কোথাও বিদ্রোহী, কোথাও দাঁড়িপাল্লা আবার কোথাওবা হাতপাখা, বরিশাল বিভাগের ২১ নির্বাচনি এলাকার ১৬টিতেই এখন কঠিন লড়াইয়ের মুখে বিএনপি। ভোটের মাত্র একদিন বাকি থাকতে এমনই খবর মিলছে নির্বাচনি এলাকাগুলো থেকে। হাতেগোনা পাঁচটি আসনে জয় নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা নেই ধানের শীষের। বিভাগের ছয় জেলার কোনোটিতেই যেমন একচেটিয়া অবস্থান নেই কোনো দলের, তেমনি ২/১টি জেলায় আসন পাওয়াই যেন কঠিন হয়ে পড়ছে বিএনপির জন্য। তার পরও এখানকার ২১ আসনের সবকটি পাওয়ার আশা বিএনপি নেতাদের। আর জামায়াত বলছে, বৃহস্পতিবারের ভোটেই প্রমাণ হবে যে, জনরায় এখন কোন দিকে।
বরিশাল : ছয়টি নির্বাচনি এলাকা নিয়ে গঠিত এই জেলায় দুটি আসনে অনেকটাই নিশ্চিন্ত বিএনপি। বরিশাল-২ (উজিরপুর-বানারীপাড়া) আসনে সরফুদ্দিন সান্টু আর বরিশাল-৫ (সদর) আসনে মজিবর রহমান সরোয়ার অনেকটাই নির্ভার। বরিশাল-১ (গৌরনদী- আগৈলঝাড়া) আসনে বিএনপির জহিরুদ্দিন স্বপনের সামনে বিপদের ঘণ্টা বাজাচ্ছেন তারই দলের বিদ্রোহী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান। দুই নেতার এই লড়াইয়ে সুযোগ নেওয়ার অপেক্ষায় জামায়াতের কামরুল ইসলাম খান। বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) আসনে বিএনপির সামনে ডবল ঝুঁকি। এরা হলেন জামায়াত সমর্থিত এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং কারাগারে থেকে প্রার্থী হওয়া জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু। বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) আসনে বিএনপির রাজিব আহসানের সাথে লড়ছেন জামায়াতের আব্দুল জব্বার। বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ) আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ে বিএনপির আবুল হোসেন খান, ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এবং জামায়াতের মাহামুদুন্নবী তালুকদার।
ভোলা : বিএনপির ছাড় দেয়া ভোলা-১ (সদর) আসনে বিজেপির (নাজিউর) প্রার্থী ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থর সামনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোস্তফা কামাল। ভোলা-২ (বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) আসনে ধানের শীষের হাফিজ ইব্রাহিমের সহজ জয় কঠিন করে তুলেছেন দাঁড়িপাল্লার ফজলুল করিম। জামায়াত সমর্থিত বিডিপির কেন্দ্রীয় মহাসচিব নিজামুল হক নাঈমের কারণে লড়াই খানিকটা জমলেও শেষ পর্যন্ত জিতে যাওয়ার অবস্থানেই আছেন ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন) আসনে বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ। ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস মিলছে বিএনপির নুরুল ইসলাম নয়ন এবং জামায়াতের মোস্তফা কামালের মধ্যে।
পটুয়াখালী : জেলার চারটি নির্বাচনি এলাকার মধ্যে পটুয়াখালী-১ (সদর) আসনে অনেকটাই বিপদমুক্ত বিএনপির এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী। বাকি তিন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে কঠিন লড়াই লড়তে হচ্ছে বিএনপিকে। পটুয়াখালী-২ (বাউফল) এ বিএনপির শহিদুল আলম তালুকদারের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শক্ত দেওয়াল গড়েছেন জামায়াতের ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে বিএনপির ছেড়ে দেয়া পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে কঠিন লড়াই লড়ছেন বিএনপির বিদ্রোহী হাসান মামুন। পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে বিএনপির এবিএম মোশাররফের সামনে আছেন ইসলামী আন্দোলনের মোস্তাফিজুর রহমান।
বরগুনা : আওয়ামী লীগের নিজস্ব আসন হিসাবে পরিচিত বরগুনা-১ (সদর-আমতলী-কলাপাড়া) আসনে বিএনপির নজরুল ইসলাম মোল্লার শক্ত প্রতিপক্ষ ইসলামী আন্দোলনের মোহাম্মদ অলিউল্লাহ। বরগুনা-২ (বামনা-বেতাগী-পাথরঘাটা) আসনে ধানের শীষের নুরুল ইসলাম মনির সাথে লড়ছেন জামায়াতের ড. সুলতান আহম্মেদ।
পিরোজপুর : মরহুম মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর দুই ছেলে লড়ছেন এই জেলার দু’টি আসনে। পিরোজপুর-১ (সদর-ইন্দুরকানী-নাজিরপুর) আসনে বিএনপির অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী সাঈদীপুত্র মাসুদ সাঈদী। পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া-কাউখালী-নেসারাবাদ) আসনে বিএনপির বিদ্রোহী মাহমুদ হোসেন ভিপি মাহমুদ এবং মরহুম সাঈদীর আরেক ছেলে শামিম সাঈদীর সাথে ত্রিমুখী লড়াই হবে ধানের শীষের সুমন মঞ্জুরের। অবশ্য শেষ পর্যন্ত লড়াইটা বিদ্রোহী আর দাঁড়িপাল্লায় আটকে যেতে পারে বলে বলছেন অনেকে। পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে বিএনপির রুহুল আমিন দুলালের লড়াই হবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী সাবেক এমপি রুস্তুম আলী ফরাজীর সাথে।
ঝালকাঠি : মাত্র দু’টি সংসদীয় আসনের এই জেলায় ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) নির্বাচনি এলাকায় বিএনপির রফিকুল ইসলাম জামালের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়ে আছেন জামায়াতের ফয়জুল হক। তবে ঝালকাঠি-২ (নলছিটি-ঝালকাঠি) আসনে খানিকটা হলেও ভালো অবস্থানে আছেন বিএনপির ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। এখানে তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন জামায়াতের শেখ নিয়ামুল করিম এবং ইসলামী আন্দোলনের ডা. সিরাজুল ইসলাম সিরাজি।
২১ নির্বাচনি এলাকার ১৬টিতে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী থাকলেও বিষয়টি নিয়ে খুব একটা চিন্তিত মনে হয়নি বিএনপি নেতাদের। পরিকল্পিত প্রচারণার মাধমে এসব ছড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। ভোটযুদ্ধে বরিশালের ২১টি নির্বাচনি এলাকাতেই বিএনপি জিতবে আশা করে দলের কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক আ ক ন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘বড় মিছিল মানেই ভোটে জেতা নয়। ভোট তো মানুষের ঘরে ঘরে। বরিশাল অঞ্চল হচ্ছে বিএনপির ভোটের ঘাঁটি। এখানে ১৯টি আসনে জিতবার রেকর্ড রয়েছে ধানের শীষের। ইনশাআল্লাহ এবারও এই অঞ্চলের সবক’টি আসনেই জিতবেন আমাদের প্রার্থীরা।’ জামায়াতে ইসলামী বরিশাল জেলা শাখার রাজনৈতিক সেক্রেটারি অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম খসরু বলেন, ‘কান পাতলেই তো শোনা যায় জনগণ এখন কোন দিকে। ইনসাফের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের যে লড়াই তাতে দেশের সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন রয়েছে। বৃহস্পতিবারের গণরায় প্রমাণ করবে যে, এই অঞ্চলের মানুষ এখন কোন দিকে বা কাদের দিকে। ইনশাআল্লাহ আমাদের সব প্রার্থী জয়লাভ করবেন।’