বেসরকারি খাতের আলোচিত ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন জোগানে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে এই ব্যাংকটিতে মূলধন জোগান দেওয়ার কথা ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের। মঙ্গলবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠক করেছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহীরা। বৈঠকে ফারমার্স ব্যাংকে মূলধন জোগান দেওয়ার বিষয়ে সবাই একমত হলেও কোন প্রক্রিয়ায় অর্থ দেওয়া হবে, সে ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

বৈঠকের বিষয়ে রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংককে মূলধন জোগানোর বিষয়ে সবেমাত্র আলোচনা শুরু হয়েছে। এটি একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বৈঠকে কোনও কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। কিছু বিকল্প চিন্তাও করা হয়েছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব ইউনুসুর রহমান, মূলধন জোগানে আগ্রহী প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, রূপালী, অগ্রণী ও জনতা ব্যাংকের পর্ষদ চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, ফারমার্স ব্যাংক আইসিবি থেকে অর্থ মূলধন হিসেবে নিতে চায়। আর সোনালী, জনতা, রূপালী বা অগ্রণী ব্যাংক থেকে অর্থ মূলধন হিসেবে না নিয়ে ঋণ হিসেবে পেতে চায়। তবে ব্যাংকগুলো তাতে রাজি নয়। ব্যাংকগুলো মূলধন হিসেবে অর্থ দিয়ে ফারমার্স ব্যাংক পরিচালনায় তাদের প্রতিনিধিকে পাঠাতে চায়।

বৈঠক শেষে আইসিবির চেয়ারম্যান মুজিব উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ফারমার্স ব্যাংককে কীভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা কীভাবে অংশগ্রহণ করতে পারি, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা রেসকিউ (পর্যবেক্ষণ) করছি। ব্যাংকটিকে আমরা ধ্বংস হয়ে যেতে দিতে পারি না।’

গ্রাহকের আস্থা নেই এমন ব্যাংককে অর্থ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আস্থা নেই এটা ঠিক না। ব্যাংকটির প্রতি মানুষের আস্থা ইতোমধ্যে ফিরে আসছে। আমরা হয়তো তাদেরকে সহায়তা করবো, এটা সবাই জানে। সাম্প্রতিক ডেটা (তথ্য) নিলে দেখা যাবে, মানুষ ডিপোজিট দিয়েছে, আবার ঋণের টাকাও আদায় হচ্ছে। ফলে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।’

প্রসঙ্গত, ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচাতে ১১০০ কোটি টাকার মূলধন জোগান দেওয়ার কথা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর। এর মধ্যে আইসিবি জোগান দেবে ৪৫০ কোটি টাকা। বাকি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো বিভিন্ন পরিমাণে মূলধন হিসেবে জোগান দেবে।

প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০১৩ সালের ৩ জুন চতুর্থ প্রজন্মের ব্যাংক হিসেবে ফারমার্স ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে ব্যাংকটির শাখার সংখ্যা ৫৬টি এবং এটিএম বুথের সংখ্যা ১১টি। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকটি মোট ঋণ বিতরণ করেছে চার হাজার ৪১৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত বছর বিতরণ করেছে প্রায় এক হাজার ৮৩৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ফারমার্স ব্যাংকের মোট আমানত সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৬৩ কোটি ৬১ লাখ টাকা। যা ২০১৫ সালে ছিল তিন হাজার ৪৮২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা।

কার্যক্রমের শুরু থেকে অনিয়ম-দুর্নীতি ও আগ্রাসী ব্যাংকিংয়ে জড়িয়ে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। পরিচালকদের ঋণ ভাগাভাগিতে চলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। ফলে বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণ। তারল্য সংকটের পাশাপাশি মূলধন ঘাটতিতে ব্যাংকটি দুরাবস্থায় পড়েছে। আগ্রাসী ঋণ বিতরণের ফলে দেখা দিয়েছে তহবিল সংকট। একদিকে যেমন আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না, অন্যদিকে নিয়ম মতো বাংলাদেশ ব্যাংকে টাকা জমা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।

এর আগে গত ২৭ নভেম্বর পদত্যাগ করেন ফারমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং নিরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও পরিচালক মাহাবুবুল হক চিশতী। এরপর ব্যাংকের এমডি এ কে এম শামীমকে অপসারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চতুর্থ প্রজন্মের এ ব্যাংকের খেলাপি ঋণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। গত সেপ্টেম্বরের শেষে ফারমার্স ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিতরণ ঋণের ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশই খেলাপি। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য ঋণের পরিমাণ ২৩৮ কোটি টাকা। সর্বশেষ ব্যাংকটির আসল  খেয়ে এখন ৭৫ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews