১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে গড়ে ওঠা 'নতুন ইরানের' ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটি। কিন্তু এ উদ্যাপন এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন দেশটির সরকার ও জনগণ চরম অস্বস্তিকর সময় পার করছে। গত ৪৭ বছরে ইরান যে কয়টি জনবিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছে, এবারকার আন্দোলনটি তাদের মধ্যে একদমই ভিন্ন। রাশিয়া-ইউরোপীয় রাষ্ট্রসমূহের ইউক্রেন যুদ্ধের হিসাব-নিকাশ নিয়ে ব্যস্ততা, ইসরাইল-ফিলিস্তিন অসম যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ভেনিজুয়েলার চলতি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার ও বন্দি, গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ন্যাটো টানাপড়েন—এসব ঘটনার মাধ্যমে বিশ্ববাসী যখন বিশ্বব্যবস্থার নতুন এক রূপ দেখছে, ঠিক সেই সময়ে আগে থেকেই কোণঠাসা ইরানে সরকার ও জনগণ আবারও মুখোমুখি অবস্থানে চলে যায়। এ আন্দোলনে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের ইন্ধন আছে কি না, বা কে কলকাঠি নাড়ছে সেটা এখন সবারই জানা। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, ইরান খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল কর্তৃক পুরোদমে হামলার শিকার হলে মিত্ররা কি তেহরানের পাশে থাকবে?
এ প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের দেখতে হবে ইরানের মিত্র কে বা কারা? ইউরেনিয়াম মজুত, পারমাণবিক বিষয়ক কার্যক্রম, ২০১৫ সালের পি৫+১ চুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদির ফলে ইরানের মিত্র বা বন্ধুত্বের পরিধি ক্রমেই সংকুচিত হয়েছে। কার্যত, রাষ্ট্র হিসেবে রাশিয়া ও চীন ছাড়া ইরানের কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র নেই বললেই চলে। তবে একক রাষ্ট্র ছাড়াও কিছু গোষ্ঠী বা দলের সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক রয়েছে, যেমন—লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ফিলিস্তিনের হামাস। এই রাষ্ট্র এবং গোষ্ঠী বা দল ইরানকে কতটুকু শক্তিশালী করতে পারবে, তা গভীরভাবে ভেবে দেখার বিষয়।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের সুসম্পর্ক বেশি আগের নয়—১৯৯১ সাল থেকে। সে সময় বাণিজ্যিক স্বার্থে রাশিয়া যেসব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে, ইরান তাদেরই একটি। মূলত, স্নায়ুযুদ্ধের সময় রাশিয়া সামরিক শক্তিতে যে অগ্রগতি অর্জন করে, ১৯৯১ সালের পর সেই সামরিক সক্ষমতাকে রাশিয়া ব্যাবসায়িক রূপ দেয়। কারণ তখন তা পুঁজিবাদ বা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিহত করতে ব্যবহারের নীতি থেকে রাশিয়া বের হয়ে আসতে বাধ্য হয় এবং বিশ্বব্যবস্থা একমুখী তথা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক হিসেবে গড়ে ওঠে। ইরানের হাতেও বিকল্প অপশন না থাকায় দেশটি অস্ত্র কেনা শুরু করে রাশিয়ার কাছ থেকে। অর্থাৎ রাশিয়ার কাছে ইরান ক্রমশ হয়ে উঠল সামরিক প্রযুক্তি বা অস্ত্র বিক্রির একটি গন্তব্য।
ব্যাবসায়িক সুসম্পর্ক বজায় থাকলেও প্রায় ৩৫ বছরের সম্পর্কে রাশিয়া কখনো ইরানের কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সরাসরি নিজেকে জড়ায়নি। মূলত, ১৯৯১ সালের পরে ক্রিমিয়া, ইউক্রেন ছাড়া সরাসরি কোনো যুদ্ধে বিশেষ করে কোনো দেশের পক্ষে যুদ্ধে জড়ায়নি মস্কো। তবে ব্যতিক্রম দেখা গেছে শুধু সিরিয়ার ক্ষেত্রে। তবে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সঙ্গে ইরানের বর্তমান যুদ্ধাবস্থার বেশ অমিল পরিলক্ষিত হয়। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে কোনো দেশ সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করেনি; বরং যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য দেশ স্থানীয় গোষ্ঠীকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছে। অপরপক্ষে ইরানে সরাসরি হামলার হুমকি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ওত পেতে আছে ইসরাইলও। সুতরাং এমন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে ইরান যুদ্ধে জড়ালে রাশিয়া তাতে অংশ নিবে না বলেই বিগত কয়েক দশকে রাশিয়ার গতিবিধি থেকে ধারণা করা যায়। সেক্ষেত্রে রাশিয়া তার বাণিজ্যিক মিত্র ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করলেও এমন অসম যুদ্ধে তা ইরানকে কতটুকু শক্তিশালী করবে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থেকেই যায়।
একই সঙ্গে রাশিয়া যেহেতু ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যস্ত সেহেতু তার সামরিক লজিস্টিক নিশ্চয়তা মধ্যপ্রাচ্যের দিকে শিফট করবে না। গত বছরের জানুয়ারিতে স্বাক্ষরিত 'Iranian-Russian Treaty on Comprehensive Strategic Partnership' চুক্তিতে নির্দিষ্টভাবে এমন কোনো সামরিক পদক্ষেপের উল্লেখ করা হয়নি, যার ফলে রাশিয়া ইরানের পাশে দাঁড়াতে বাধ্য হবে। বরং এ দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ৪৭টি অনুচ্ছেদের মধ্যে অসামরিক সহযোগিতা বিষয়ক অনুচ্ছেদই বেশি। সুতরাং হামলার শিকার হলে রাশিয়াকে সরাসরি পাশে পাবে, এমন আশা সম্ভবত করতে পারছে না তেহরান।
তবে চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক বহুদিনের। প্রাচীনকালে চীনের 'সিল্ক রোড' পারস্য তথা ইরানের ওপর দিয়েই ইউরোপ পর্যন্ত যেত। আধুনিক যুগেও চীনের সঙ্গে ইরানের শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। পশ্চিমাদের শত নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরানের অর্থনীতি টিকে থাকার পেছনে রয়েছে চীনের সঙ্গে দেশটির বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ইরানের সঙ্গে চীনের এই সুসম্পর্কের মূলে রয়েছে জ্বালানি সম্পদ—বিশেষত তেল। ইরান বিশ্বের ৬ষ্ঠ তেল উৎপাদনকারী দেশ, যার ৮০ শতাংশ-৯০ শতাংশ তেলই রপ্তানি হয় চীনে। অবশ্য চীন বিশ্বরাজনীতিতেও ইরানকে সক্রিয় রাখতে কৌশলী ভূমিকা পালন করছে। '২৩ সালে ইরানকে নবম দেশ হিসেবে ‘সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও)তে সদস্য পদ দেওয়া হয়। '২৪ সালে ব্রিকস (BRICS) নতুন যে চারটি দেশকে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করে, ইরান তাদেরই একটি। এগুলো চীনের প্রচেষ্টাতেই সম্ভব হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদেও চীন ইরানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বিশ্বস্ত বন্ধুত্বের প্রমাণ দিয়েছে বারবার। অর্থাৎ জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে চীন তাতে ভেটো দেবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইল ইরানে হামলা করলে চীন সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেবে কি না তাতে জোর সন্দেহ রয়েছে।
চীনের সবচেয়ে বৃহৎ সৈন্যবাহিনী থাকলেও তারা বিগত কয়েক দশকে কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি—এমনকি কোনো প্রক্সি যুদ্ধেও না। মূলত, চীন তার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্বার্থ বাস্তবায়নে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় সামরিক শক্তিকে প্রস্তুত রেখেছে বলে ধারণা করা হয়। তবে অনেক বিশ্লেষক বিশ্বাস করেন, বিশ্বব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা থাকলেও চীনের আপাতত বিশ্ব মোড়লের ভূমিকা পালনের ইচ্ছা নেই। যদিও দক্ষিণ চীন সাগরে দেশটির সামরিক কার্যক্রম বেশ চোখে পড়ার মতো। অবশ্য এর মূলে রয়েছে তাইওয়ানকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চীন ঠেকাও' নীতি। তবে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে চীন পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মুখোমুখি অবস্থান নিলেও যুক্তরাষ্ট্র ইরান আক্রমণ করলে চীন প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অবস্থান করবে না বলেই বিশ্বাস করা যায়।
গত এক দশকে রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক শক্তিশালী হয়েছে, এটা সত্য। তিন দেশ মিলে যৌথ সামরিক মহড়াও হয়েছে, এমনকি কিছু চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। কিন্তু পরস্পরের জন্য কোনো যুদ্ধে জড়ানোর মতো সম্পর্ক অন্তত এখনো হয়নি! রাশিয়া তার অস্ত্র বিক্রি করছে, আর চীন কিনছে তেল। অন্যভাবে বলা যায়, ইরান চীনের
কাছে তেল বিক্রি করছে, আর রাশিয়ার কাছ থেকে কিনছে অস্ত্র। দেশ তিনটির মধ্যে শক্তিশালী সামরিক সম্পর্ক তৈরি হতে হয়তো আরো কিছু সময় লাগবে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল তাদেরকে সে সময় দিতে চায় না। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ, হুতি, হামাস যুক্তরাষ্ট্রের হামলা প্রতিরোধে ইরানকে শক্তি জোগানোর পর্যায়ে নেই বলেই অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান। আবার মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশই যেমন ইরানের ওপর হামলাকে সরাসরি সমর্থন করবে না, তেমন ইরানের পক্ষে তারা যুদ্ধেও জড়াবে না। স্বল্প বিকল্পের মধ্যে ইরান তুরস্কের পরোক্ষ সহযোগিতা চাইলেও দেশটিকে অনিশ্চয়তার মধ্যেই থাকতে হবে। বরং, সবকিছুর আগে তুরস্ক নিশ্চয় ইরানের সঙ্গে তার দীর্ঘ সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে ভাববে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বর্তমান সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বলা যায়, 'নাথিং বাট মিডল ইস্ট'ই তার সফট পাওয়ার ব্যবহার করে এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা থামাতে পারে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে সামনে রাখা যেতে পারে, এক. ট্রাম্প হার্ড পাওয়ার ব্যবহার করে তার লক্ষ্য অর্জন করতে চাইলেও এ মুহূর্তে কোনো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চায় না এবং দুই. ইরানের প্রতি ট্রাম্পের দেওয়া কিছু শর্ত মেনে নিলেই এ যুদ্ধ এড়ানো যেতে পারে।
• লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষক