ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ ইউরোপকে বিশ্ব মঞ্চে শক্তিশালীভাবে আত্মপ্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এখন সময় এসেছে ইউরোপের একটি ‘শক্তি’ হিসেবে ভূমিকা নেওয়ার।
চীন, রাশিয়া এমনকী এখন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও বাড়তে থাকা হুমকির মুখে ইউরোপ মহাদেশ এক জাগরণী মুহূর্তে আছে বলে ইউরোপীয় পত্রপত্রিকাগুলোতে মন্তব্য করেছেন মাক্রোঁ।
প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “আমরা কি একটি শক্তিতে পরিণত হতে প্রস্তুত? অর্থনীতি ও অর্থায়ন, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা, এবং আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এটিই এখন প্রশ্ন।”
ব্রাসেলসে এ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ সম্মেলন। তার আগে মাক্রোঁ তার বক্তব্যে ইউরোপজুড়ে সম্মিলিত ঋণ (মিউচুয়ালাইজড লোন) নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন।
যাতে শিল্প খাতে বিনিয়োগের জন্য শত শত কোটি ইউরো জোগাড় করা যায়। তিনি বলেন, আমাদের ভবিষ্যৎ ব্যয়- আগামী দিনের ইউরোবন্ডের জন্য- যৌথ ঋণ সক্ষমতা চালু করার সময় এসেছে। সেরা প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য বড় ধরনের ইউরোপীয় কর্মসূচি প্রয়োজন।
এর আগে মাক্রোঁর ধরনের ডাকে জার্মানি ও কয়েকটি দেশের আপত্তি জানিয়েছিল। কারণ, দেশগুলোর ধারণা ছিল, ফ্রান্স নিজেদের অর্থব্যবস্থা সংস্কারে ব্যর্থ হয়ে ইউরোপের কাঁধে আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দিতে চায়।
মাক্রোঁ অবশ্য স্বীকারও করেছেন যে, ফ্রান্সের অর্থনৈতিক মডেল কখনও ভারসাম্যপূর্ণ ছিল না। আর ইউরোপের উত্তরাঞ্চলের কিছু দেশের মতো দায়িত্বশীল কাঠামোও তাদের গড়ে ওঠেনি।
তবে তিনি বলেন, এখন বিশ্ববাজারে ইউরোপীয় দেশগুলোর সম্মিলিত ঋণ গ্রহণের চাহিদা বাড়ছে।
বিশ্ববাজার এখন উত্তেরোত্তর মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা হারাচ্ছে এবং বিকল্প খুঁজছে। তাছাড়া, আইনের শাসনভিত্তিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় আকর্ষণ।
মাক্রোঁ জানান, ২৭ সদস্যের ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতি বছর ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইউরো প্রয়োজন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা, স্বচ্ছ জ্বালানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো খাতে বিনিয়োগের জন্য।
তিনি ইইউ-কে এইসব খাত ও অন্যান্য শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “চীনারা এটি করছে আমেরিকানরাও করছে। ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে উন্মুক্ত বাজার।
“এই দৃষ্টিকোণ থেকে আমি বলছি না যে ইউরোপকে পুরোপুরি সুরক্ষাবাদী হতে হবে। বরং অ-ইউরোপীয়দের ওপর আমরা যে নিয়ম চাপাই না, সেটি আমাদের নিজেদের উৎপাদকদের ওপর না চাপানো উচিত।
মাক্রোঁ আরও বলেন, “আজ ইউরোপ এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, বিশৃঙ্খল বিশ্বের মুখোমুখি। জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, যাকে আমরা চিরকাল নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে বলে ভাবতাম, তাদের কাছ থেকে আর এই নিশ্চয়তা নেই।
“রাশিয়া, যাদের আমাদেরকে চিরকাল সস্তা জ্বালানি দেওয়ার কথা ছিল তারা তিন বছর আগেই তা বন্ধ করেছে। চীন এখন ক্রমেই কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। আজ আমরা ইউরোপীয়রা একা হয়ে পড়েছি।
“তবে আমাদের পাশে আমরা একে অপরেজন আছি। আমরা ৪৫ কোটি মানুষ। এটি বিশাল শক্তি। আমার কাছে ইউরোপের শক্তিতে পরিণত হওয়াটাই ইউরোপীয় অভিযাত্রার পূর্ণতা।
“আমরা যুদ্ধ থামাতে একত্রিত হয়েছি, বাজার গড়তে একসঙ্গে কাজ করেছি। কিন্তু কখনওই নিজেদেরকে একটি শক্তি হিসাবে ভাবিনি।”
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক অচলাবস্থা নিয়ে মাক্রোঁ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইউরোপ যেন বোকা না বনে যায়।
তার কথায়, “একটি সংকট শেষে অনেকেরই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার প্রবণতা দেখা যায়।”
তিনি বলেন, নানারকম হুমকি-ধামকি এবং ভয়ভীতি দেখানোর পর ওয়াশিংটন হঠাৎ করেই সেসব বন্ধ করে দেয়। আর মানুষ ভাবে সব শেষ। কিন্তু এক সেকেন্ডের জন্যও এটি বিশ্বাস করবেন না।
বিডি প্রতিদিন/নাজিম