দুনিয়ার তাবৎ ভাষাই নদীর মতো; তার নিজস্ব উৎস, গতিপথ ও মোহনা নিয়ে নানা গ্রহণ, বর্জন ও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে সময়ের আবর্তনে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনচর্চা, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি ও পারস্পরিক বিনিময়ের মধ্য দিয়েই ভাষা গড়ে ওঠে এবং সমৃদ্ধি লাভ করে। বাস্তবতার আলোকে সামাজিক প্রয়োজনের মুখোমুখি হয়ে তা বাঁক নেয়, প্রয়োজনে বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়, কখনো স্থিতি খুঁজে পায়। ভাষা কোনো যান্ত্রিক বস্তু নয় যে, গবেষণাগারের নকশা অনুযায়ী তাকে নির্মাণ বা প্রতিস্থাপন করা যাবে। ভাষাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সুইস ভাষাতাত্ত্বিক ফার্দিনাঁ দ্য সোস্যুর (১৮৫৭-১৯১৩), যিনি আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের অন্যতম পুরোধা, থেকে শুরু করে আধুনিক সমাজ ভাষাবিদদের (সোসিওলিঙ্গুয়িস্টস) কাজে প্রমাণিত হয়ে যে, ভাষা মূলত সামাজিক চুক্তি ও ব্যবহারের ফল; তার প্রকৃত প্রাণশক্তি মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি দিকও আছে যেখানে ক্ষমতাকেন্দ্রিক শক্তিগুলো নিজেদের ক্ষমতাকে নিষ্কণ্টক ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য বারবার ভাষার এই স্বাভাবিক বিকাশকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। ভাষাকে বিশেষ প্রকৌশলের মাধ্যমে ঢালাই করে তারা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে সাংস্কৃতিক আধিপত্য তথা কালচারাল ও বুদ্ধিবৃত্তিক হেজিমনি, যার লক্ষ্য কেবল যোগাযোগ নয়, নিজেদের অনুকূলে গণমানুষের চেতনার রূপান্তর।

ইতালীয় চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১-১৯৩৭) তার ‘হেজিমনি’ ধারণায় দেখিয়েছিলেন, শাসকগোষ্ঠী কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের বল প্রয়োগ বা দমননীতির মাধ্যমে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে না; বরং আরো গভীর ও স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করে সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, গণমাধ্যম এবং সর্বোপরি ভাষার মাধ্যমে। তার বিশ্লেষণে, আধিপত্যের সবচেয়ে কার্যকর রূপ হলো সেই অবস্থা, যখন শাসিতরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে শাসকের দৃষ্টিভঙ্গিকে নিজের বলে গ্রহণ করে যখন ক্ষমতার ভাষাই সাধারণ মানুষের ‘সাধারণ বুদ্ধি’ (কমনসেন্স) হয়ে ওঠে। এই নীরব মানসিক পরিকাঠামোই হেজিমনির প্রকৃত শক্তি। গ্রামসির ভাষায়, সমাজে একটি ‘নৈতিক-বৌদ্ধিক নেতৃত্ব’ (মোরাল অ্যান্ড ইন্টেল্যাকচুয়াল লিডারশিপ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শাসক শ্রেণি নিজেদের অবস্থান স্থায়ী করে। এখানে ভাষা হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় উপাদান এবং সামাজিক প্রকৌশলের (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) হাতিয়ার। কারণ শব্দচয়ন, পরিভাষা নির্ধারণ, বয়ানের কাঠামো এসবের মধ্য দিয়েই নির্ধারিত হয় কোন বিষয়কে কীভাবে ব্যাখ্যা করা ও দেখা হবে, কোন প্রশ্নকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হবে, আর কোনোটিকে প্রান্তে সরিয়ে রাখা হবে। ভাষা তাই কেবল বাস্তবতার প্রতিবিম্ব নয়; বরং সামাজিক ও ঐতিহাসিক বাস্তবতার নির্মাতা। উদাহরণস্বরূপ, একটি আন্দোলনকে ‘অধিকার দাবি’ না বলে ‘অরাজকতা’ বলা হলে জনমতের প্রতিক্রিয়াই বদলে যায়।

অনুরূপভাবে, একটি প্রতিবাদকে ‘দেশদ্রোহ’ আখ্যা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তার নৈতিক অবস্থান পরিবর্তিত হয়। অর্থাৎ শব্দই ধারণা বা ব্যাখ্যার কাঠামো তৈরি করে, আর সেই কাঠামোই তৈরি করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। এই নির্মাণ-প্রক্রিয়াকে যখন সচেতনভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তখন তা আর স্বাভাবিক ভাষাবিকাশ হিসেবে থাকে না; সেটা হয়ে ওঠে ভাষাপ্রকৌশল। ভাষা-প্রকৌশলের মাধ্যমে তখন শব্দের অভিধানগত অর্থই কেবল বদলায় না; বরং সেটি শব্দের প্রয়োগের সামাজিক অর্থ-বিন্যাসকেও পুনর্গঠন করে। কোন শব্দ গ্রহণযোগ্য, কোনটি সন্দেহজনক, কোনটি নিষিদ্ধ এই সীমারেখা টেনে দিয়ে ক্ষমতা চিন্তার ক্ষেত্রকে সঙ্কুচিত ও নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে সমাজের ভাবনা, ইতিহাসের পাঠ এবং ভবিষ্যতের কল্পনাও সেই নির্ধারিত ভাষিক সীমানার ভেতর বন্দি হয়ে পড়ে। গ্রামসির তত্ত্ব আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, যে সমাজে ভাষা নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা তীব্র হয়, সেখানে আসলে ক্ষমতার লড়াইই চলছে। কারণ ভাষা নিয়ন্ত্রণ মানে চেতনা নিয়ন্ত্রণ; চেতনা নিয়ন্ত্রণ মানে ইতিহাস ও সম্ভাবনার দিকনির্দেশ নিয়ন্ত্রণ। তাই ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে হস্তক্ষেপ কেবল সাংস্কৃতিক ঘটনা নয়; এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা অভিসন্ধিযুক্ত গভীর রাজনৈতিক প্রকল্প।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলা ভাষায় প্রাতিষ্ঠানিক ভাষাপ্রকৌশলের প্রথম বড় প্রয়াসের সূত্রপাত ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ১৮০০ সালে স্থাপিত এই প্রতিষ্ঠানটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রয়োজন মেটাতেই গড়ে ওঠে ভারতীয় ভাষাগুলোয় দক্ষ কর্মচারী তৈরি এবং শাসনকে কার্যকর করা ছিল এর উদ্দেশ্য। বাংলা বিভাগ গঠনের পর সংস্কৃতজ্ঞ প-িতদের তত্ত্বাবধানে যে গদ্যরীতি নির্মিত হতে থাকে, তা বাংলা ভাষার আধুনিকীকরণে অবশ্যই ভূমিকা রাখে; কিন্তু সেই মান নির্ধারণ ছিল নিরপেক্ষ কোনো ভাষাবৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া নয়; বরং ক্ষমতার কাঠামোর ভেতর থেকে পরিচালিত একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী সাংস্কৃতিক বিন্যাস। এই পর্বে যে গদ্যরূপ প্রাধান্য পায়, তা ছিল সংস্কৃতনির্ভর, অলঙ্কারম-িত এবং কৃত্রিমভাবে উচ্চকিত, যা জনসাধারণের কথ্যভাষার সাথে সম্পূর্ণরূপে সম্পর্কহীন হয়ে গড়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসন ও ব্রাহ্মণ্যবাদী পা-িত্য একত্রে এমন এক ভাষারূপ নির্মাণ করে, যা প্রশাসনিক প্রয়োজন ও নতুনভাবে গড়ে ওঠা ‘বাবু কালচারে’র এক বিশেষ সাংস্কৃতিক অভিজাত্যের মানদ- পূরণে সক্ষম হয়েছিল। ভাষাবিজ্ঞানী ও সমাজ-তাত্ত্বিকদের দৃষ্টিতে এটি ছিল ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনের ধারার বাইরে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রূপায়ণ যেখানে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, অভিজাত শ্রেণি (এলিট ক্লাস) তৈরির প্রক্রিয়ায় সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের চিহ্নে পরিণত হয়।

পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে সাহিত্যিক ও শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির সক্রিয় অনুসরণে বাংলা ভাষার এই সংস্কৃতায়ন প্রক্রিয়া আরো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। যাই হোক, এর ফলাফল ছিল দ্বিমুখী। সংস্কৃতপ্রধান গদ্যরীতির প্রচলনের মাধ্যমে একদিকে ‘শুদ্ধ’ ও ‘অশুদ্ধ’ ভাষার বিভাজন তৈরি হয়, যা ভাষাকে নৈতিকতার মানদ-ে বিচার করার প্রবণতা সৃষ্টি করে; অন্যদিকে গড়ে ওঠে এক নতুন ভাষাগত অভিজাত সমাজ (এলিট সোসাইটি), যারা ভাষার ‘অধিকার’ নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করার দাবি তোলে। এই প্রক্রিয়ায় বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী, যাদের কথ্যভাষা ছিল ফারসি-আরবি-উর্দু প্রভাবিত, সহজ ও প্রাকৃতিক ব্যবহারে বিকশিত, ধীরে ধীরে সাংস্কৃতিক প্রান্তিকতায় (কালচারাল মার্জিনালাইজেশন) ঠেলে দেয়া হয়। ভাষা হয়ে ওঠে শ্রেণি ও সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভাজনের সূক্ষ্ম কিন্তু কার্যকর প্রাচীর। এই ভাষাগত বৈষম্য কেবল রুচি বা রীতির প্রশ্ন ছিল না; এটি ছিল সামাজিক স্বীকৃতি ও মর্যাদার প্রশ্ন। যারা সংস্কৃতঘেঁষা সাধুভাষা ব্যবহারে অদক্ষ, তাদেরকে ‘গেঁয়ো’ বা ‘গাইয়্যা’ তকমা দিয়ে অবমূল্যায়ন করা হতো, যা আসলে ভাষার আড়ালে সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করে। ফলে ভাষাপ্রকৌশল এখানে নিরীহ সাহিত্যিক উৎকর্ষের প্রয়াস ছিল না; বরং তা হয়ে ওঠে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বাছাই-প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ক্ষমতার কেন্দ্র নিজের উপযোগী ভাষাকে মানদ-ে পরিণত করে এবং বাকিদের প্রান্তে ঠেলে দেয়।

ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানে বাংলা-মুলুকে, বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বাংলা ভাষায় দ্বিতীয় দফা ভাষাপ্রকৌশল আরো স্পষ্ট রাজনৈতিক রূপ নিয়ে হাজির হয়। এবারের ভাষাপ্রকৌশলের প্রবণতা ছিল দ্বিমুখী। একদিকে ছিল ভারতকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ধারক ও বাহক একদল বুদ্ধিজীবী, যারা উপমহাদেশীয় ‘উচ্চ’ সংস্কৃতির নির্দিষ্ট মানদ-ে বাংলা ভাষাকে ঢালাই করতে আগ্রহী; অন্যদিকে ছিল পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী, যারা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় একতার উপকরণ হিসেবে পুনর্গঠন করতে চেয়েছিল। ফলে ভাষা আর কেবল সাহিত্যিক রীতি বা ব্যাকরণগত মানের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা সরাসরি ক্ষমতার কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক এই ভাষাপ্রকৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালের পরপরই উর্দুকে একক রাষ্ট্রভাষা করার উদ্যোগ এবং ১৯৪৮ সালে গভর্নর জেনারেল হিসেবে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ঢাকায় দেয়া বক্তব্য, যেখানে তিনি ঘোষণা করেন যে উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা, ভাষাকে সরাসরি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীকে রূপ দেয়। তুলনামূলক দৃষ্টিতে দেখা যায়, ভারতসহ দুনিয়ার বহু রাষ্ট্রেই একটি ভাষা ‘লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে প্রশাসনিক সুবিধার্থে; কিন্তু পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে উর্দুকে আরোপের প্রচেষ্টাকে সেই সময়কার বামপন্থি বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের কাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এ অঞ্চলে কেন্দ্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হিসেবে প্রতিভাত হয়। ফলে এ রাষ্ট্রভাষা ভাষানীতিকে একটি সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণ-কৌশল হিসেবে যুক্তি দাঁড় করানো সহজ হয়েছিল।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন যার বেদনাদায়ক চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখি ২১ ফেব্রুয়ারির শহীদদের আত্মদানে। ভাষার অধিকার আদায়ে আত্মাহুতি প্রমাণ করে, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; তা আত্মপরিচয়, মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকারবোধের কেন্দ্র। মাতৃভাষার দাবি রাষ্ট্রভাষার দাবিতে রূপান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে স্বাধিকার আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়, তা ছিল সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সংগ্রাম। ভাষা এখানে প্রতীকে পরিণত হয় অধিকারবঞ্চিত সংখ্যাগরিষ্ঠের সম্মিলিত চেতনার প্রতীক হিসেবে। উনিশ শতকের শুরু থেকে এই ভূখ-ে ভাষা ক্রমশ রাজনীতির মোক্ষম অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। কখনো মানবিকীকরণের নামে, কখনো বা আধুনিকীকরণের নামে ভাষাকে ‘শুদ্ধ’ করার প্রচেষ্টা, কখনো রাষ্ট্রীয় একত্রীকরণের নামে একভাষিকতার আরোপ, আবার কখনো জাতীয়তাবাদের মোড়কে ভাষাকে আবেগীয় সমাবেশের কেন্দ্রে স্থাপন প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার হাতিয়ার হিসেবে। ফলে প্রশ্নটি কেবল কোন শব্দ গ্রহণযোগ্য বা ভাষার প্রকরণে কোন রীতি মান্য এতটুকু নয়; প্রশ্নটি হচ্ছে, কে ভাষার মান নির্ধারণ করবে এবং সেই মান নির্ধারণের মাধ্যমে কাদের কণ্ঠকে কেন্দ্রে আর কাদের কণ্ঠকে প্রান্তে ঠেলে দেয়া হবে।

বিগত জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ব্যবহৃত ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটি নতুন প্রজন্মের মধ্যে অস্বাভাবিক দ্রুততায় জনপ্রিয়তা লাভ করে। এ শব্দবন্ধটির ঐতিহাসিক শিকড় কিন্তু প্রথিত আছে ব্রিটিশ-বিরোধী ঔপনিবেশিক উপমহাদেশে প্রতিরোধ আন্দোলনে, বিশেষত বিপ্লবী চেতনার প্রকাশে। উপমহাদেশে এই স্লেøাগানকে সর্বাধিক পরিচিত করে তুলেছিলেন বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) এবং ‘জিন্দাবাদ’ (দীর্ঘজীবী হোক) এই দুটি শব্দ মিলিয়ে এটি ছিল নিপীড়ন-বিরোধী আকাক্সক্ষার এক প্রতিবাদী সাঙ্কেতিক ভাষা। ফলে শব্দবন্ধটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য কোনো একক রাষ্ট্র বা মতাদর্শে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা উপনিবেশ-বিরোধী ও আধিপত্যবিনাশী সংগ্রামের সামষ্টিক স্মৃতির অংশ। কিন্তু সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এক শ্রেণির রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠী তাদের বয়ানের রাজনীতির ভেতর দিয়ে এই স্লোগানটিকে পাকিস্তানপন্থিতার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। ভাষাতাত্ত্বিক বা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণের বদলে এখানে দেখা যাচ্ছে একটি অর্থ-স্থানান্তর (সেমেন্টিক রিফ্রেইমিং) যেখানে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরোধের প্রতিবাদী উচ্চারণকে নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ভাষাগত ঐতিহ্যের সঙ্গে আটকে ফেলার প্রয়াস চলছে। এ ধরনের বয়ান তৈরির কৌশল নতুন নয়; রাজনৈতিক তত্ত্বে এটি ‘বয়ান নিয়ন্ত্রণ’ (ডিসকোর্স কন্ট্রোল) হিসেবে পরিচিত যেখানে শব্দের অর্থ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনমতের গতিপথ প্রভাবিত করা হয়।

বর্তমানের ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ বিতর্ক ঐতিহাসিকভাবে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং পুরোনো হেজিমনিক প্রবণতার পুনরাবৃত্তি। একটি নির্দিষ্ট শব্দবন্ধের ব্যবহার নিয়ে হঠাৎ করে ময়দান উত্তপ্ত করে তোলা নিছক ভাষাগত শুদ্ধতার অনুসন্ধান নয়; বরং এটি অর্থ-নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষেত্র পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা। ভাষাকে যদি সামাজিক প্রবাহের স্বাভাবিক গতিতে চলতে না দিয়ে ক্ষমতার বলয়ে আটকে রাখা হয়, তবে তা আবারো প্রমাণ করবে ভাষা-প্রকৌশল কখনো নিরপেক্ষ থাকে না; তা শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পরিণতির দিকেই গড়িয়ে যায়। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ইতিহাসে বারবার ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হয়েছে। উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, এমনকি পরবর্তী নানা গণ-আন্দোলনেও এটি ছিল প্রতিরোধের ভাষা তথা অধিকারচেতনার স্লোগান। একটি শব্দবন্ধকে তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল সমকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবদ্ধ করা মানে ভাষার ভেতরে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়াস; যা শাসকের স্বৈরাচারী মনোবৃত্তিরই বহিঃপ্রকাশ। ভাষা-প্রকৌশলে এমন ধারার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হলে ভাষা তখন আর মুক্ত উচ্চারণ কিংবা মুক্তকণ্ঠে বলার স্বাধীনতা (ফ্রিডম অব স্পিচ) থাকে না; গণমানুষের মুখের ভাষা হয়ে ওঠে অনুমোদিত ও অননুমোদিত শব্দের তালিকা। এই প্রবণতা নতুন নয়; অতীতেও আমরা অনেক দেখেছি। ভাষাতত্ত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে বহুবার দেখা গেছে, শব্দের অর্থকে সঙ্কুচিত বা বিকৃত করে রাজনৈতিক বাস্তবতাকে পুনর্নির্মাণ করা হয়।

একটি মৌলিক প্রশ্ন অনিবার্যভাবেই আমাদের সামনে আসে : প্রকৃত অর্থে ভাষা কার? ভাষা কোনো মন্ত্রণালয়ের দাফতরিক সম্পত্তি নয়, কোনো একক মতাদর্শের উত্তরাধিকারও নয়। এটি একটি যুথবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সম্পদ, বিশেষ করে জনগণের সম্মিলিত সৃজন। ভাষা তাদের জীবন, শ্রম, ভালোবাসা, প্রতিবাদ, কান্না ও স্বপ্নের ভেতর দিয়ে কালের আবহে নির্মিত এক চলমান ঐতিহ্য। সমাজ-ভাষাবিজ্ঞানের আলোচনায় ভাষাকে দেখা হয় ‘যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা’ (লিভড এক্সপেরিয়েন্স)-এর অংশ হিসেবে; অর্থাৎ ভাষা কেবল ব্যাকরণ বা শব্দতালিকার সমষ্টি নয়; বরং সামষ্টিক মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, অভিজ্ঞতা ও অভিজ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ। যে জনগণ ভাষা ব্যবহার করে, তারাই শেষ পর্যন্ত ভাষার রূপ নির্ধারণ করে। ইতিহাসে বাংলা ভাষার প্রকৌশলের প্রয়োগ যারা করেছেন, বিশেষ করে ঔপনিবেশিক প্রশাসক, ব্রাহ্মণ্যবাদী প-িত, জাতীয়তাবাদী শিল্পী-সাহিত্যিক কিংবা তথাকথিত সুশীল অভিজাত গোষ্ঠী তারা প্রত্যেকেই ভাষাকে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কখনো শাসনের সুবিধার্থে, কখনো সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায়, কখনো জাতীয় পরিচয়ের একমাত্রিক কাঠামো নির্মাণে। কিন্তু তাদের নির্ধারিত মান কখনো স্থায়ী হয়নি, যদি না সেটি জনগণের দৈনন্দিন ব্যবহার ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে। ভাষার চূড়ান্ত রূপ নির্ধারণ করেছে মানুষের প্রাত্যহিক জীবনচর্যায় তথা হাটে-বাজারে, মাঠে-ঘাটে, কল-কারখানায়, মঞ্চে-ময়দানে, উৎসবে-আন্দোলনে। ফলে আজ যদি গণমানুষের প্রতিরোধের ভেতর দিয়ে ভাষা তার সহজ-সরল, জীবনমুখী রূপে ফিরে যেতে চায়, সেটি কোনো বিচ্যুতি নয়; বরং ভাষার স্বাভাবিক প্রবণতা ও জীবনবাস্তবতায় তার পুনর্জাগরণ।

লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
Email: [email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews