ফেব্রুয়ারির আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন (বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে কয়েকটি স্বাতন্ত্র্য নিয়ে হাজির হয়েছে, যা একদিকে দৃশ্যমান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে পুরোনো কাঠামোর ভেতরেই নতুন ভাষার পুনর্বিন্যাসকে সামনে আনে। নির্বাচনের মাঠে দলগুলোর উপস্থিতি, প্রচারের ভাষা, আন্তর্জাতিক ইঙ্গিত এবং প্রতীকী রাজনীতির ধরন—এবারের স্বাতন্ত্র্যগুলোকে শুধু কৌতূহলোদ্দীপক ব্যতিক্রম হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার অংশ হিসেবে পাঠ করা দরকার। যে দেশে রাজনীতি বারবার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের টানে বাঁক নেয়, সেখানে নতুন নির্বাচন মানেই নতুন রাজনীতি—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। বরং এই নির্বাচন ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায় : দৃশ্যপটে পরিবর্তন যতই থাকুক, শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি, অংশগ্রহণ, ন্যায্যতা ও প্রতিনিধিত্বের মান কি সত্যিই বদলাবে, নাকি কেবল ভাষা ও প্রতীকের চেহারা পালটে একই কাঠামো টিকে থাকবে? সব মিলিয়ে এবারের ভোটকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে। এসব স্বাতন্ত্র্য শুধু নির্বাচনি কৌশলের বিষয় নয়; এগুলো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কোন পথে যাচ্ছে, রাষ্ট্রীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক কীভাবে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে এবং ক্ষমতা টিকে থাকার জন্য কোন কোন প্রভাবকে অপরিহার্য ধরে নেওয়া হচ্ছে, তারও ইঙ্গিত দেয়। এই নির্বাচনকে বোঝার জন্য তাই পাঁচটি পরিবর্তনকে আলাদা করে দেখা জরুরি, আবার পাশাপাশি তাদের পারস্পরিক যোগসূত্রও খেয়াল রাখতে হয়।
প্রথম স্বাতন্ত্র্য হলো — ১৯৮০-এর মধ্য দশকের পর এই প্রথম বড় পরিসরে এমন নির্বাচন, যেখানে রাজনীতির দীর্ঘদিনের দুই প্রধান নারী নেতৃত্ব নির্বাচনি দৃশ্যপটে নেই। একজন সদ্যপ্রয়াত, অন্যজন দেশের বাইরে—এই বাস্তবতা নির্বাচনি মাঠে ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি বড় অধ্যায়কে কার্যত স্থগিত করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের নির্বাচন অনেকটাই দুই নেত্রীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও তাদের দলীয় মেরুকরণের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল; ফলে তাদের অনুপস্থিতিতে ভোটের মাঠে নতুন নেতৃত্ব, নতুন মুখ এবং নতুন জোটের জায়গা তৈরি হওয়ার কথা। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি দিকও স্পষ্ট, এবার নারী প্রার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, ৫ শতাংশেরও নিচে; যা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে একটি উলটো সংকেত। নেতৃত্বের শূন্যতা যতটা আলোচনায়, নারীর অংশগ্রহণের সংকোচন ও ততটাই উদ্বেগজনক বাস্তবতা। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি শুধু প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নয়, প্রতিনিধিত্বের বিস্তৃতিতেও পরিমাপ হয়।
দ্বিতীয় স্বাতন্ত্র্য আরো মৌলিক—স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত—আইনগত দিক থেকে নিবৃত রাখা হয়েছে। ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের ফলে কিছুটা সংকটে পড়লেও ১৯৯০ পরবর্তী নির্বাচনগুলোর রাজনৈতিক কাঠামোতে আওয়ামী লীগ ছিল প্রধান স্তম্ভগুলোর অন্যতম। ফলে একটি বড় দলের অনুপস্থিতি ভোটের প্রতিযোগিতাকে একধরনের 'অসম্পূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা' বা নতুন ধরনের মেরুকরণের দিকে ঠেলে দেয়। সাধারণভাবে বড় দল বাদ পড়লে ভোটার আচরণ, প্রার্থী বাছাই এবং জোটের হিসাব দ্রুত বদলে যায়; একই সঙ্গে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈধতা ও অংশগ্রহণমূলকতার প্রশ্নও সামনে আসে। এ অবস্থায় নির্বাচন শুধু কারা জিতবে তা নয়, বরং রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরোধিতা ও অংশগ্রহণের স্বাভাবিক পথ কতটা খোলা আছে—সেই প্রশ্নও ছায়ার মতো সঙ্গী হয়ে থাকে। রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই অনুপস্থিতি অনেকে দেখছেন 'নতুন যুগের সূচনা হিসেবে, আবার অনেকে দেখছেন প্রতিযোগিতার ভিত্তি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা হিসেবে।
তৃতীয় স্বাতন্ত্র্য হলো নির্বাচনি প্রচারে ধর্মীয় প্রতীকের দৃশ্যমানতা ও ভাষার তীব্র বৃদ্ধি। বাংলাদেশে ধর্ম রাজনীতিতে নতুন নয়; কিন্তু এবার টুপি-পাঞ্জাবি, মাথায় কাপড়, জান্নাতের টিকিট, শিরক, মুফতি—এই ধরনের শব্দ ও চিত্র যেন প্রচারণার কেন্দ্রে আরো বেশি জায়গা করে নিয়েছে। এটি কেবল ধর্মীয় অনুরাগের প্রদর্শন নয়; ভোটারকে নৈতিকভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার একটি কৌশলও হতে পারে—কে ‘সঠিক মুসলমান’, কে ‘ভুল পথে’, কে ‘ধর্ম রক্ষা করবে’—এমন ইঙ্গিত রাজনৈতিক পছন্দকে ধর্মীয় পরিচয়ের সঙ্গে গেঁথে দেয়। ফলে নীতি, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো প্রশ্নগুলো অনেক সময় পেছনে পড়ে যায়, আর সামনে চলে আসে প্রতীকী আনুগত্যের পরীক্ষা। একদিকে ধর্মের কথা আধিক্য পেলেও, অন্যদিকে বক্তৃতা ও কথামালায় ভাষার ক্ষেত্রে বিষাক্ত ভাষা ও আক্রমণাত্মক ভাষার প্রাবল্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তাছাড়া ধর্মের নামে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের শিক্ষা, চাকরি, অধিকার, বাহির পরিসরে তাদের অবস্থান ইত্যাদি প্রশ্নে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, যা দুই নেত্রীর অনুপস্থিতিতে বিরূপ অভিজ্ঞতার সঞ্চার করেছে। এমতাবস্থায়, নির্বাচন যখন নীতির চেয়ে পরিচয়ের প্রতিযোগিতায় ঢুকে পড়ে, তখন সমাজে বিভাজন বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়, কারণ পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি সমঝোতার বদলে শত্রুতা তৈরি করতে বেশি সক্ষম।
চতুর্থ স্বাতন্ত্র্যটি আরো জটিল, কারণ এটি রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের মূলভিত্তিকে স্পর্শ করে—১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এবারের নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ বিশেষভাবে জায়গা পেয়েছে, তবে তা একরৈখিকভাবে নয়। ধর্মভিত্তিক একটি জোট ঐতিহাসিকভাবে ১৯৭১-এর চেতনাকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্র বানায়নি—এমন ধারণা সমাজে প্রচলিত থাকলেও, এবার তারা নির্বাচনি মাঠে ১৯৭১-এর কথাও বলছে। এখানেই রাজনীতির দ্বৈততা দেখা যায় : মুখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষাবলম্বন, কিন্তু একই সঙ্গে গত ৫৫ বছরকে অভিশপ্ত বলে উপস্থাপন করে ১৯৭১-এর অর্জন ও রাষ্ট্র নির্মাণের ধারাবাহিকতাকেও পরোক্ষভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা। অর্থাৎ ১৯৭১ এখানে শুধু গৌরবের স্মৃতি নয়; এটি রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের এক ভাষা, যাকে বিভিন্ন পক্ষ ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। একটি জোটের কথা ও আচরণে মুক্তিযুদ্ধকে অবমূল্যায়নের পাশাপাশি ইতিহাস বিকৃতির চর্চাও দেখা যায়, যেমন স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে নতুন কথামালা ও বিভ্রান্তি। ফলে মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নটি এবার আর শুধু ইতিহাস নয়; এটি বর্তমান ক্ষমতার ন্যায্যতা, রাষ্ট্রের আদর্শিক ভিত্তি এবং নাগরিক পরিচয়ের সংজ্ঞা নির্ধারণের লড়াইয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
পঞ্চম স্বাতন্ত্র্য দেশের সীমানা ছুঁয়ে বাইরে চলে যায়—ভারতবিরোধিতা এবার কার্যত অনুপস্থিত। ১৯৯০-পরবর্তী অনেক নির্বাচনে ভারত প্রসঙ্গ ছিল বড় ইস্যু; বিশেষ করে আওয়ামী লীগকে ভারতের ঘনিষ্ঠ বা পক্ষশক্তি বলে ধরে নিয়ে অন্য দলগুলো ভারতবিরোধিতাকে রাজনৈতিক পুঁজি করেছে। কিন্তু এবার আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় সেই প্রতিপক্ষ-নির্ভর ভারতবিরোধিতার জায়গা সংকুচিত হয়েছে। কোনো জোট বা দল প্রতিপক্ষকে ভারতের দালাল বলে পূর্বের মতো আখ্যা দিচ্ছে না। বরং যে দুটি প্রধান জোট নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তারা উভয়েই আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে ভারতের সমর্থন বা অন্তত সহযোগিতার প্রত্যাশা করছে—এমন বাস্তবতা আলোচনায় এসেছে। এতে বোঝা যায়, কূটনীতি ও ভূরাজনীতির বাস্তব হিসাব রাজনীতির ভাষাকে কত দ্রুত বদলে দিতে পারে; গতকাল যে কথা ভোটে সুবিধা দিত, আজ একই কথা ক্ষতি করতে পারে—সেই হিসাবেই দলগুলো নিজেদের বক্তব্য সাজাচ্ছে।
এই আন্তর্জাতিক মাত্রায় আরো একটি দিক যোগ হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্যের প্রচেষ্টা। অনেক দূরের হলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বাণিজ্য, শ্রম, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে বড় প্রভাব রাখতে পারে—এই ধারণা রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে দীর্ঘদিন ধরেই কাজ করে। এবার ধর্মভিত্তিক একটি জোট যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আছে বলে দাবি করে জনমনে বিশেষ জায়গা নিতে চাইছে—এটি দেখায় যে আন্তর্জাতিক সমর্থনকে ঘরোয়া রাজনীতির বৈধতা তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা কতটা শক্তিশালী। ফলে নির্বাচনি রাজনীতিতে একদিকে ধর্মীয় প্রতীক বাড়ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের বার্তা প্রচারে গুরুত্ব পাচ্ছে—দুই মেরুর এই সহাবস্থান আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও বাস্তবে এটি একই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে : ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নিশ্চয়তা।
এই পাঁচ স্বাতন্ত্র্য একত্রে বলছে, এবারের নির্বাচন এক অর্থে অচেনা মনে হলেও এর ভেতরে পরিচিত কিছু সূত্র কাজ করছে—প্রতীকী রাজনীতি, বৈধতার ভাষা, প্রভাবশালী শক্তির সমীকরণ এবং প্রতিপক্ষ-অনুপস্থিতির ফলে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্মাণ। দুই নেত্রীহীন নির্বাচন নেতৃত্বের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, আবার নারী প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়ায় গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তির ঘাটতিও চোখে পড়ে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি প্রতিযোগিতার মানচিত্র বদলে দিয়েছে, ফলে প্রচারে ধর্ম ও ১৯৭১-এর মতো বড় পরিচয়— রাজনীতির ইস্যু আরো তীব্রভাবে সামনে এসেছে। আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতবিরোধিতার অনুপস্থিতি দেখাচ্ছে, রাজনীতির ভাষা অনেক সময় নীতির চেয়ে সমীকরণ-নির্ভর, যেখানে শক্তির বাস্তবতা বদলালেই স্লোগান বদলে যায়।
বাংলাদেশের নির্বাচন কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়; এটি রাষ্ট্রের পরিচয়, নাগরিকের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ শাসনপদ্ধতির দিকনির্দেশও স্থির করে। তাই এবারের স্বাতন্ত্র্যগুলোকে শুধু কৌতূহলোদ্দীপক ব্যতিক্রম হিসেবে না দেখে, বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রবণতার অংশ হিসেবে পাঠ করা দরকার। যে দেশে রাজনীতি বারবার ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ ও আন্তর্জাতিক সমীকরণের টানে বাঁক নেয়, সেখানে নতুন নির্বাচন মানেই নতুন রাজনীতি—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। বরং এই নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায় : দৃশ্যপটে পরিবর্তন যতই থাকুক, শাসনব্যবস্থায় জবাবদিহি, অংশগ্রহণ, ন্যায্যতা ও প্রতিনিধিত্বের মান কি সত্যিই বদলাবে, নাকি কেবল ভাষা ও প্রতীকের চেহারা পালটে একই কাঠামো টিকে থাকবে।
লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়