বাংলাদেশের একাডেমিক জগতে পদলেহন, সুবিধাবাদ ও স্বার্থের কাছে বিবেক বিকিয়ে দেওয়ার প্রবণতা যখন ক্রমশ একধরনের ‘নিয়মে’ পরিণত হয়েছে, তখনো কিছু মানুষ নীরবে প্রমাণ করে গেছেন যে শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এটি এক গভীর নৈতিক অঙ্গীকার। এই আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তায়নের সময়েও যাঁদের জনসমক্ষে মানবিকতা, পেশাগত সততা ও আদর্শের ধারকবাহক হিসেবে নির্দ্বিধায় উপস্থাপন করা যায়, তাঁদের সংখ্যা খুবই সীমিত। আমার বিবেচনায়, শিক্ষা-বিজ্ঞানকে বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে দীর্ঘ ও জটিল পথচলা, সেখানে নেতৃত্বদানকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে অল্পসংখ্যক প্রাজ্ঞ শিক্ষকের জীবনগাথা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা জরুরি অধ্যাপক সালমা আকতার (১৯৪৬-২০২৬) তাঁদের অন্যতম।
১৫ই এপ্রিল ২০২৬, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর প্রস্থান কেবল একজন শিক্ষকের তিরোধানের শোক নয়; এটি আমাদের একাডেমিক ও বৌদ্ধিক পরিসরের জন্যও এক গভীর ক্ষতি। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের আদর্শ, কর্ম ও স্মৃতি থেকে যায়। এ যেন অ্যারিস্টটলীয় ‘গুণভিত্তিক নৈতিকতা’ (ভার্চু ইথিক্স)-এরই এক বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে ব্যক্তির চরিত্র ও কর্মই হয়ে ওঠে তাঁর স্থায়ী উত্তরাধিকার। তাঁর অনন্তে যাত্রার এই বেদনাবিধুর সংবাদ শোনার মুহূর্তে স্মৃতির পর্দায় ভেসে ওঠে তাঁর সঙ্গে কাটানো নানা সময়, কথোপকথন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাদান ও নেতৃত্বের অসংখ্য দৃষ্টান্তের কথা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্মের তাৎপর্য তুলে ধরার ক্ষুদ্র প্রয়াস আমার এই লেখাটি।
নানা কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে আমার রয়েছে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও একাডেমিক সংযোগ। এই প্রতিষ্ঠানের বারান্দা, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষকদের কক্ষ, লাইব্রেরি কিংবা ক্যানটিন সব মিলিয়ে যে পরিমাণ সময় আমি সেখানে কাটিয়েছি, তা কেবল আনুষ্ঠানিক শিক্ষার পরিসরে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা ছিল একধরনের বৌদ্ধিক ও মানবিক বিকাশের ক্ষেত্র, সম্পর্কগুলোকে নানা প্রেক্ষাপটে দেখার দুর্লভ অভিজ্ঞতা। এই পরিচিত পরিসরের ভিতরেই আমি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি অধ্যাপক সালমা আকতারকে একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে, যাঁকে আমি ‘আপা’ বলেই সম্বোধন করতাম। তিনি ছিলেন এক বিরল সমন্বয়ের প্রতিমূর্তি : একদিকে গভীর মমতাময়ী শিক্ষক, অন্যদিকে দৃঢ়চেতা, আত্মপ্রত্যয়ী ও নীতিনিষ্ঠ প্রশাসক। তাঁর ব্যক্তিত্বে এই দুই সত্তার যে সুষম সংমিশ্রণ, তা আমাদের একাডেমিক সংস্কৃতিতে সত্যিই বিরল এবং অনুসরণীয়। সালমা আপার কথা মনে পড়লেই প্রথমেই ভেসে ওঠে এক স্নিগ্ধ, মমতাময়ী হাসিমাখা মুখ। তাঁর চোখমুখ, চলনবলন এবং সামগ্রিক ব্যক্তিত্বে ছিল এক বিরল সুষমা। একদিকে ছিল মায়ের নিঃস্বার্থ মমতা, বড় বোনের স্নেহমিশ্রিত সংযমী শাসন এবং অপরদিকে ছিল একজন দক্ষ প্রশাসকের দৃঢ়তা ও আত্মবিশ্বাসের অপূর্ব সমন্বয়। মনোবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘আবেগিক বুদ্ধিমত্তা’ (ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্স) অর্থাৎ নিজের আবেগকে সংযত রেখে অন্যের অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা; তিনি তা স্বাভাবিক সহজাত গুণ হিসেবেই ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি নিঃশব্দে, আড়াল থেকে অন্যের পাশে দাঁড়াতে জানতেন; প্রচারের আলো নয়, সামষ্টিক কল্যাণই ছিল তাঁর কাজের প্রকৃত প্রেরণা। আমার ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তিনি যে আন্তরিক সহায়তা ও সাহচর্য দিয়েছেন, তা আজও গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। তাঁর এই মানবিক উপস্থিতিই তাঁকে কেবল একজন শিক্ষক বা প্রশাসক নয়, বরং নবীনদের জন্য এক পরম আশ্রয়স্থল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের ইংরেজি শিক্ষাদানের দক্ষতা উন্নয়নে যুক্তরাজ্যের অর্থায়নে পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের আওতায় গবেষণা সহযোগী নিয়োগ, তাঁদের পদ্ধতিগত প্রশিক্ষণ এবং একটি বিশেষায়িত এমফিল প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ ওপেন ইউনিভার্সিটির প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর সঙ্গে যৌথভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের প্রাথমিক প্রেক্ষাপট তৈরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ স্থাপনের দায়িত্বে ছিলাম আমি। কিন্তু অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক জটিলতা, নীতিগত দ্বিধা এবং নানা অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতার কারণে উদ্যোগটি একপর্যায়ে প্রায় ভেস্তে যেতে বসে। ঠিক সেই সংকটময় মুহূর্তে অধ্যাপক সালমা আকতারের বিচক্ষণতা, প্রাতিষ্ঠানিক বোধ এবং দৃঢ় নেতৃত্ব পরিস্থিতিকে নতুন দিশা দেয়। সংগঠন-ব্যবস্থাপনাতত্ত্বে যাকে ‘সংকটকালীন নেতৃত্ব’ (ক্রাইসিস লিডারশিপ) বলা হয়, অর্থাৎ সংকটের মধ্যে স্থির থেকে সমাধানের পথ তৈরি করা, তিনি তা নিঃশব্দ দক্ষতায় বাস্তবায়ন করেছিলেন।
একইভাবে ২০১০ সালের শেষের দিকে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড কম্পারেটিভ এডুকেশন (বিএআইসিই)-এর অর্থায়নে এক দিনের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করতে গিয়ে যখন আরেক ধরনের জটিলতায় পড়ি, তখনো তিনি আড়াল থেকেই উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্র্র্ণ হয়ে সমাধানের পথ তৈরি করে দেন। তাঁর এই নীরব সহায়তা ছিল না কেবল ব্যক্তিগত সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ; বরং তা ছিল একটি বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন-দর্শনের অংশ, যেখানে ব্যক্তি নয়-কাজ, প্রতিষ্ঠান এবং জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে মুখ্য। তাঁর এ ধরনের দায়িত্বপূর্ণ ‘অদৃশ্য নেতৃত্ব’ (ইনভিজিবল লিডারশিপ) আমাদের একাডেমিক পরিসরে বিরল, অথচ শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন, আমি যেন দেশে ফিরে গিয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করে দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করি। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আমাকে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো আইইআর-এ শিক্ষক হওয়ার জন্য আবেদন করতে উৎসাহিত করেছিলেন।
লবিংয়ের কালচার উপেক্ষা করে সালমা আপার সঙ্গে আমার সরাসরি দেখা হয় উপ-উপাচার্য হারুন-অর-রশিদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সেই সাক্ষাৎকার বোর্ডে। কিন্তু সেই দিনটি আমার জীবনে এক তিক্ত অভিজ্ঞতার উদাহরণ হয়ে আছে। একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে সেখানে উপস্থিত হয়ে আমি সেদিন প্রত্যক্ষ করি এক ভিন্নতর বাস্তবতা তথা একাডেমিক জগতের এমন এক কদর্য রূপ, যেখানে মেধা ও যোগ্যতার বিপরীতে শিক্ষার রাজনীতিকরণে শিক্ষক-রাজনীতির বহু বর্ণিল তথা নীল, সাদা ও গোলাপির আলোকচ্ছটায় পক্ষপাতিত্ব, অদৃশ্য প্রভাব এবং সংঘবদ্ধ অপকৌশল কীভাবে নির্লজ্জ ও সক্রিয় ভূমিকা রাখে। সেই প্রেক্ষাপটে আমি দেখেছি, একজন দৃঢ়চেতা, নীতিনিষ্ঠ ও ব্যক্তিত্ববান শিক্ষক হিসেবে সালমা আপা কীভাবে সেই প্রতিকূলতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থেকেও একধরনের অসহায়তার প্রকাশ ঘটাতে বাধ্য হন। এটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ছিল না; বরং আমাদের বৃহত্তর একাডেমিক কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতার প্রতিফলন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জীবনের নানা পর্যায়ে আমি আরও অনেক শিক্ষকের মধ্যে একই ধরনের বেদনাদায়ক অসহায়তা প্রত্যক্ষ করেছি। এই অভিজ্ঞতাগুলো আমার চিন্তা ও চেতনায় গভীর রেখাপাত করেছে।
সমাজবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোকে বলতে গেলে, আমাদের একাডেমিক কালচারের কদর্য উদাহরণগুলো একটি ‘প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়’ (ইনস্টিটিউশনাল ডিকে)-এর লক্ষণ, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার ও নৈতিকতা ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তবে একই সঙ্গে শিখনের প্রক্রিয়ায় এসব অভিজ্ঞতা আমাকে নিরাশ করেনি; বরং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আরও সচেতন করেছে। ‘দিন বদলের কলাকৌশল’ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা এবং তা বাস্তবে প্রয়োগের প্রতি একধরনের নৈতিক দায়বদ্ধতা তৈরি করেছে। আর এর পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালমা আপার মতো শিক্ষকদের প্রভাবই সবচেয়ে গভীর। সে যা-ই হোক, আমার জানামতে, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তিনি পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন সর্বদা যোগ্যতা, সততা ও পেশাগত মানদণ্ডকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি ও কাঠামোর সীমাবদ্ধতা, অদৃশ্য চাপ এবং নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা তাঁর সেই প্রয়াসকে সব সময় সফল হতে দেয়নি। তবু তিনি কখনো নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেননি, কিংবা হতাশ হয়ে থেমে থাকেননি। বরং একধরনের অন্তর্গত দায়বোধ থেকেই তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায় ‘দায়িত্বের নৈতিকতা’ (ইথিক্স অব রেসপনসিবিলিটি) অর্থাৎ দায়িত্ব পালনের নৈতিক দায় তাঁর পেশাগত জীবনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সালে অর্থনীতি ও শিক্ষাপ্রশাসনে মাস্টার্স, ১৯৮০ সালে যুক্তরাজ্যের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন (বর্তমানে ইউনির্ভাসিটি কলেজ লন্ডনের অংশ) থেকে শিক্ষানীতি ও ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স এবং ১৯৯৯ সালে ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষানীতিতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। সুদীর্ঘ ৪১ বছরের কর্মময় জীবনে (১৯৭৩-২০১৪) তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও শিক্ষাপ্রশাসন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদ ছাড়াও নানা গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ার ও সদস্য ছিলেন। পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন কর্মচঞ্চল, প্রাণবন্ত এবং গভীরভাবে দায়বদ্ধ এক মানুষ, যার হৃদয়ে দেশ, মানুষ এবং বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ছিল। আমার গবেষণা, লেখালেখি কিংবা পেশাগত অগ্রগতির খবর পেলেই তিনি আন্তরিক আনন্দ প্রকাশ করতেন খুদে বার্তায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ইমেইলের মাধ্যমে উৎসাহ জোগাতেন। এই ছোট ছোট প্রেরণাগুলোই একজন তরুণ গবেষক বা শিক্ষকের পথচলায় কত বড় শক্তি জোগাতে পারে, তা তিনি গভীরভাবে বুঝতেন। যদিও জীবনের ব্যস্ততা ও ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে গত কয়েক বছরে আমাদের যোগাযোগ কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, তবু তাঁর সেই আন্তরিকতা, স্নেহ এবং নীরব আশীর্বাদ আজও আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে।
♦ লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য