বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন কিছু ব্যক্তিত্ব আছেন, যারা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের মুখ নন, বরং একটি যুগ, একটি ধারাবাহিকতা এবং একটি জাতীয় মনস্তত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বেগম খালেদা জিয়া, যিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী, তিনবারের নির্বাচিত সরকারপ্রধান এবং দীর্ঘ চার দশক ধরে বাংলাদেশ রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তাঁর রাজনৈতিক পথচলা একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নেতৃত্বের এক অনন্য অধ্যায়, অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার গণতন্ত্র, নারী নেতৃত্ব, রাষ্ট্রগঠন ও ক্ষমতার রাজনীতির এক গভীর প্রতিফলন।
বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম, বেড়ে ওঠা, রাজনৈতিক উত্থান, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা, দেশ-বিদেশে স্বীকৃতি, জনগণের ভালোবাসা এবং তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার: সমগ্র বিষয়কে আন্তর্জাতিক তুলনা, দক্ষিণ এশীয় প্রেক্ষাপট এবং গুণী ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো।

বেগম খালেদা জিয়ার জন্ম ১৫ আগস্ট ১৯৪৫ সালে, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত তথা পূর্ববঙ্গে। তাঁর পিতা ছিলেন জেলায় সুপরিচিত ব্যবসায়ী ও সম্মানিত ব্যক্তি; পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত, রক্ষণশীল হলেও শিক্ষাপ্রিয়। এই সময়ে নারীর শিক্ষা, ভ্রমণ বা সামাজিক অংশগ্রহণ সীমাবদ্ধ থাকলেও তাঁর পরিবার মেয়েদের শিক্ষাকে বাধা দেয়নি, যা পরবর্তীতে তাঁর নেতৃত্ব বিকাশের মানসিক শক্তি তৈরি করে।

১৯৬০-এর দশকে তাঁর বিয়ে হয় জিয়াউর রহমানের সঙ্গে, যিনি স্বাধীনতার ঘোষক এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হন। এই সম্পর্ক শুধু ব্যক্তিগত জীবনের বদল নয়; বরং তাঁকে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলোর একটি কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দাঁড় করায়।

১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হলে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, শূন্যতা ও দলীয় বিভাজন তৈরি হয়। বিএনপি তখন নেতৃত্ব সংকটে পড়ে। দলের প্রবীণ নেতারা বেগম জিয়াকে সামনে আসার আহ্বান জানান। কারণ, তিনি জিয়ার নীতির ধারক হিসেবে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। এই সময়ের সিদ্ধান্তই তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এক নারী, রাজনৈতিকভাবে নবীন, সামরিক শাসনময় প্রতিকূল পরিবেশ: সব বাধা অতিক্রম করে তিনি সামনে এগিয়ে আসেন। বাংলাদেশে একজন নারীকে এমন পরিস্থিতিতে দলীয় নেতৃত্বে আসা তৎকালীন দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিরল ছিল।

১৯৮২ সালে সামরিক শাসন শুরু হলে বেগম জিয়া বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী হন। তিনি দলকে সংগঠিত করেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে অবিচল থাকেন এবং ধীরে ধীরে দেশের জনপ্রিয় বিরোধী রাজনৈতিক নেত্রীতে পরিণত হন। ১৯৯০ সালের আন্দোলন ছিল তাঁর আপসহীন নেতৃত্বের ফসল, যার মাধ্যমে সামরিক শাসকের পতন ঘটে এবং বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রে ফিরে আসে। এই পর্যায়ে তাঁর ভূমিকা রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে একটি ‘ট্রানজিশনাল লিডারশিপ’ যা সংকটকালীন নেতৃত্বের সেরা উদাহরণ।

১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে টার্নিং পয়েন্ট। তৎকালীন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা এটিকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক, গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলে উল্লেখ করেন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় এবং তিনি দেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী হন। সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি, টেলিকম, পরিবহন ও আর্থিক খাতে সংস্কার, নারী শিক্ষায় স্টাইপেন্ড, গ্রামীণ শিক্ষায় বিশেষ বরাদ্দ, রাষ্ট্রচালনায় প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা। এই সময়ই বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির তালিকায় উল্লেখ করতে শুরু করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে দেশজুড়ে বিশাল জনসমর্থনে আবারও ক্ষমতায় আসেন তিনি। এই সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, টেলিকম খাত উন্মুক্তকরণ, পোশাকশিল্পে রপ্তানি জোয়ার, শিক্ষা ও নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ক্ষমতায় স্থিতিশীল রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষমতা দেখিয়েছেন, যা পাকিস্তান ও ভারতের প্রেক্ষাপটে বিরল।

বিশ্বে নারী রাষ্ট্রনায়কদের সংখ্যা অত্যন্ত কম হলেও দক্ষিণ এশিয়া এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। ইন্দিরা গান্ধী (ভারত), বেনজির ভুট্টো (পাকিস্তান) এবং বেগম খালেদা জিয়া: এই তিন নারী দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী রাষ্ট্রনেত্রী হিসেবে বিবেচিত। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে একজন নারীর প্রভাবশালী সরকারপ্রধান হওয়ায় এটিকে নারীর ক্ষমতায়নের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত বলে বিবেচনা করা হয়।

বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রিত্বের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, পাকিস্তান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাঁর সাক্ষাৎকার, কূটনৈতিক সফর এবং বিবৃতি তৎকালীন বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি দেয়। তিনি SAARC–এর প্রথম কার্যকর নারী নেতা হিসেবে বিবেচিত, যিনি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতাকে গুরুত্ব দেন। বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা তাঁকে সাধারণত calm, firm, quiet but decisive নেতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

২০০৭-২০০৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি গ্রেপ্তার হন। পরবর্তী সময়ে দাতব্য ট্রাস্ট সংক্রান্ত মামলায় দ-িত হন। কিন্তু দেশ-বিদেশের বহু মানবাধিকার সংগঠন তাঁর বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে মুক্তি দিলে তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। এই প্রত্যাবর্তনকে কেউ বলেন ‘অভিজ্ঞ নেতার প্রত্যাবর্তন’, কেউ বলেন ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চক্রের পুনরাগমন’।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের নারী নেতৃত্ব প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে একবার বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার নারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশ্বকে নতুন প্রমাণ দিয়েছে: সাহস, দৃঢ়তা এবং নেতৃত্ব লিঙ্গের ওপর নির্ভর করে না।’

আর্চবিশপ ডেসমন্ড টুটু বাংলাদেশের গণতন্ত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে খালেদা জিয়াকে courageous democratic figure হিসেবে উল্লেখ করেন। পাকিস্তানের বেনজির ভুট্টো এক যৌথ SAARC আলোচনায় বলেন, We women in South Asia carry a unique responsibility—to break barriers for the next generation.. এই প্রেক্ষাপটে বেগম জিয়া দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেতৃত্বের ধারায় একটি কেন্দ্রীয় নাম।
যদিও রাজনৈতিক বিভক্তি রয়েছে, তবে বেগম জিয়া দেশের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কাছে আজও ‘মা’, ‘মাদার অফ ডেমোক্রেসি’, ‘লেডি লিডার’ নামে পরিচিত। বিশেষ করে গ্রামীণ নারীরা তাঁকে একজন নারী হিসেবে সাহস, দৃঢ়তা, ধৈর্যের উদাহরণ মনে করেন।

একটি রাষ্ট্রনায়কের ক্ষেত্রে যেমন অর্জন থাকে, তেমনি থাকে সীমাবদ্ধতাও। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে দলীয়করণ, প্রশাসনিক দুর্বলতা, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় ব্যর্থতা, পরিবারতন্ত্রের অভিযোগ করা হয়। তবে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশ, দলীয় কাঠামো ও সামরিক চাপের বাস্তবতায় তাঁর সিদ্ধান্তগুলোকে আলাদা করে বিচার করা সম্ভব নয়।

কেন তিনি এক অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রনেতা: ১. বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী, ২. তিনবার ক্ষমতায় থাকা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী নারী নেতা, ৩. গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নেতৃত্বদান, ৪. দক্ষিণ এশিয়ার নারী নেতৃত্বের পথিকৃৎ, ৫. প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সংগঠনে দৃঢ়তা, ৬. দীর্ঘ চার দশক জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, ৭. সংকট থেকে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা, ৮. আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে স্বীকৃতি, ৯. জনগণের ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু, ১০. বাংলাদেশ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি পূর্ণ অধ্যায়।

বেগম খালেদা জিয়া এমন একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাকে শুধু একজন নেতা হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তনের একটি পর্ব, একটি ধারাবাহিকতা এবং একটি সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।

লেখক: ব্যাংকার ও তথ্য পদ্ধতি গবেষক
[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews