মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন
একটি কথা সবার মুখে মুখে উচ্চারিত। সেটি হলো— বাংলাদেশ অমিত স্বপ্ন ও সম্ভাবনার দেশ। তবে বাংলাদেশের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নিতে হবে বাস্তবধর্মী উদ্যোগ। পরিবর্তন আনতে হবে মন-মানসিকতায় ও আচার-আচরণে, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিভাজন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরমতসহিষ্ণুতা, শ্রদ্ধাবোধ ও ঐক্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। কেননা মাথা যেমন পুরো শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে একটি দেশের সব প্রতিষ্ঠান। রাজনীতিতে সঙ্কট জিইয়ে রেখে কোনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
বাংলাদেশের সামনে যেমন সম্ভাবনা আছে, তেমনি আছে চ্যালেঞ্জও। আগামী দিনে চীন, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের সাথে ব্যবসায় বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তুমুল প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের দিকে বাংলাদেশকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা এ দু’টি দেশের সাথে বাংলাদেশের বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে এ দু’টি দেশ থেকে পণ্য আমদানিতে। তারা বাংলাদেশের বাজার ধরতে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করছে। বাংলাদেশকেও চেষ্টা করতে হবে কিভাবে এ দু’টি দেশে পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ করা যায়। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় বাংলাদেশী বিভিন্ন পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় বাংলাদেশকে ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে হবে। এ ব্যাপারে যা যা সহযোগিতার দরকার ভারতকে তা দিতে হবে বাংলাদেশকে। সহযোগিতা করতে হবে চীনের সাথে ব্যবসায় বাণিজ্য সম্প্রসারণেও। বাংলাদেশকে চীনের বাজারে প্রবেশ করতে হলে ভারত, ভুটান ও নেপালের সহযোগিতা দরকার। তা ছাড়া মিয়ানমার দিয়েও বাংলাদেশ চীনে প্রবেশ করতে পারে।
বাংলাদেশের ‘স্ট্র্যাটেজিক’ সুবিধাগুলো এ অঞ্চলের অর্থনীতির গতি পরিবর্তনের নিয়ামক। রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপমহাদেশ ও এ অঞ্চলের মানচিত্রের দিকে তাকালে এটি স্পষ্ট, সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ ও পূর্ব-এশিয়ার সাথে পশ্চিম এশিয়ার যোগসূত্র স্থাপন করেছে বাংলাদেশ তার অবস্থান দিয়ে। তাই বাংলাদেশকে বলা হয় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগ স্থল। এ জন্যই আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এক বিরাট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশের তিন দিকজুড়ে রয়েছে ভারত। দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার। এর পাশে রয়েছে চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়া। তা ছাড়া আছে ভুটান ও নেপাল। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক দিয়ে প্রতিটি দেশ খুবই সন্নিকটবর্তী। বাংলাদেশ থেকে নেপালের দূরত্ব মাত্র ১৮ মাইল, ভুটানের ৪৫ মাইল ও চীনের ৪০ মাইল। তা ছাড়া বাংলাদেশ সমুদ্র উপকূলবর্তী দেশ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানা শুরু সমুদ্রের জলরাশি দিয়ে। আর এ মহাসমুদ্রই বাংলাদেশকে দিয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। এসব ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই রাজনীতিবিদদের পথ চলতে হবে এবং তৈরি করতে হবে কর্মকৌশল।
আগামী দিনে যে কয়েকটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে উপরের তালিকায় উঠে আসবে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটি দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার। স্ট্র্যাটেজিক দিক দিয়ে চীন ও ভারতের মধ্যস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান। এটি বাংলাদেশের জন্য চমৎকার রাজনৈতিক সুযোগ। এ জন্য বাংলাদেশকে দেখতে হবে ভিন্ন আঙ্গিকে ও ভিন্ন দৃষ্টিতে। চীন, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশসহ দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়ার যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করার প্রবেশদ্বার বাংলাদেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চল। তা ছাড়া ‘সেভেন সিস্টারস’ খ্যাত ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যের প্রবেশদ্বারও বাংলাদেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল। ফলে প্রায় শত কোটি মানুষের ব্যবসায় বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হতে পারে বাংলাদেশের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে।
বাংলাদেশ ছোট কোনো জনপদ নয়; জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের অষ্টম রাষ্ট্র। বিশ্বের প্রতি ৫০ জনের মধ্যে একজন বাংলাদেশী। পরিবর্তিত বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান আরো সুসংহত হয়েছে। চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ আরো বড় বড় দেশ বাংলাদেশের ব্যবসায়িক প্রতিপক্ষ! তৈরী পোশাক শিল্পে বিশ্বে চীনের পরই বাংলাদেশের অবস্থান! জনশক্তি রফতানি ও ওষুধ শিল্পে বাংলাদেশ ভারত-পাকিস্তানের সাথে প্রতিযোগিতা করছে! কাজেই বাংলাদেশের শত্রু এখন চতুর্মুখী। উপরে উঠতে হলে বাংলাদেশকে এসব চিন্তা মাথায় রাখতে হবে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে; সুনিশ্চিত করতে হবে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা। তাহলেই কেবল একটি দেশের অর্থনীতির আকার বড় হতে পারে, দেশটি হতে পারে উন্নত।
বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণ আছে। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ কর্মক্ষম। গত ২০ বছরে প্রায় পাঁচ কোটি উদ্যমী তরুণ যোগ হয়েছে দেশের জনশক্তিতে। কৃষি, শিল্প, জনশক্তি ও বেসরকারি খাত একযোগে এগিয়ে যাচ্ছে, যা একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। বাংলাদেশের তৈরী পোশাক বিশ্বে স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের খ্যাতি অর্জন করেছে। এ শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ স্থানে পৌঁছার গৌরবের অধিকারী। তাছাড়া চা, চামড়া, ওষুধ ও হিমায়িত চিংড়ি রফতানিতেও বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অবস্থান আছে। এসব কোনো কল্পকাহিনী নয়, বাস্তব। আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে, দূরের জিনিস দেখতে হবে; জনশক্তিকে পরিকল্পিতভাবে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে। সর্বোপরি সঙ্ঘাতপূর্ণ, অশান্ত ও হানাহানির রাজনীতি থেকে আসতে হবে বেরিয়ে। রাজনীতিবিদদের মন বড় করতে হবে এবং দৃষ্টি করতে হবে প্রসারিত। অনৈক্য ও বিভেদ-বিভাজনের রাজনীতি ছেড়ে জাতীয় স্বার্থে এক সুরে কথা বলতে হবে। অহমিকা ত্যাগ করে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে, স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে।
লেখক : কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক