রোজার সময় উচ্চরক্তচাপ বা প্রেসারের ওষুধ খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম পরিবর্তন করতে হয়। কারণ, দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকা এবং পানিশূন্যতা রক্তচাপের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সাধারণত যে নিয়মগুলো অনুসরণ করা উচিত তা দেওয়া হলো-
▶ দিনে একবারের ওষুধ : যদি আপনি দিনে একটি ওষুধ খান, তবে সাধারণত সেটি ইফতারের পর খাবেন। কারণ, ইফতারের পর পর্যাপ্ত পানি পান করার সুযোগ থাকে।
▶ দিনে দুবারের ওষুধ : যারা সকালে ও রাতে ওষুধ খেতেন, তারা সাধারণত সেহরি এবং ইফতারের সময় ওষুধটি ভাগ করে নেবেন।
▶ দিনে তিনবারের ওষুধ : এটি রোজায় পালন করা কিছুটা কঠিন। এ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে ওষুধের ধরন পরিবর্তন করে এমন ওষুধ নিতে হবে যা দীর্ঘক্ষণ শরীরে কাজ করে, যাতে দিনে একবার বা দুবার খেলেই চলে।
* প্রস্রাব বাড়ানোর ওষুধ
যদি প্রেসারের ওষুধটি এমন হয় যা ঘনঘন প্রস্রাব করায় (যেমন- হাইড্রোক্লোরোথায়াজাইড, ফ্রুসেমাইড), তবে সেটি সেহরিতে না খেয়ে ইফতারে খাওয়া ভালো। সেহরিতে খেলে সারা দিন শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
* টিপস
▶ লবণ নিয়ন্ত্রণ : ইফতার বা সেহরিতে অতিরিক্ত লবণাক্ত খাবার, ভাজাপোড়া এবং প্রসেসড ফুড এড়িয়ে চলুন।
▶ পর্যাপ্ত পানি : ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন যাতে শরীরে পানিশূন্যতা না হয়।
▶ রক্তচাপ মাপা : রোজার প্রথম কয়েকদিন নিয়মিত (যেমন ইফতারের ২ ঘণ্টা পর এবং সেহরির আগে) বাসায় প্রেসার চেক করুন। যদি প্রেসার খুব বেশি কমে যায় বা বেড়ে যায়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধের ডোজ অ্যাডজাস্ট করে নিতে হবে।
* সতর্কবার্তা
যদি আপনার মাথা ঘোরে, অতিরিক্ত ক্লান্তি লাগে বা বুক ধড়ফড় করে, তবে তা রক্তচাপ পরিবর্তনের লক্ষণ হতে পারে। এমন অবস্থায় রোজা রাখা চালিয়ে যাবেন কি না, তা নিয়ে চিকিৎসকের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিন।
* ডায়াবেটিক রোগীদের ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
ডায়াবেটিক রোগীদের ওষুধ বা ইনসুলিনের নিয়ম পরিবর্তন করা অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘসময় না খেয়ে থাকার ফলে রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ডায়াবেটিসের ওষুধ ব্যবহারে যেসব পরিবর্তন আনা দরকার তা নিচে দেওয়া হলো-
* মুখে খাওয়ার ওষুধের (ট্যাবলেট) ক্ষেত্রে
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ওষুধ ইফতার ও সেহরিতে ভাগ করে নিতে হয়-
▶ সকালের ওষুধ খাবেন ইফতারির পর। উচ্চমাত্রার গ্লিক্লেজাইড বা গ্লিমিপ্রাইড গ্রুপের ওষুধ খেলে সে ক্ষেত্রে ডোজ কমিয়ে অর্ধেক খেতে হবে।
▶ দুপুরের ওষুধ খাবেন রাতের খাবারের পর।
▶ আর রাতের ওষুধ খাবেন সেহরির সময়। উচ্চমাত্রার গ্লিক্লেজাইড বা গ্লিমিপ্রাইড গ্রুপের ওষুধ খেলে সে ক্ষেত্রে ডোজ কমিয়ে অর্ধেক খেতে হবে।
▶ যারা দুই বেলায় ইনসুলিন নেন তারা সকালের ইনসুলিনটুকু ইফতারির পর নেবেন। আগের মাত্রায়ই (পরিমাণ) নেবেন। আর রাতের ইনসুলিনটুকু নেবেন সেহরিতে। তবে পরিমাণ কমিয়ে নিতে হবে এবং সেটা আগের ডোজের অর্ধেক নেবেন।
▶ যারা দিনে এক বেলা ডোজের ইনসুলিন (ব্যাসাল ইনসুলিন) নেন তারা সেটি ইফতারির পর নেবেন এবং রোজার আগের ডোজ থেকে ২০ শতাংশ কম ডোজে নেবেন।
▶ এরপর সকাল ১০টার সময় সুগার মাপবেন। সুগার খুব বেশি হলে পরের রাতে সেহরিতে ডোজ আর একটু বাড়াবেন। রোজার কারণে সুগার নিল (হাইপো) হতে পারে। তাই বিকাল ৪টার সময় আরেকবার সুগার মাপাবেন। খুব কম হলে অর্থাৎ ৩-এর কম হলে রোজা ভেঙে ফেলুন।
* কখন রোজা ভেঙে ফেলবেন
রোজা অবস্থায় নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে বা সুগার মেপে কম পেলে দ্রুত রোজা ভেঙে গ্লুকোজ বা মিষ্টি কিছু খেয়ে নিতে হবে-
▶ যদি ব্লাড সুগার ৩.৯ মিলি মোল (৭০ মিলিগ্রাম পার ডিএল)-এর নিচে নেমে যায়।
▶ যদি ব্লাড সুগার ১৬.৭ মিলি মোল (৩০০ মিলিগ্রাম পার ডিএল) এর ওপরে উঠে যায়।
▶ যদি প্রচণ্ড মাথা ঘোরে, বুক ধড়ফড় করে, খুব বেশি ঘাম হয় বা অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা হয়।
* জরুরি সতর্কতা
▶ সুগার চেক করা : রোজা রেখে রক্ত পরীক্ষা করলে বা গ্লুকোমিটার দিয়ে সুগার মাপলে রোজা ভেঙে যায় না। তাই নিয়মিত (যেমন-দুপুরের দিকে এবং ইফতারের আগে) সুগার চেক করুন।
▶ সেহরি মিস না করা : ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য সেহরি খাওয়া বাধ্যতামূলক। দেরি করে সেহরি খাওয়া ভালো।
▶ পর্যাপ্ত পানি : ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত প্রচুর পানি ও চিনিমুক্ত পানীয় পান করুন।
* হার্টের রোগীদের ওষুধ খাওয়ার নিয়ম
হার্টের রোগীদের ওষুধের নিয়ম পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ হার্টের ওষুধের সময় বা ডোজ এলোমেলো হলে রক্তচাপ বা হার্ট রেটে তারতম্য হতে পারে। সাধারণত হার্টের ওষুধগুলো নিচের নিয়মে সমন্বয় করা হয়।
* ওষুধের সময় পরিবর্তন
▶ দিনে একবারের ওষুধ : যে ওষুধগুলো আপনি দিনে একবার খেতেন (যেমন-অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল), সেগুলো ইফতারের পর খাওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
▶ দিনে দুইবারের ওষুধ : সকালের ডোজটি সেহরির সময় এবং রাতের ডোজটি ইফতারের সময় নিতে পারেন।
▶ রক্ত পাতলা করার ওষুধ (Blood Thinners) : যেমন-ওয়ারফেরিন বা রিভারোক্সাবেন; এগুলো সাধারণত ইফতারের পর খাওয়া ভালো।
* বুক ধড়ফড় বা এনজাইনার ওষুধ (Beta-blockers)
যদি আপনি হার্ট রেট নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ খান (যেমন-বিসোপ্রোলল, মেট্রোপ্রোলল, এটিনেলল), তবে সেগুলো ইফতারের পর নেওয়া ভালো। কারণ এগুলো রক্তচাপ কিছুটা কমিয়ে দেয় এবং সারা দিন রোজা রেখে সেহরিতে এ ওষুধ খেলে বিকালের দিকে খুব বেশি দুর্বলতা বা মাথা ঘোরানো হতে পারে।
* কোলেস্টেরলের ওষুধ (Statins)
কোলেস্টেরলের ওষুধ (যেমন-এটোরভাসটাটিন, রসুভাসটাটিন) বছরের অন্য সময় রাতে খাওয়া হয়। রোজার সময়ও এটি ইফতারের পর অনায়াসেই খাওয়া যায়।
* হার্ট ফেইলিউরের রোগীদের পানি কমানোর/শ্বাস কষ্টের ওষুধ
যেসব হার্টের রোগীরা পানি কমানোর ওষুধ Frulac, Fusid plus, Diretic DS, Spirocard plus, Inspiron plus, Edemide, Lasix খান তারা এটি ইফতারের পর খাবেন। কারণ সারা দিন রোজাকালীন ডিহাইড্রেশন হতে পারে এবং ডোজ আগের ডোজের চেয়ে অর্ধেক খাবেন। হার্টের যে ওষুধগুলো থেকে প্রেসার কমে যায় সে ওষুধগুলোর ডোজ কমিয়ে অর্ধেক খেতে হবে। তা না হলে প্রেসার অনেক কমে যেতে পারে।
* পানিশূন্যতা ও লবণের ব্যাপারে সতর্কতা
হার্টের রোগীদের জন্য পানিশূন্যতা (Dehydration) বিপজ্জনক হতে পারে।
▶ ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
▶ লবণযুক্ত এবং ভাজাপোড়া খাবার : ইফতারে অতিরিক্ত লবণ বা ডুবো তেলে ভাজা খাবার হার্টের ওপর চাপ বাড়ায়, তাই এগুলো এড়িয়ে চলাই ভালো।
* কখন রোজা রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে
যদি আপনার নিচের সমস্যাগুলো থাকে, তবে রোজা রাখার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুমতি নিন-
▶ গত ৬ মাসের মধ্যে হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকলে।
▶ অনিয়ন্ত্রিত হার্ট ফেইলিউর থাকলে (যাদের পায়ে পানি আছে বা শ্বাসকষ্ট হয়)।
▶ অনিয়ন্ত্রিত বুকব্যথা (Angina) থাকলে।
▶ হার্ট ভালভের মারাত্মক সমস্যা থাকলে।
* বিশেষ টিপস
রোজার প্রথম কয়েকদিন নিজের শরীরের লক্ষণগুলোর দিকে খেয়াল রাখুন। যদি অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড়ানি বা বুকব্যথা অনুভব করেন, তবে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন কিংবা রোজা রাখা থেকে বিরত থাকুন।
লেখক : মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, সহযোগী অধ্যাপক, কার্ডিওলজি, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা