বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশের পোশাকে ন্যায্য মূল্য দেয় না বলে যে অভিযোগ আছে, সেই আলোচনায় তিনি এ ধারণার অবতারণা করলেন।
রোববার ‘বাংলাদেশের বস্ত্রশিল্প এবং তৈরি পোশাক খাতের সবুজ রূপান্তর’ শীর্ষক কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কথা বলছিলেন সাবের হোসেন।
তিনি বলেন, “পৃথিবীতে একটা বড় পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে ই-কমার্সের বার্ষিক লেনদেন প্রায় ৫ লাখ কোটি (৫ ট্রিলিয়ন) ডলারের কাছাকাছি। ই-কমার্সের সুবিধা হচ্ছে, যারা মধ্যস্বত্বভোগী আছে, তাদের অনেককেই কিন্তু আমরা বাইপাস করতে পারি।”
বাংলাদেশেও ই-কমার্স বাড়ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বর্তমানে ক্রেতারা শুধু জামার সাইজ, ম্যাটেরিয়াল, ফ্যাশন বা কালার দেখার জন্য স্টোরে যাচ্ছে। এরপর কিন্তু দোকান থেকে আর কিনছে না। তারা বাড়িতে গিয়ে অনলাইনেই অর্ডার করছে।”
দেশের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে সাবেরের পরামর্শ, “আসলে খুচরা ক্রেতারাই হচ্ছে আমাদের ক্রেতা। এখন মধ্যস্বত্বভোগী আমাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে সেই খুচরা ক্রেতার কাছে গিয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করছে। আমাদের পোশাক খাতে বা বাংলাদেশ থেকে যে কোনো পণ্যের কাস্টমারকে ব্র্যান্ড ভাবলে আমার ই-কমার্স উন্নয়ন হবে না।”
মহাখালীতে ব্র্যাক ইন সেন্টারে সুইডেন দূতবাসের সহযোগিতায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত এ অনুষ্ঠান ঢাকায় সুইডেন দূতাবাসের উপপ্রধান ও সুইডেন উন্নয়ন সহযোগিতার প্রধান ক্রিস্টিন জোহানসনও উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম, সাবেক বিকেএমইএ সভাপতি মো. ফজলুল হক এবং শ্রমিক সংগঠন আওয়াজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক নাজমা আক্তার অংশ নেন আলোচনায়।
বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মো. হাতেম বলেন, “ক্রেতারা আমাদের কাছ পণ্য নিয়ে নিয়ে খুচরা যে মূল্যে বিক্রি করছে, তার মাত্র ১৫ শতাংশ আমাদের দিচ্ছে।”
এই তথ্য ধরে সাবের বলেন, আমার কোনো টি শার্ট বাজারে যদি ১০ ডলারে বিক্রি হয়, সেখান থেকে আমরা পাচ্ছি মাত্র দেড় ডলার। আর সাড়ে আট ডলার চলে যাচ্ছে মধ্য মধ্যস্বত্বভোগী কাছে। এটা কখনোই ন্যায্য হতে পারে না।”
এখানে উৎপাদক হিসেবে বাংলাদেশের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ থাকা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এখন আমাদের এই খাতে ওই ১৫ শতাংশ নিয়েই যত বিরোধ, টেনশন। এখন কে কাকে কত কম দিয়ে পার পেতে পারে… আমার মূল জায়গা হচ্ছে এটা।“
সাবের বলেন, বাংলাদেশ যদি পোশাক বিক্রির লাভের ১৫ শতাংশের বদলে ৩০ শতাংশ পেত, তাহলে গতবছরই রপ্তানি আয় ৭০ বিলিয়ন ডলার হয়ে যেত।
“আমরা যদি পোশাকের এই মূল্য নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে এই খাতে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে কম দেওয়ার যে অভিযোগ, এই সমস্যারও সমাধান হয়ে যাবে।”
আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপ সকল ধরনের পণ্যের পরিবেশ বান্ধব উৎপাদন নিশ্চিত করার যে উদ্যোগ নিয়েছে, এর মধ্যে পোশাক শিল্পকে তারা অগ্রাধিকার খাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে বলে জানান সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।
তিনি বলেন, “ওই সময়ে যে কোনো পণ্য পরিবেশ রক্ষা করে উৎপাদনের একটা ফুট প্রিন্ট থাকবে, যাতে ক্রেতা সিদ্ধান্ত নিতে পারে। বায়াররা দাম কম দেওয়ায় আমাদের পোশাক রপ্তানিতে যে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে, এটাকে আমরা কীভাবে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারি, সেই চিন্তা করার সময় আমাদের এসেছে।”
এই সংসদ সদস্য বলেন, “আমরা বাংলাদেশে যে সবুজায়নের স্বপ্ন দেখি, সেটা শুধু পোশাক শিল্প নয়; দেশের সকল শিল্প খাতকেই আমরা সবুজায়ন, অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব করতে চাই।”
অনুষ্ঠানের স্বাগত বক্তব্যে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর আমাদের রপ্তানি বাজারে আমাদের শিল্পায়ন পরিবেশবান্ধব কিনা, এটা আলোচনায় চলে আসবে। তখন আমাদের সুযোগ সুবিধা নির্ভর করবে আমরা কতটুকু পরিবেশবান্ধব বা সবুজ শিল্পায়ন করতে পেরেছি তার ওপর।
“বিশেষ করে আমাদের পোশাক খাতকে পরিবেশবান্ধব করা আমাদের প্রধান কাজ। সবুজ শিল্পায়নের মাধ্যমে এই খাতকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করে তোলার পাশাপাশি ক্রেতা ও ব্র্যান্ডদের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে সেটা অর্জন করা সম্ভব।”
এ বিষয়ে সুইডিশ দূতাবাসের সহযোগিতায় সিপিডি ‘বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাতে সবুজ শিল্পায়ন’ নামে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানান নির্বাহী পরিচালক।
তিনি বলেন, এদেশে পরিবেশবান্ধ, টেকসই ও জলবায়ু নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিকাশ, নারী ও যুব সমাজের জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য।
“এই কর্মসূচির মাধ্যমে সবুজ শিল্পায়নের পথে বাধা বিশ্লেষণ করা, বিদ্যমান আর্থিক কৌশল পর্যালোচনা করা, সবুজ শিল্পায়নের জন্য উপযুক্ত সর্বোত্তম কর্মপন্থাগুলো চিহ্নিত করা, কীভাবে এই শিল্পে সবুজায়নের মধ্য দিয়ে কারখানা, শ্রমিক, অর্থনীতি ও সমাজকে লাভবান ও নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা যায় তা তুলে ধরা হবে।”
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান অনুষ্ঠানে বলেন, বাংলাদেশে এখন ১৫৭টি প্লাটিনাম এবং গোল্ড ক্যাটাগরির পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে। নকশা, পরিবেশ রক্ষা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তাসহ সকল দিক বিবেচনায় রেখে এসব কারখানা নির্মাণ করায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মান নির্ণয়ন প্রতিষ্ঠান এই সার্ফিটিকেট দিচ্ছে। কিন্তু তারপরও ক্রেতোদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্য মিলছে না।
মহামারীর মধ্যে পৃথিবীর ‘সকল পণ্যের’ দাম বৃদ্ধি পেলেও পোশাকের দাম সেভাবে বাড়ছে না বলে তিনি দাবি করেন।
ফারুক হাসান বলেন, “আগের চেয়ে দাম কিছুটা বাড়লেও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় তা সেখানে চলে যাচ্ছে।”
বিকেএমইএ সভাপতি মো. হাতেম বলেন, রানা প্লাজার ঘটনার পরে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের যে বদনাম হয়েছিল, তা ঘোচাতে এদেশের উদ্যোক্তারা এমনভাবে কাজ করেছেন, এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি’ বাংলাদেশে।
“কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পর যে রিটার্ন আসার কথা ছিল, তার ধারেকাছেও নেই বাংলাদেশের পোশাক খাত। ক্রেতারা পণ্যের দাম না বাড়ানোর কারণেই এমনটা হচ্ছে।”
সরকারও এই খাতে সহযোগিতা করছে না অভিযোগ করে তিনি ডাইং মিলের জন্য আমদানি করা রঙসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর আরোপিত কর তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান।