সময়টা এমন, আমরা যেন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতায় বাস করছি। চোখে যা দেখি, বাস্তবতা তার চেয়ে ভিন্ন। আলো জ্বলছে, কিন্তু অস্থিরতা বাড়ছে। কূটনীতি এগোচ্ছে, কিন্তু আস্থা কমছে।
নারীরা সামনে আসছে, কিন্তু ক্ষমতা পিছিয়ে থাকছে। আর সবকিছুর মাঝখানে একটা অবিরাম শব্দ, যার ভিতরে সত্য ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে।
এই চারটি বিষয় আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। কারণ এগুলো একই সময়ের চারটি স্তর-অর্থনীতি, কূটনীতি, সমাজ এবং মানুষের ভিতরের অবস্থা। একটি অন্যটিকে ব্যাখ্যা করে এবং একটির দুর্বলতা অন্যটির ভিতরে প্রতিফলিত হয়।
১. আলো জ্বলছে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে চাপ জমছে
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে, যেখানে সাফল্য আর সংকট একই সঙ্গে সহাবস্থান করছে। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়িয়েছি, এটি সত্য। কিন্তু সেই সক্ষমতা কি বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ-এই প্রশ্নটাই এখন বড়।
অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যেগুলো পূর্ণ ক্ষমতায় চলছে না। তবু তাদের জন্য অর্থ দিতে হচ্ছে। এই যে সক্ষমতা ভাতা-এটি এখন একটি নীরব আর্থিক চাপ তৈরি করছে, যা সাধারণ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনীতির ভিতরে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বে আটকে গেছে। একদিকে উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, অন্যদিকে আর্থিক চাপ ও চুক্তিগত জটিলতা বেড়েছে আরও দ্রুত। পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (BPDB) আর স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (IPP) মধ্যে যে আর্থিক টানাপোড়েন, সেটি এখন শুধু হিসাবের খাতা নয়-এটি হয়ে উঠছে জাতীয় ঝুঁকি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লে জ্বালানির দাম বাড়ে, ইউরোপে সংঘাত হলে গ্যাসের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এই অবস্থায় একটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো দীর্ঘ মেয়াদে কতটা নিরাপদ, এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব আছে-আমরা কি বিদ্যুৎ খাতকে উন্নয়নের প্রদর্শনী হিসেবে ব্যবহার করেছি, নাকি একটি টেকসই কাঠামো হিসেবে গড়ে তুলেছি? যদি এটি প্রদর্শনী হয়, তাহলে আলো জ্বললেই সাফল্য। কিন্তু যদি এটি কাঠামো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে-এই মডেল কত দিন টিকবে এবং এর দায় কে নেবে?
এই আলো তাই এখন শুধুই আলো নয়-এটি একটি প্রতিশ্রুতি, যা পূরণ করতে হবে। এটি একটি দায়, যা ভবিষ্যতের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এবং এই চাপ নীরব, কিন্তু গভীর। একটি সময় ছিল, যখন ‘লোডশেডিং’ ছিল দৃশ্যমান সংকট। এখন সংকটটা আরও জটিল, এটি অদৃশ্য।
বিদ্যুৎ আছে, কিন্তু তার দাম, ভর্তুকি, ঋণ-সব মিলিয়ে পুরো ব্যবস্থাটাই টেকসই কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। এখানে একটা সূক্ষ্ম বিষয় আছে-লোডশেডিং চোখে দেখা যায়, কিন্তু আর্থিক অস্থিতিশীলতা দেখা যায় না। আর সেই অদৃশ্য সংকটই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা-এসব আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু আমরা যে মডেল তৈরি করেছি-যেখানে আমদানিনির্ভর জ্বালানি, দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল চুক্তি, আর স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান-সেটা কি টেকসই?
একটা সময় আমরা বলতাম, ‘আলো জ্বালাতে হবে।’ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘এই আলো কতদিন ধরে রাখা যাবে?’ হুমায়ূন আহমেদের এক কথার মতো-‘বাড়িতে আলো আছে, কিন্তু শান্তি নেই।’ আমাদের বিদ্যুৎ খাতও যেন তেমন-আছে, কিন্তু নিশ্চিতি নেই।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন-‘আলো আমার আলো, ওগো আলোয় ভুবন ভরা’-কিন্তু আজকের বাস্তবতায় প্রশ্নটা উল্টো-এই আলো কী আমাদের ভবিষ্যৎ ভরছে, না ভবিষ্যৎকে ঋণের অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে?
২. কূটনীতি : ভারসাম্য, না নির্ভরতার নতুন রূপ?
বাংলাদেশ এখন এমন এক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে একাধিক শক্তির প্রভাব। ভারত-ভূগোলের কারণে অপরিহার্য। চীন-অর্থনীতির কারণে আকর্ষণীয়। যুক্তরাষ্ট্র-রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।
এই তিন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা একটি সূক্ষ্ম কাজ। কিন্তু বাস্তবতা হলো-এই ভারসাম্য অনেক সময় ভারসাম্যের মতো মনে হয় না, বরং এক ধরনের চাপের প্রতিক্রিয়া মনে হয়। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক-ঐতিহাসিক, কিন্তু বিতর্কিত। সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য ঘাটতি-এসব বিষয় এখন শুধু রাষ্ট্রের আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ নেই। এগুলো মানুষের অনুভূতির অংশ হয়ে গেছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক অবকাঠামো ও বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সেই সঙ্গে নির্ভরতার প্রশ্নও তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র আবার গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে যা অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর প্রভাব ফেলে। এখানে একটি গভীর সমস্যা তৈরি হয়-রাষ্ট্রের কৌশল আর জনগণের অনুভূতি যখন এক জায়গায় থাকে না, তখন কূটনীতি ভিতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। এবং এখানেই জ্বালানি খাতের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি হয়। আমরা কোথা থেকে জ্বালানি আনছি, কার সঙ্গে চুক্তি করছি-এসব কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত সিদ্ধান্ত। আমাদের কৌশলগত অবস্থান এমন যে আমরা কাউকে বাদ দিতে পারি না, আবার কাউকে পুরোপুরি গ্রহণ করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
এই অবস্থাটা অনেকটা জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে’-কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোথায় ফিরব? কোন শক্তির দিকে? নাকি আমাদের নিজস্ব পথই এখনো তৈরি হয়নি?
এখানেই প্রথম পয়েন্টের সঙ্গে সংযোগ, জ্বালানিনিরাপত্তা আর পররাষ্ট্রনীতি আলাদা নয়।
আমরা কোথা থেকে জ্বালানি আনছি, কাকে চুক্তি দিচ্ছি, কার ওপর নির্ভর করছি সবই কূটনীতির অংশ। অর্থাৎ বিদ্যুৎ খাত এখন আর শুধু বিদ্যুৎ খাত নয়, এটি কূটনীতির অংশ।
আর কূটনীতি এখন শুধু কূটনীতি নয়, এটি অর্থনীতির নির্ধারক।
৩. নারী : দৃশ্যমানতা বনাম ক্ষমতার বাস্তবতা
দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর উপস্থিতি এখন দৃশ্যমান। কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে তারা এখনো প্রান্তিক।
বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব আছে, সংসদে নারী সদস্য-সবই আছে। কিন্তু প্রশ্নটা এখানেই, এই উপস্থিতি কি ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে? বাস্তবতা হলো, নারীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন, কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছেন না। দলীয় কাঠামো, প্রার্থী নির্বাচন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ-সব জায়গাতেই পুরুষতান্ত্রিক প্রভাব রয়ে গেছে।
নেপাল দেখিয়েছে, সংখ্যা বাড়ালেই ক্ষমতা আসে না। পাকিস্তান দেখিয়েছে, পারিবারিক রাজনীতি নারীর অবস্থান নির্ধারণ করে। ভারত দেখিয়েছে, সংসদে উপস্থিতি বাড়লেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র এখনো পুরুষপ্রধান। বাংলাদেশেও একই চিত্র-সংসদে নারী আছেন, কিন্তু ক্ষমতার মূল কাঠামো এখনো তাদের নাগালের বাইরে।
এটি অনেকটা এমন-আপনি দৃশ্যমান, কিন্তু প্রভাবশালী নন। একটি জনপ্রিয় গানের লাইন মনে পড়ে, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’-নারীর ক্ষমতায়নের পথও যেন সেই রকম, চলছে, কিন্তু গন্তব্য এখনো দূরে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, নারীদের জন্য রাজনীতি শুধু রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, এটি সামাজিক সংগ্রামও। তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে বিচার করা হয় ভিন্নভাবে, তাদের ভুলের মূল্য বেশি, এবং তাদের সাফল্যের স্বীকৃতি কম।
এই বাস্তবতায় ক্ষমতায়ন একটি দীর্ঘ পথ-যেখানে উপস্থিতি শুরু, কিন্তু শেষ নয়। এবং এখানেই আগের দুই পয়েন্টের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়-যে রাষ্ট্রে অর্থনীতি অনিশ্চিত, কূটনীতি চাপের-সেখানে ক্ষমতার কাঠামো আরও সংকীর্ণ হয়। আর সেই সংকীর্ণ কাঠামোয় নারীরা আরও পিছিয়ে যায়।
৪. নীরবতা : ক্লান্তি, না নতুন শক্তি?
আজকের পৃথিবীতে শব্দের অভাব নেই। সবাই কথা বলছে, সবাই ব্যাখ্যা দিচ্ছে, সবাই নিজেদের প্রমাণ করতে চাইছে। কিন্তু এই শব্দের ভিড়ে সত্য অনেক সময় হারিয়ে যায়। কখনো কখনো নীরবতা একটি আশ্রয়। এটি দুর্বলতা নয়, এটি এক ধরনের উপলব্ধি।
মানুষ চুপ থাকে যখন সে বুঝে যায়, সবাই শুনতে চায় না। অনেকে শুধু বলতে চায়।
রাজনীতিতেও একই যেখানে ভিত্তি দুর্বল, সেখানে শব্দ বেশি। যেখানে আস্থা কম, সেখানে ব্যাখ্যা বেশি। আমরা প্রায়ই দেখি-সংকট যত বাড়ে, বক্তব্য তত বাড়ে। কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন খুব কম হয়। এই শব্দের ভিতরে অনেক সময় সত্য হারিয়ে যায়।
রাজনীতিতে যেমন যারা সবচেয়ে বেশি চিৎকার করে, তারা অনেক সময় নিজেদের দুর্বলতা ঢাকতে চায়। ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই, যেখানে বারবার প্রমাণ দিতে হয়, সেখানে সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে, আমরা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণকে যত্ন মনে করি, আর অনবরত ব্যাখ্যা করাকে দায়িত্ব মনে করি। কিন্তু প্রকৃত শক্তি এগুলোতে নয়। নীরবতা তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের পরিপক্বতা, যেখানে আপনি আর নিজেকে প্রমাণ করতে চান না, বরং নিজেকে বোঝেন।
শেষ কথা
এই চারটি বিষয়-জ্বালানি, কূটনীতি, নারীর ক্ষমতা, নীরবতা-আলাদা নয়। এগুলো একই বাস্তবতার চারটি স্তর। একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার অবকাঠামোয় নয়, তার সিদ্ধান্তের স্থায়িত্বে।
একটি কূটনীতির সাফল্য শুধু চুক্তিতে নয়, জনগণের আস্থায়। একটি সমাজের অগ্রগতি শুধু উপস্থিতিতে নয়, ক্ষমতায় অংশগ্রহণে। আর একটি মানুষের শক্তি শুধু তার কথায় নয়, তার নীরবতায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই, আমরা কি শুধু দৃশ্যমান সাফল্য তৈরি করছি, নাকি অদৃশ্য স্থিতি তৈরি করছি? কারণ ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে শব্দ থেমে যায়, কিন্তু কাঠামো টিকে থাকে। এবং হয়তো এখন সময় এসেছে, আমাদের একটু থামার, আবার ভাবার, আর নতুন করে বোঝার-যে আলো আমরা জ্বালাচ্ছি, তা কি আমাদের পথ দেখাচ্ছে, নাকি শুধু আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে?
কারণ সত্যিকারের শক্তি অনেক সময় শব্দে নয় নীরব, ধীর, এবং সচেতন সিদ্ধান্তে। আর সেই সিদ্ধান্তই একদিন শব্দের ভিড় পেরিয়ে একটি স্থির, পরিণত এবং টেকসই বাস্তবতার পথ তৈরি করে।
লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ