গুজরাটে দাঙ্গা সৃষ্টি করে মুসলমানদের রক্ত ঝরিয়ে আরএসএস- বিজেপির ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে ভারতে হিন্দুত্ববাদী শাসনের স্বপ্নবীজ বপিত হয়েছিল। অযোধ্যায় সাড়ে চারশ বছরের বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে সেখানে রামমন্দির নির্মাণের মাধ্যমে ভারতে পশ্চিমা জায়নবাদিদের ইসলামোফোবিয়া প্রোপাগান্ডা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। শত শত বছর ধরে মুসলমান শাসকদের ঐকান্তিক প্রয়াস এবং হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানের ফলে গড়ে ওঠা ভারত তার বৈচিত্র্যময় ও বহুত্ববাদী সামাজিক-রাজনৈতিক অস্তিত্বের প্রয়োজনে সাংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধারণ করেছিল। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের ঐতিহ্য ও অনিবার্য বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে তারা ধর্মীয় উন্মদনায় ভারতকে পৌরাণিক হিন্দু রাষ্ট্রে পরিনত করতে চায়। সেখানে মুসলমানদেরকে প্রধান প্রতিপক্ষ বানিয়ে সুদুরপ্রসারি নীলনকশা বাস্তবায়ন চলছে। বিজেপি দিল্লীর ক্ষমতা লাভের পর ২০১৯ সালের সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট-এ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল থেকে আসা হিন্দু, খৃষ্টান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈনসহ অন্যসব ধর্মাবলম্বীদের জন্য নাগরিকত্বের বিশেষ বিবেচনা রাখলেও মুসলমানদের জন্য কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। মুসলমানদের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ত্যাগ করে হিন্দুইজমকে ধারণ করতে বলা হচ্ছে। এভাবেই ইসলাম বিদ্বেষ ও হিন্দুত্ববাদের জিগির তুলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বিধান সভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ডঙ্কা বাজানো হচ্ছে। তবে পশ্চিমবঙ্গসহ মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুসিত রাজ্যগুলোতে বিজেপি তেমন সুবিধা করতে না পারায় এবার ভোটের আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার অজুহাত দেখিয়ে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনের (এসআইআর) নামে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে। মুসলমান ভোটাররা স্বাভাবিকভাবেই বিজেপিবিরোধী এবং প্রধানত তৃণমূল কংগ্রেস ও জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থক হওয়ায় মুসলমান জনসংখ্যাবহুল জেলাগুলোই ছিল এসআইআর’র মূল টার্গেট। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলকে হটাতে এই আয়োজনের পর দেখা গেল, মাত্র ৫ ভাগ ভোট বেশি পেয়ে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ২ শতাধিক আসন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করেছে। এর মধ্যে একজনও মুসলমান নেই। অথচ এবারের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গসহ কয়েকটি রাজ্যে বিভিন্ন দল থেকে শতাধিক মুসলমান প্রার্থী বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। তবে চমক দেখিয়েছেন তামিল নাড়ুর ফিল্মস্টার থালাপতি বিজয়। তিনি তামিলাগা ভেট্টি কাজাগাম (টিভিকে) নামের রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেই সর্বধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের নীতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। গতবছর রমজান মাসে চেন্নাইয়ে টিভিকে’র আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক ইফতার মাহফিলে থালাপতি ইসলামিক ধর্মীয় পোশাকে মাথায় টুপি পড়ে ইফতার শেষে নামাজ ও মোনাজাতে অংশগ্রহণ করার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে থালাপতির ইসলাম গ্রহণের গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। থালাপতির পিতা একজন খৃষ্টান, মাতা হিন্দু হলেও নিজে ইসলামিক ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত। তবে তার ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট। তিনি নিজেকে সর্ব ধর্মে বিশ্বাসী বলে দাবি করেন। থালাপতির ধর্মবিশ্বাস যাই হোক, তামিল নাড়–র নির্বাচনী ফলাফল প্রমাণ করেছে, তারা বিজেপির হিন্দুত্ববাদী উন্মাদনার বদলে সর্বধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষেই ভোট দিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী নানা কারণে বাংলাদেশের মানুষের কাছে কুখ্যাতি লাভ করেছিলেন। নন্দীগ্রামের ভূমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলনে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায়ের পাশে থেকে জোরালো ভূমিকা গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি লাইম-লাইটে উঠে এসেছিলেন। তবে ২০২০ সালে তৃণমূল ত্যাগ করে বিজেপিতে যোগ দেয়ার পর তার আসল চেহারা বেরিয়ে আসে। বিশেষত বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের পর শুভেন্দুর বাংলাদেশবিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য শুধু হিংসা ও ঘৃণা ছড়িয়েছে। বিশ্ববরেণ্য বাংলাদেশী নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যথেচ্ছভাবে গালাগাল করেছেন, বাংলাদেশ দখল করে নেয়ার নানাবিধ উস্কানীমূলক বক্তব্য দিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছেন। এসআইআর ফর্মূলায় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পরও শুভেন্দু অধিকারি শুধু চরম মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যই দেননি, মুসলমানদের বাড়িঘর, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও মসজিদ-মাদরাসায় হামলার পেছনে তাঁর উসকানিমূলক বক্তব্যগুলোর দায় অনেক বেশি। শুভেন্দু অধিকারী এখন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী। দায়িত্বের শপথ নেয়ার পর তিনি নিজেকে সবার মূখ্যমন্ত্রী দাবি করে নেতাকর্মী এবং পুলিশ প্রশাসনকে ভদ্র হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, প্রান্তিক জনপদের এক মুসলমান মহিলা শুভেন্দুর কাছে তার বাড়ির পাশের রাস্তা সংস্কারের দাবি জানালে তিনি তাঁকে ধর্ম ত্যাগ করে হিন্দু হওয়ার শর্ত দিয়েছেন। প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়ের পর শুভেন্দু অধিকারী অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য তার সরকার ৬টি বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন; এর মধ্যে বিএসএফ’র জন্য জমি বরাদ্দ এবং বাংলা পুনর্গঠনের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা পুনরুদ্ধার ও পূনর্নির্মাণকে তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে দাবি করেন। মমতা বন্ধ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বিশ্বাস করেন। তাঁর গৃহীত শিক্ষানীতি ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে তার প্রতিফলন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। শ্রী শুভেন্দু অধিকারী কি মুসলমানদের উপর বিজেপির হিন্দুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পুনর্গঠনের উদোগ নিতে যাচ্ছেন? এই প্রশ্নই এখন সামনে চলে এসেছে। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে তিনি মোল্লা-জঙ্গিদের ক্ষমতা দখল বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর কথাবার্তা ও আচরণে হিংসা-উগ্রতা ছাড়া শিষ্টাচার ও সংস্কৃতিবোধের ন্যুনতম প্রকাশ পাওয়া যায়নি। তিনি নাকি বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন করবেন! পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণার সময় বাংলাদেশের ময়মনসিংহে দিপুচন্দ্র দাস নামের একজন সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবক মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মারা যায়। গত দুই বছরে মব সন্ত্রাসের শিকার হয়ে মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা অন্তত কয়েক ডজন। কিন্তু দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকা-কে ধর্মীয় রং চড়িয়ে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী উত্তেজনা ছড়িয়ে হিন্দু ভোটারদের প্রভাবিত করা হয়েছে। গার্মেনট শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে প্রথমে ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগ, অতঃপর গার্মেন্ট কারখানার চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং কথিত উত্তেজিত জনতার হাতে তুলে দিয়ে গণপিটুনির পুরো ঘটনাকেই একটি পরিকল্পিত সাজানো নাটক বলে সন্দেহ করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ভারতের নির্বাচনে এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রং চড়িয়ে প্রচারের যে মহড়া চলেছিল, তা থেকে অনেকে মনে করছেন, এটা বাংলাদেশে থাকা র-এর হিন্দুত্ববাদী এজেন্টদের কোনো ফল্স ফ্ল্যাগ অপারেশন ছিল কিনা! গত এক দশকে বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থানে মন্দিরের প্রতিমা ভাঙচুরের মত ঘটনায় হিন্দু ও ভারত থেকে আসা ব্যক্তিদের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

আমরা সম্পর্কের অনেক কিছুই বদালাতে পারি, কিন্তু প্রতিবেশি বদলাতে পারিনা। সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিবেশির সাথে সম্পর্ক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অপেক্ষাকৃত ছোট প্রতিবেশি দেশগুলোর সাথে ভারতের সাম্প্রদায়িক আধিপত্যবাদী নীতির কারণে দেশটি বিশ্ব মঞ্চে ক্রমেই তার গুরুত্ব হারাচ্ছে। একই কারণে দেশের অভ্যন্তরেও বড় ধরনের সামাজিক-রাজনৈতিক বিভক্তি দেখা দিয়েছে, যা ভারতের সংহতি ও অখ-তার জন্য বড় ধরণের হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। সামাজিক রাজনৈতিকভাবে মুসলমানদের সাথে বৈষম্যমূলক নীতি ও আচরণের প্রভাব ভারতের অভ্যন্তরে এবং প্রতিবেশিদের সাথে কার্যকরভাবে প্রভাব ফেলছে। প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে সমমর্যাদা, সম্প্রীতি ও সহযোগিতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আরবলীগ, জিসিসি ও আসিয়ানের মত আঞ্চলিক সংস্থাগুলো নিজ নিজ অঞ্চলে বাণিজ্য, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত করলেও শুধুমাত্র ভারতের অসহযোগিতা ও আধিপত্যবাদী নীতির কারণে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো সামনে এগোতে পারছে না। বাংলাদেশের আহ্বানে ও মধ্যস্থতায় এক সময়ে আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হলেও ভারতের কারণে তা কোনো কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থায় পরিনত হতে পারেনি। উপরন্ত একই ভূ-প্রকৃতির অংশ হওয়া সত্বেও বড় প্রতিবেশি ভারত ভাটির দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে প্রবাহিত যৌথ বা আন্তর্জাতিক নদ-নদীর প্রবাহের উপর বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের মাধ্যমে পানি আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যের আশি শতাংশই ভারতের অনুকূলে। বাংলাদেশ ভারত থেকে হাজার কোটি ডলারের পণ্য ক্রয় করলেও বাংলাদেশ থেকে ভারতের আমদানি ২ বিলিয়ন ডলারের কম। অন্যদিকে অবৈধ ভারতীয়রা বাংলাদেশ থেকে বছরে অন্তত ৭-৮ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাচ্ছে। ভারত বিশ্বের প্রধান রেমিটেন্স আয়ের দেশ। বাংলাদেশ তাদের রেমিটেন্স আয়ের তৃতীয় বা চতুর্থ উৎস। ভারতের অর্থনীতির জন্য বাংলাদেশ একটা ‘দুধেল গাই’ হলেও তারা বাংলাদেশের সাথে আধিপত্যমূলক নীতি চাপিয়ে অধীনস্থ রাখতে চায়। এরশাদ ও শেখ হাসিনার মতো নেতাদের ক্ষমতায় বসিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে ভারতের করদ রাজ্যে পরিনত করা হয়েছিল। দেশের মানুষ আন্দোলন করে বশংবদ ফ্যাসিস্টের পতন ঘটানোর পর বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারও ভারতীয় ষড়যন্ত্রে যথাযথভাবে কাজ করতে পারেনি। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান ভারতীয় পুতুল ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে দেশের মানুষের চরম ক্ষোভের বিস্ফোরণের বহিঃপ্রকাশ। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অর্ন্তবর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দেশের প্রায় সব সেক্টর থেকে দাবি-দাওয়ার আন্দোলন, হুমকি ও অস্থিতিশীল করে তোলার মাধ্যমে সরকারকে ব্যর্থ করে দেয়ার ষড়যন্ত্র ছিল ওপেন সিক্রেট। একদিকে শুভেন্দুর মত রাজনৈতিক নেতা অন্যদিকে ময়ুখ রঞ্জন ঘোষের মত অপসাংবাদিকের প্রোপাগান্ডা ও মিথ্যাচারের রেশ দুই প্রতিবেশি দেশের সম্পর্কের রাজনৈতিক রসায়নে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। এটা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু ভোটারকে মুসলিম বিদ্বেষী ঐক্য গড়ার মধ্য দিয়ে বিজেপির ক্ষমতা দখলের রাজনৈতিক নাটক হয়ে থাকে, তাদের সে নাটক ব্যর্থ হয়েছে বলা যায়। কারণ, নির্বাচনে জিততে তাদেরকে এসআইআর’র নামে ৯০ লাখ ভোটারকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে হয়েছে। এটা মোট ভোটারের প্রায় ১৫ শতাংশ। এর মধ্যে ৫ শতাংশ হয়তো মৃত, অনাবাসী বা দ্বৈত ভোটার হিসেবে বাদ পড়তে পারে। বাকি ১০ শতাংশ ভোটার মুসলমান এবং সম্ভাব্য তৃণমূল সমর্থক হিসেবে বাদ দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের সাথে বিজেপির ভোটের ব্যবধান ৩০ লাখ বা ৫ শতাংশের কম।

শুধু একটা নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়েই সিএএ বা এসআইআর’র মত পাপের উত্তাপ শেষ হয়ে যাবে না। রাজনৈতিক কারণে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যনীতি কোনো দেশ বা রাজনৈতিক পক্ষের জন্য কখনো ভালো ফল বয়ে আনতে পারেনি। বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মাগা আন্দোলন, নেতানিয়াহুর গ্রেটার ইসরাইল এবং ভারতের অখ- ভারত রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আত্মবিনাশের চুড়ান্ত রূপায়ণ ছাড়া আর কিছুই নয়। মুসলমানরা প্রধান রাজনৈতিক টার্গেট হওয়ায় এই তিনটি দেশই ‘শত্রুর শত্রু মিত্র’ ফর্মূলায় নিজেদের মধ্যে কৌশলগত মৈত্রীর সম্পর্কে আবদ্ধ। ইসরাইল আমেরিকা ইরানে হামলার দুদিন আগে নরেন্দ্র মোদি ইসরাইল সফরে গিয়ে ভারতকে ইসরাইলিদের ফাদারল্যান্ড বলে ঘোষণা করে এসেছিলেন। গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন ও গণহত্যা এবং ইরানের সাথে অন্যায় যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও শুধুমাত্র ভারতের হিন্দুত্ববাদি সরকার ইসরাইলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা ইসরাইলে কর্মী, সেনা, সমরাস্ত্র ও লজিস্টিক সরবরাহ করেছে। পেশী শক্তিতে যত বড়ই হোক, অন্যায়কারী সব সময়ই দুর্বল। গত বছর মে মাসে পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালাতে গিয়ে ভারতের বিমানবাহিনীর সব দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছিল। চারদিনের অপারেশন সিঁদুরের পাল্টায় পাকিস্তান বুনিয়ানুন মারসুস অপারেশন শুরুর চার ঘন্টার মধ্যেই ভারতের রাফাল জেট, এস-ফোর হান্ড্রেড আকাশ প্রতিরক্ষাসহ সব প্রতিরক্ষা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়েছিল। এরপরও ভারতের শুভেন্দুরা বলেছেন, তারা নাকি অপারেশন সিঁদুরে পাকিস্তানকে শিক্ষা দিয়েছে। পঁচিশের জুনমাসে দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেই ইসরাইল-আমেরিকা যৌথ বিমান হামলা করে ইরানের পারমানবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করে দিতে গিয়ে ইরানের মিসাইল হামলায় ইসরাইল-আমেরিকার সামরিক আধিপত্যের মিথ চরমভাবে চপেটাঘাত খেয়ে যুদ্ধবিরতি চাইতে বাধ্য হয়েছিল। এরপর ৬ মাসের প্রস্তুতি শেষে গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে এনে অকস্মাৎ ইরানে ইসরাইল-আমেরিকার যৌথ বিমান হামলা চালিয়ে প্রথম আক্রমণেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম আয়াতুল্লাহ খামেনেইসহ শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে রেজিম চেঞ্জের পরিকল্পনা করেছিল। ইরানের প্রত্যাঘাতে তাদের সেই হামলা বুমেরাং হয়ে নিজেদের ধংস ডেকে এনেছে। প্রায় দুই মাসের যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সা¤্রাজ্যবাদী আধিপত্য হরমুজ প্রণালি ও পারস্যোপসাগরে তলিয়ে গেছে। বর্ণবাদ ও আধিপত্যবাদী নীতি থেকে সৃষ্ট এসব যুদ্ধোন্মাদনার ফলাফল ও পরিনতি থেকে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হলে তাদের অখ- ভারতের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিনত হতে পারে। ভারতের শাসকরা বাংলাদেশের উপর নানামুখী আগ্রাসন চালাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকরা ক্রমাগত অনৈতিক চাপ ও হুমকি দিচ্ছে। বাংলাদেশের উজানে নদনদীগুলোর পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত ও নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশকে মরুভূমিতে পরিনত করার পরিকল্পনার বাস্তবায়ন চলছে। পদ্মা-তিস্তার পানি সমস্যার সমাধান না করেই বরাক উপত্যকায় টিপাইমুখ বাঁধ দিয়ে সুরমা-কুশিয়ারাকে মেরে ফেলতে চাইছে। নদী হত্যার মতো মহাপাপ ভারত সামাল দিতে পারবে না। এখন বরাক উপত্যকায় মণিপুর অশান্ত হয়ে উঠেছে। ওরা স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে। অর্থনৈতিকভাবে ভারত বাংলাদেশের অন্যতম সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের স্বাধীন রাজনীতি, অর্থনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান এখন বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে চিহ্নিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও উদারনৈতিক অবস্থানের বিপরীতে ভারত তার আধিপত্যবাদী নীতি বজায় রাখতে চাইলে তা নিশ্চিতভাবেই তাদের জন্য বুমেরাং হবে। পলাশি থেকে সিপাহী বিদ্রোহ, একাত্তুর থেকে চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত লাখো শহীদ ও হাজারো ওলি-আউলিয়ার রক্ত¯œাত বাংলাদেশ কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির সাথে কখনো আপস করেনি, করবে না।
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews