এবং ইনফোসিসের বিকাশের পেছনেও শক্তিশালী পুঁজিবাজারের বড় অবদান রয়েছে।
ভারতের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে শিক্ষণীয়। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর দেশটি তাদের পুঁজিবাজারকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে গড়ে তোলে। বর্তমানে বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (BSE) এবং ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (NSE) বিশ্বের বৃহত্তম শেয়ারবাজারগুলোর অন্যতম। পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি বাজার মূলধনের এই পুঁজিবাজার ভারতের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতের দ্রুত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশও এখন একই ধরনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যে আগামী বছরগুলোতে বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। শুধু সরকারি ব্যয় বা ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে এই চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। তাই জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পুঁজিবাজারকে স্থান দিতে হবে।
পুঁজিবাজারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠা। কোনো কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হলে তাকে নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ, নিরীক্ষা সম্পন্ন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। ফলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও বিনিয়োগ পরিবেশ অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) এখনও জিডিপির তুলনায় নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। এর পেছনে করপোরেট স্বচ্ছতার সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি নীতিগত অনিশ্চয়তা, অবকাঠামো, ভূমি ও জ্বালানি সমস্যা এবং ব্যবসার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার এসব ক্ষেত্রে আস্থা সৃষ্টির অন্যতম সহায়ক উপাদান হতে পারে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও পুঁজিবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে নতুন শিল্প, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো প্রকল্প এবং উৎপাদন খাতের সম্প্রসারণ অপরিহার্য। আর এসব উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মূলধন, যার অন্যতম কার্যকর উৎস হতে পারে একটি শক্তিশালী পুঁজিবাজার।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশই তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় একটি মাত্র খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, জাহাজ নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সেমিকন্ডাক্টর-সংশ্লিষ্ট শিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিকাশে দীর্ঘমেয়ানির অর্থায়নের প্রয়োজন, যা পুঁজিবাজারের মাধ্যমে আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব চ্যালেঞ্জও কম নয়। ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধস এখনও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে গভীর আস্থাহীনতার জন্ম দেয়। বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, দুর্বল তদারকি, গুজবনির্ভর লেনদেন এবং দুর্বল মৌলভিত্তির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এখনও বাজারের জন্য বড় ঝুঁকি। আরও একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো দেশের বহু বৃহৎ ও লাভজনক কোম্পানি এখনও শেয়ারবাজারের বাইরে রয়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্পন্ন শেয়ারের সরবরাহ সীমিত এবং বাজারের গভীরতাও বাড়ছে না। এই বাস্তবতায় কয়েকটি মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য।
প্রথমত, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-কে আরও স্বাধীন, দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং রিয়েল-টাইম মার্কেট সার্ভেইলেন্স ব্যবস্থা চালু করে বাজার কারসাজি ও ইনসাইডার ট্রেডিং দ্রুত শনাক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বাজার-অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত, দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। custom_id: 1 তৃতীয়ত, বৃহৎ দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী, বহুজাতিক কোম্পানি এবং লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর-প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মাধ্যমে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করতে হবে।
চতুর্থত, করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, ইসলামিক সুকুক এবং এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ড (ETF)-এর মতো বিকল্প আর্থিক পণ্যের বাজার দ্রুত সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের নতুন উৎস সৃষ্টি হয়। পঞ্চমত, বীমা কোম্পানি, পেনশন ফান্ড, প্রভিডেন্ট ফান্ড এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মতো প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ সফল পুঁজিবাজার এই দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের ওপর নির্ভর করেই স্থিতিশীলতা অর্জন করেছে।
ষষ্ঠত, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি করতে হবে। গুজব ও ফটকাবাজিনির্ভর সংস্কৃতির পরিবর্তে গবেষণা, তথ্য এবং মৌলিক বিশ্লেষণভিত্তিক বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না; বরং সেই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করার মতো দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে। ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য হলেও এককভাবে শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং উচ্চ আয়ের অর্থনীতিতে উত্তরণের প্রয়োজনীয় মূলধন জোগান দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে একটি স্বচ্ছ, গভীর, সুশাসনভিত্তিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পুঁজিবাজার।
লেখক: অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক। [email protected]