দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে আনিসুর রশীদ অবসর জীবনযাপন করছিলেন। এই অব্সরেও তিনি একটি কাজ নিয়মিত করতেন। একমাত্র সন্তান পৃথুলার যেদিন ডিউটি (বিমান চালনা) থাকত, সেদিন বাবা তাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতেন। তবে শেষ দিনের (সোমবার, ১২ মার্চ) সকালটা ছিল একটু ব্যতিক্রম। এদিন বাবা আনিসুর রশীদ যাননি মেয়েকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দিতে। ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের অফিস থেকে পাঠানো গাড়িতে পৃথুলা একাই চেপে বসেন। নিয়তি যে অলক্ষে লিখে রেখেছিল, শেষ যাত্রায় তাকে একাই পাড়ি দিতে হবে না ফেরার দেশে!
সোমবার ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের যে ফ্লাইটটি নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়, তার কো-পাইলট ছিলেন পৃথুলা রশিদ। স্মরণকালের অন্যতম মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।
পৃথুলার ফ্লাইটের দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই রাজধানীর মিরপুর ডিওএইএস-এর ১০ নম্বর সড়কের ৬১৭ নম্বর বাসার ছবিটা বদলে যায়। মঙ্গলবার (১৩ মার্চ) বিকালে গিয়ে দেখা গেলো, বাড়ির সামনে কয়েকটা গাড়ি পার্ক করে রাখা। এই বাড়ির দোতলার একটা ফ্ল্যাটে পৃথুলারা ভাড়া থাকেন। স্বজনরা আসছেন পৃথুলার বাবা আনিসুর রশীদ ও মা রাফেজা খানমকে সান্ত্বনা দিতে। কিন্তু কী সান্ত্বনা দেবেন তারা! বাসার নিচে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চাইলে পরিবারের এক আত্মীয় বলেন, ‘আমার কোনও কথা নেই। পৃথুলা সব কথা নিয়ে গেছে!’
এদিকে, একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পৃথুলার মা-বাবা শয্যা নিয়েছেন। তারা ঘন ঘন মূর্ছা যাচ্ছেন। স্বজনদের কোনও সান্ত্বনাই তাদের প্রবোধ দিতে পারছে না। কথা বলার মতো কেউ নেই। অনেক অনুরোধের পরে পৃথুলার মামা আশিকুর রহমান কথা বলতে রাজি হন। তিনিই জানান, শেষ দিন পৃথুলা একাই কর্মস্থলে যান। তবে বিদায়ের সময় মা-বাবাকে বিশেষ কিছু বলে যাননি বলেও তিনি জানান। ‘ফ্লাইয়িং আছে, যাচ্ছি’— এমন কিছু বলেই পৃথুলা বাসা থেকে বেরিয়েছিলেন বলে জানান তার মামা।
আশিকুর রহমান বলেন, পৃথুলার নানা মান্নান খান নেপালে গিয়েছেন তার মরদেগ আনতে। সেখানে পৌঁছালে মান্নান খানকে কয়েকটি ফরম পূরণ করতে দেওয়া হয়। সেসব কাজ সেরে তিনি পৃথুলাকে দেখার অপেক্ষায় আছেন। তিনি বলেন, ‘সোমবার বেলা ২টা ৩১ মিনিটে খবর পাই, পৃথুলা আর নেই। তারপর থেকে আমাদের চেনা জগতটা একেবারে বদলে গিয়েছে।’
জানা গেছে, পৃথুলার বাবা আনিসুর রশীদ দীর্ঘদিন রাশিয়ায় ছিলেন। দেশে ফিরে তিনি কোনও পেশায় যোগ দেননি। একমাত্র সন্তান পৃথুলাকেই সঙ্গ দিতেন। মেয়েকে ইউনিভার্সিটিতে (নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি) নিয়ে যাওয়া, নিয়ে আসার কাজটা বাবাই করতেন। বাবাই ছিল পৃথুলার সবসময়ের সঙ্গী। পৃথুলার মা রাফেজা খানম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘আশা’য় উচ্চপদে কর্মরত।
পৃথুলাদের এই বাসা এখন শোকে স্তব্ধপৃথুলার মামার কাছ থেকে জানা গেছে, রাজধানীর আগারগাঁওয়ের তালতলা কবরস্থানে দাদা-দাদী ও ফুপুর কবরের পাশে পৃথুলাকে দাফন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার পারিবার।
পৃথুলার কথা বলতে বলতে কান্নায় জড়িয়ে যায় তার মামার গলা। তিনি বলেন, ‘পৃথুলা ছোটবেলা থেকেই অনেক সাহসী। সবসময় অন্যদের জন্য স্যাক্রিফাইস করার জন্য প্রস্তুত থাকত সে। আমরা শুনেছি, শেষ সময়েও সে অন্যদের রক্ষা করতে গিয়েই জীবন দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পৃথুলার তো ককপিটে থাকার কথা। কিন্তু দুর্ঘটনার পরে সে বিমানের পেছন দিকে চলে যায়। ওখানে গিয়ে সে অনেক যাত্রীকে উদ্ধার করে। ওই যাত্রীরা প্রাণে বেঁচে গেলেও পৃথুলা আর ফিরতে পারেনি। পৃথুলা চাইলে বের হয়ে আসতে পারত। আমরা ওকে জীবিত পেতাম। কিন্তু তার ওই যে চিরদিনের অভ্যাস। অভ্যাসবশত উদ্ধারের কাজটা করতে গিয়ে সে নিজেই ফুরিয়ে গেলো।’
পৃথুলার ফেসবুক আইডিতে গিয়ে দেখা গেলো, সর্বশেষ ৩ ফেব্রুয়ারি একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। সঙ্গে কিছু হাসিমাখা ছবি। ইন্ট্রোতে পৃথুলা লিখেছেন, তিনি সাধারণ এক মেয়ে। কিন্তু তার এক্সট্রা-অর্ডিনারি ভালোবাসা রয়েছে বিমান চালনা, সাহিত্য আর পোষা প্রাণীর প্রতি।
উল্লেখ্য, সোমবার (১২ মার্চ) চার ক্রু ও ৬৭ যাত্রীসহ ৭১ জন আরোহী নিয়ে ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে নেপালের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ২০ মিনিটে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে পৌঁছায়। অবতরণের সময় এতে আগুন ধরে যায়। এরপর বিমানবন্দরের কাছেই একটি ফুটবল মাঠে সেটি বিধ্বস্ত হয়। এই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫০ জন। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিক ২৬ জন। এ ছাড়া, বেঁচে আছেন আরও ১০ বাংলাদেশি।
আরও পড়ুন-
নেপালের হতভাগ্য ১১ মেডিক্যাল শিক্ষার্থী!
শশীর যে ছবি এখন বাবা-মায়ের কাছে শেষ স্মৃতি
বিমান বিধ্বস্ত: হতাহত বাংলাদেশিদের নাম প্রকাশ

নেপালের ৬ কর্মকর্তাকে সরিয়ে নেওয়া সন্দেহের চোখে দেখছে ইউএস বাংলা
এয়ারফোর্সের বিমান প্রস্তুত, লাশ দেশে পাঠানো হবে দ্রুত: বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews