বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় কৃষি, কর্মসংস্থান ও সুশাসনÑ এই তিনটি স্তম্ভ পরস্পর নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। একটি শক্তিশালী কৃষি খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সুশাসন সেই সুযোগকে সঠিকভাবে বণ্টন নিশ্চিত করে, আর এদের সমন্বয়ই টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলে। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রেক্ষাপটে এই চারটি উপাদানকে একীভূতভাবে বিবেচনা করা সময়ের দাবি।
দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব এখনও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষি খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১১-১২ শতাংশ অবদান রাখে। একইসঙ্গে, দেশের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। তবে এই খাতের গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও এর প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে এসেছে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষির প্রবৃদ্ধি মাত্র ১.৭৯ শতাংশে নেমে আসে, যা এক দশকের মধ্যে সর্বনি¤œ। এটি কৃষির কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত দেয়। কৃষি খাত শুধু খাদ্যনিরাপত্তা নয়, কর্মসংস্থানেরও প্রধান উৎস। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৩৫ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই নির্ভরতা আরও বেশিÑ প্রায় ৫৩ শতাংশ নারী কর্মসংস্থান কৃষিনির্ভর। ফলে কৃষির উন্নয়ন মানেই গ্রামীণ অর্থনীতির শক্তিশালীকরণ এবং দারিদ্র্য হ্রাস।
তবে বাস্তবতা হলো, কৃষি খাতে কর্মসংস্থান থাকলেও উৎপাদনশীলতা ও আয় এখনও কাক্সিক্ষত পর্যায়ে পৌঁছেনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিএসএস) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ কৃষিজমি অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। এর অর্থ, কৃষিতে কর্মসংস্থান থাকলেও তা অনেক ক্ষেত্রে নি¤œ আয় ও অনিশ্চয়তার সঙ্গে যুক্ত। তাই কৃষিকে লাভজনক ও আধুনিক করতে প্রযুক্তি, বাজারব্যবস্থা ও নীতিগত সহায়তা জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক ‘ফার্মার্স কার্ড’ উদ্যোগ উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে কৃষকদের সরাসরি ভর্তুকি, স্বল্পসুদে ঋণ, বীমা ও ডিজিটাল তথ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে। এমন উদ্যোগ মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে।
কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষিত বেকারত্ব। প্রতি বছর হাজার হাজার কৃষি স্নাতক তৈরি হলেও তাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছে না। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি বিষয়ে স্নাতকদের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ কয়েক বছর পর্যন্ত বেকার বা আংশিক বেকার অবস্থায় থাকে। এটি প্রমাণ করে যে, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অন্যদিকে, শিল্প খাতেও অনিশ্চয়তা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে যা সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য কৃষির পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং দক্ষতা উন্নয়নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এখানে সুশাসনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের দুর্বল সুশাসন, আর্থিক অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দেশের উন্নয়নকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। অর্থাৎ, শুধু উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না, সেগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাও জরুরি। সুশাসন নিশ্চিত না হলে কৃষি ও কর্মসংস্থানে বিনিয়োগের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছায় না। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিতে ভর্তুকি বা ঋণ যদি প্রকৃত কৃষকের কাছে না পৌঁছায়, তবে তা কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। একইভাবে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ যদি দুর্নীতি বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় ব্যাহত হয়, তবে তা টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করবে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের কৃষি ও কর্মসংস্থানের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে প্রায় ২৫ মিলিয়ন কর্মদিবস হারিয়েছে দেশ। এটি শুধু কৃষি উৎপাদন নয়, শ্রম উৎপাদনশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি ও অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। সামগ্রিকভাবে, কৃষি, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের সমন্বিত রূপরেখা বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি কৌশল নেয়া জরুরি। প্রথমত, কৃষির আধুনিকীকরণ, যেখানে প্রযুক্তি, গবেষণা ও বাজারসংযোগ জোরদার করা হবে। দ্বিতীয়ত, দক্ষতা উন্নয়ন, যাতে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি হয়। তৃতীয়ত, সুশাসন নিশ্চিত করা, যাতে নীতিমালা বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকে। চতুর্থত, জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি, যাতে কৃষি ও শ্রমবাজার উভয়ই স্থিতিশীল থাকে।
সমন্বিত রূপরেখাকে কার্যকর করতে নীতিগতভাবে একটি বহুস্তরভিত্তিক ও সমন্বিত কাঠামো জরুরি, যেখানে কৃষি, কর্মসংস্থান ও সুশাসন একই প্ল্যাটফর্মে পরিচালিত হবে। কৃষি নীতিতে উৎপাদনমুখী থেকে বাজারমুখী রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল কৃষি তথ্যব্যবস্থা, সরাসরি কৃষক সহায়তা (ডাইরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফার), ফসল বীমা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে প্রাইস সাপোর্ট মেকানিজম চালু করতে হবে; পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জলবায়ু সহনশীল জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করতে হবে। কর্মসংস্থান নীতিতে ‘স্কিল-লিংকড এডুকেশন’ চালু করে কৃষিভিত্তিক শিল্প, অ্যাগ্রো-প্রসেসিং, স্টার্টআপ ও এসএমই খাতে প্রণোদনা দিতে হবে, যাতে গ্রামীণ যুবকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হয়। সুশাসনের ক্ষেত্রে ই-গভর্ন্যান্স, স্বচ্ছ ক্রয়নীতি, ডেটা-ভিত্তিক মনিটরিং ও সামাজিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভর্তুকি, ঋণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে পৌঁছায়। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় জোরদার করে একটি কেন্দ্রীয় ‘কৃষি-উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান কাউন্সিল’ গঠন করা যেতে পারে, যা নীতি বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন ও সমন্বয় করবে। সর্বোপরি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে তৃণমূল পর্যায়ে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা বাড়ানো হলে এই সমন্বিত রূপরেখা বাস্তবিক অর্থেই টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারবে।
বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পথে। এই উত্তরণকে টেকসই করতে হলে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি, কর্মসংস্থান ও সুশাসনের সমন্বয়ই পারে এই লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে। অতএব, উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারক সবাই একই কাঠামোর অংশ হিসেবে কাজ করবে। তাহলেই বাংলাদেশ একটি টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যেতে পারবে। একটি সৎ, জবাবদিহিমূলক ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে কৃষক সম্মান পাবে, যুবক কাজ পাবে, দারিদ্র্য কমবে এবং শাসনব্যবস্থা হবে স্বচ্ছ ও ন্যায়ভিত্তিক।
লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও সাবেক ন্যাশনাল কনসালটেন্ট, এফএও, জাতিসংঘ।
[email protected]