বিগত কয়েক দশকে আমাদের যান্ত্রিক জীবন ও নগরায়ণ যে গতিতে বেড়েছে, তার চেয়েও দ্রুতগতিতে বেড়েছে একটি অদৃশ্য কিন্তু ভয়াবহ ঘাতক—শব্দ দূষণ। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমরা এক নিরবচ্ছিন্ন কোলাহলের মধ্যে বন্দি। যানবাহনের তীব্র হর্ন, নির্মাণকাজের অবিরাম ঠকঠকানি আর যত্রতত্র লাউডস্পিকারের উচ্চশব্দ—সব মিলিয়ে আমাদের চারপাশ এখন এক অসহনীয় 'শব্দ-সন্ত্রাসে' পরিণত হয়েছে। এমনকি ব্যাটারিচালিত রিকশাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ শব্দের হর্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, মানুষের জন্য সহনীয় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবল । কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের প্রধান সড়কগুলোতে শব্দের মাত্রা প্রায়ই ১১০-১৩২ ডেসিবল পর্যন্ত পৌঁছায়। এই অতিরিক্ত শব্দ কেবল বিরক্তির কারণ নয়, এটি শরীরের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের প্রায় ১১.৭ শতাংশ মানুষ শব্দ দূষণের কারণে শ্রবণশক্তি হারিয়েছে বা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
শব্দ দূষণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, এবং অনিদ্রার মতো সমস্যা প্রকট হচ্ছে । বিশেষ করে শিশুদের ওপর এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। উচ্চ শব্দ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা দেয়, মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং শেখার গতি মন্থর করে ফেলে। এমনকি গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও এটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের সৃষ্টি করে, যা অনাগত সন্তানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
দুই.
অ্যাম্বুলেন্সের বিকট শব্দ
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মূলত জরুরি রাস্তা পাওয়ার জন্য তৈরি করা হলেও, এর অতিরিক্ত উচ্চ শব্দ এবং বিকট আওয়াজ বর্তমান সময়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, যানজটে আটকে থাকা অ্যাম্বুলেন্স নিরুপায় হয়ে টানা সাইরেন বাজাতে থাকে, যা আশপাশের মানুষের জন্য যন্ত্রণাদায়ক হয়ে ওঠে।
অ্যাম্বুলেন্সের শব্দের প্রভাব ও বাঁচার উপায়:
আমাদের যা করণীয়:
১. পথ ছেড়ে দেওয়া: আমরা যদি অ্যাম্বুলেন্স দেখামাত্রই দ্রুত জায়গা করে দিই, তবে চালককে দীর্ঘক্ষণ সাইরেন বাজাতে হবে না।
২. স্মার্ট সাইরেন প্রযুক্তি: উন্নত বিশ্বের মতো অ্যাম্বুলেন্সে এমন সাইরেন ব্যবহার করা প্রয়োজন যা দূর থেকে শোনা যাবে কিন্তু খুব কাছাকাছি থাকা মানুষের কানের ক্ষতি করবে না।
৩. জানালার কাঁচ বন্ধ রাখা: রাস্তায় থাকা অবস্থায় সাইরেনের তীব্র শব্দ থেকে বাঁচতে গাড়ির জানালার কাঁচ বন্ধ রাখা একটি সাময়িক সমাধান হতে পারে।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট বা তার ওপরের পদমর্যাদার কর্মকর্তারা শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী যানবাহনকে ঘটনাস্থলেই ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারেন। আইন প্রয়োগ করে হয়তো কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব, কিন্তু সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা। অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানো এবং শব্দ দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের একটু সচেতনতা পারে আগামী প্রজন্মকে একটি শান্ত ও স্বাস্থ্যকর পৃথিবী উপহার দিতে।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন জরুরি সেবার অন্তর্ভুক্ত হলেও, বর্তমানে শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু আইনি কাঠামো ও বিধিমালা রয়েছে যা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে এ ধরনের শব্দ নিয়ন্ত্রণকে প্রভাবিত করে।
'শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫
জরুরি সেবার ছাড়: বিধিমালা অনুযায়ী, জনস্বার্থ ও জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিস শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণের সাধারণ কড়াকড়ি থেকে অব্যাহতি পায়। এর অর্থ হলো, জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা সাইরেন ব্যবহার করতে পারে।
বাঁচার উপায় ও সচেতনতা:
১. স্মার্ট সাইরেন: বর্তমানে অনেক দেশেই 'লো-ফ্রিকোয়েন্সি' সাইরেন বা 'হাওলার' ব্যবহার করা হয় যা কানের ক্ষতি না করে রাস্তা পরিষ্কার করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশেও এমন প্রযুক্তির দাবি উঠছে।
২. অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার রোধ: রোগী না থাকা অবস্থায় অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বাজানো আইনগত ও নৈতিকভাবে দণ্ডনীয়। এটি কঠোরভাবে নজরদারি করা প্রয়োজন।

তিন.
শব্দ দূষণের কারণে রাজপথে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। দীর্ঘসময় উচ্চ শব্দে থাকার ফলে তাদের শ্রবণক্ষমতা স্থায়ীভাবে কমে যেতে পারে। অনবরত হর্নের শব্দে তারা তীব্র মানসিক অস্থিরতা, বিরক্তি এবং অবসাদে ভোগেন। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী শব্দ দূষণ রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়, যা হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে।
অতিরিক্ত শব্দে কাজের মনোযোগ ব্যাহত হয়, যা অনেক সময় রাস্তায় দুর্ঘটনা বা ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে। এছাড়া মাথাব্যথা, অনিদ্রা এবং পরিপাকতন্ত্রের জটিলতাও দেখা দিতে পারে।
চার.
শব্দ দূষণের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এবং পরিবেশকে বাসযোগ্য রাখতে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক পর্যায়ে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
ব্যক্তিগত পর্যায়ে করণীয়:
সামাজিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে করণীয়:
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করণীয়:
পাঁচ
নতুন বিধিমালা ও আশার আলো
সরকার সম্প্রতি 'শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫' জারি করেছে, যা আগের ২০০৬ সালের বিধিমালার একটি শক্তিশালী সংস্করণ। এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী:
ছয়.
আইন প্রয়োগ করে হয়তো কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব, কিন্তু সামগ্রিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন গণসচেতনতা। অপ্রয়োজনে হর্ন না বাজানো এবং শব্দ দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। আমাদের একটু সচেতনতা পারে আগামী প্রজন্মকে একটি শান্ত ও স্বাস্থ্যকর পৃথিবী উপহার দিতে। সরকার, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে এই নীরব ঘাতকের হাত থেকে আমাদের মুক্তি দিতে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ। [email protected]
এইচআর/জেআইএম