বড় ধরনের কোনো সংঘর্ষ, সহিংসতা বা অনিয়ম ছাড়া চট্টগ্রামে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জেলার ১৬টি সংসদীয় আসনের কেন্দ্রগুলোতে দিনভর ভোটগ্রহণ চলে। সকাল থেকে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। কোথাও কোথাও নারী ভোটারদের দীর্ঘ লাইনও দেখা গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কেন্দ্রে হিন্দু সমপ্রদায়ের ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে চলে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সবগুলো কেন্দ্রে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভোটগ্রহণ শুরু হয় এবং বড় ধরনের কোনো প্রতিবন্ধকতার খবর পাওয়া যায়নি। দুপুর তিনটা পর্যন্ত চট্টগ্রামের ১৬ আসনে ভোট পড়ে গড়ে ৪১.৭৫ শতাংশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চট্টগ্রাম জুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রায় ৪০ হাজার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, আনসার ও কোস্ট গার্ডের সদস্যদের পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত তৎপর ছিল। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন ছিল। নগর ও জেলার বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, ভোটাররা ধীরে ধীরে কেন্দ্রে এসে এবং শান্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট প্রদান করে। অনেক ভোটার বলেন, তারা নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরে সন্তুষ্ট। নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মতো ছিল। চট্টগ্রাম-১০ আসনের আমবাগান ভোট কেন্দ্রে সুফিয়া বেগম নামে এক নারী ভোটার বলেন, ‘নিজের ভোট নিজে দিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিতে পেরে আমরা আনন্দিত। আমরা চাই ভালো ও যোগ্য মানুষ নির্বাচিত হোক এবং এলাকার উন্নয়ন করুক। তাই কষ্ট হলেও লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছি।’ চট্টগ্রাম-২ আসনের বাবুনগর মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রে আসা পূজা রানী বলেন, দেশের জন্য ভোট দিতে এসেছি। আমরা চাই নিরাপদ একটি রাষ্ট্র হোক। এদিকে, নির্বাচন চলাকালে আনোয়ারা উপজেলায় মোমবাতি প্রতীকের এক প্রার্থীর এজেন্টকে মারধর করে রক্তাক্ত করার অভিযোগ ওঠে ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বিরুদ্ধে। চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের একটি ভোটকেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের তিন সমর্থককে মারধরের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি’র কর্মীদের বিরুদ্ধে। এদিকে সাতকানিয়া উপজেলায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই রেজাল্ট শিটে পোলিং এজেন্টদের স্বাক্ষর নেয়ার অভিযোগে একটি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রত্যাহার করা হয়। একই ধরনের ঘটনায় ফটিকছড়ি উপজেলার পূর্ব সুয়াবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে নির্ধারিত সময়ের আগেই স্বাক্ষর নেয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে নগরের আকবর শাহ থানাধীন একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যাওয়ার সময় ছুরিকাঘাতে মো. নুরুল আফসার (৪৫) নামের এক ভোটার আহত হন। এ ছাড়া বোয়ালখালী উপজেলার একটি ভোটকেন্দ্র থেকে আবু বক্কর (২৫) নামের এক যুবককে আটক করে সেনাবাহিনী। নির্বাচনে অংশ নেয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম-১১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দুপুর ১২টায় উত্তর কাট্টলী মুন্সিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোট প্রদান শেষে সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে চলছে। কোথাও পক্ষপাতমূলক কিছু দেখিনি। বাংলাদেশের মানুষ বিগত ১৮ বছর ভোট দিতে পারেনি। আজকের এই ভোটের পেছনে বহু মানুষের ত্যাগ রয়েছে। অনেক জীবন দিয়েছেন, কেউ গুম হয়েছেন, কেউ খুন হয়েছেন। লাখ লাখ মানুষ মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, জেল খেটেছেন। আজকের এই ভোটের মাধ্যমে দেশের জনগণ তাদের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার ফিরে পাবে।
এর মাধ্যমে আমাদের দেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম-১০ আসনের জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী পাঁচলাইশ বাদুরতলা মডার্ন আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে সকালে নিজের ভোট প্রদান শেষে বলেন, দীর্ঘদিন কাজ করার পর আজ যে সুন্দরভাবে নির্বাচন শুরু হলো, আমি চাই সর্বশেষ মিনিট পর্যন্ত এ পরিবেশ যেন অক্ষুণ্ন থাকে। যাতে আমরা একটা উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচনটা শেষ করতে পারি। সুষ্ঠু নির্বাচনে যেই ফলাফল হবে সেই ফলাফলকে আমরা স্বাগত জানাবো। জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভোটাররা যাতে নিরাপদ ও ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সেজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা রাখা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত প্রচেষ্টায় শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নারী ভোটারদের উৎসবমুখর অংশগ্রহণের কথাও উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বকে আমরা দেখাতে চেয়েছি বাংলাদেশেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম। নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, সার্বিক শান্ত পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই ভোট একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।