একদিকে দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার মধ্য দিয়ে অভ্যন্তরীণ কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করা, অন্যদিকে লেবানন ও ইয়েমেনকে ইরানবিরোধী ছায়াযুদ্ধের নাট্যমঞ্চ বানিয়ে আঞ্চলিক আধিপত্য জোরদার করার  প্রচেষ্টা নিয়েছিল সৌদি আরবের বর্তমান নেতৃত্ব। তবে তাদের এই পদক্ষেপের ফল হয়েছে উল্টো। এই দুই পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের একক কর্তৃত্বপ্রত্যাশী দেশটির রাজতন্ত্রকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। পাশাপাশি আঞ্চলিক তোপের মুখে পড়তে হয়েছে তাদের। প্রধান ধারার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আভাস দিয়েছে। সাম্প্রতিক দুর্নীতিবিরোধী তৎপরতায় পশ্চিমা বিনিয়োগে বিপুল ধসেরও আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই অবস্থায় সৌদি আরব নিজের ফাঁদেই আটকা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে। তবে সৌদি সরকারের সবশেষ অবস্থানে তাদের পিছু হটার আভাস মিলেছে।

১৯৭৯ সালে ইরানে সংঘটিত ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই দেশটিকে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় পরিসরে শক্ত প্রতিপক্ষ বিবেচনা করে আসছে সৌদি আরব। সুন্নি মুসলিমপন্থী সৌদি আরবের আশঙ্কা, শিয়াপন্থী ইরান তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। ইরাকযুদ্ধ ও আরব বসন্তের সুযোগ নিয়ে বাড়াতে পারে অঞ্চলগত প্রভাব। বাগদাদ, দামেস্ক, সানা ও বৈরুতের ধারাবাহিকতায় তেহরান মধ্যপ্রাচ্যের বাদবাকি দেশগুলোকে নিজেদের কব্জায় নিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে সৌদি আরবের।  এই বাস্তবতায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করার লড়াইয়ে নামে তারা। মার্কিন সাময়িকী  দ্য আটলান্টিকের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, ইরানের সঙ্গে যতদিন সৌদি আরবের আঞ্চলিক ছায়াযুদ্ধ চলবে ততোদিন ইয়েমেন সেই যুদ্ধের নাট্যমঞ্চ হিসেবে এবং মোহাম্মদ বিন সালমানের আঞ্চলিক আকাঙ্ক্ষা পূরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। তবে এরইমধ্যে সৌদি আরবের নিজের অবস্থান থেকে পিছু হটার আভাস মিলেছে।

সোমবার সৌদি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, রিয়াদে হুথি বিদ্রোহীদের ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রচেষ্টার পর বন্ধ রাখা বিমান ও সমুদ্র বন্দরগুলো পুনরায় চালু করবে ইয়েমেনে যুদ্ধরত সৌদি জোট। লেবাননের সদ্য পদত্যাগকারী প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মাথায় ওই বন্দরগুলো নতুন করে খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। সৌদি আরবে অবস্থানরত অবস্থায় গত ৪ নভেম্বর পদত্যাগের ঘোষণাদানকারী হারিরি ওই সাক্ষাৎকারে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে বলেছেন, তিনি কয়েকদিনের মধ্যে দেশে ফিরবেন এবং সেখানে তার জোট সরকারের শত্রু বলে বিবেচিত সশস্ত্র শিয়া গোষ্ঠীর সঙ্গে মীমাংসা করার চেষ্টা করবেন। এপির প্রতিবেদনে বিশ্লেষকরা এই দু্ই ঘটনা বিশ্লেষণ করে দাবি করেন, সৌদি আরবকে গুরুতর আঞ্চলিক উত্তেজনার অতলে নিয়ে গিয়েছিলেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সৌদি জোট আর হারিরির পদক্ষেপকে সেখান থেকে পেছনে ফেরার চেষ্টা আখ্যা দিয়েছেন তারা।

বৈরুতের কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টারের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইয়েজিদ সায়িগ বলেন, ‘এটি থেকে বোঝা যায় সৌদি সরকার উত্তেজনা থেকে সরে আসার চেষ্টা করছে। পরিস্থিতি থেকে যা বোঝা যাচ্ছে তাহল সৌদি সরকার পিছু হটতে যাচ্ছে; অপ্রত্যাশিত মাত্রার আন্তর্জাতিক চাপ এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে এবং মার্কিন চাপ এখানে বড় বিষয় নয়।’

এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, একইসঙ্গে বিচার ক্ষমতাসম্পন্ন এবং আবেগী হিসেবে পরিচিত যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। সরকারের হয়ে কাজ করার স্বল্প অভিজ্ঞতা নিয়ে মাত্র ৩২ বছর বয়সী এই যুবরাজের সৌদি আরবের রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির বড় বড় ক্ষেত্রগুলোর দেখভাল করার ক্ষমতা অর্জন করতে মাত্র তিন বছর লেগেছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব রয়েছে তার কাঁধে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার জামাতা জ্যারেড কুশনারেরও তার প্রতি সমর্থন রয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় সৌদি আরবের বন্ধু ও অংশীদাররা এবং ট্রাম্প প্রশাসনকে দেখা গেছে রিয়াদে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি সরকারকে সমর্থন দিতে। যুদ্ধ-ক্ষুধা-রোগের মহামারিতে ইতোমধ্যেই জর্জরিত ইয়েমেনে নতুন অবরোধ লাখ লাখ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা জানালেও তখনও টনক নড়েনি সৌদি আরবের। তবে মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে তাদের অবরোধ শিথিল করার সিদ্ধান্ত চাপের মুখে নতি স্বীকার হিসেবে দেখা হয়েছে এপির বিশ্লেষণে। এতে বলা হয়েছে, ‘সৌদি আরবের এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে বোঝা যায় দেশটি আন্তর্জাতিক সমালোচনার কাছে নতি স্বীকার করেছে, এবং দেশটি চায় না অনলাইন ও সংবাদমাধ্যমে রুগ্ন ইয়েমেনি শিশু ও বৃদ্ধদের আরও করুণ করুণ ছবি ছড়িয়ে পড়ে বাজে প্রচারণা হোক।’

সম্প্রতি সৌদি আরবের বেশ ক’জন রাজপুত্র, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে তাকে যুবরাজের বাড়াবাড়ি আকারেই দেখা হচ্ছে। সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে ওই অভিযানে ২০১ জনকে আটকের খবর নিশ্চিত করা হলেও মিডল ইস্ট আইয়ের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ৫ শতাধিক আটকের খবর দেওয়া হয়েছে। সরকার তাদের তদন্ত আরও বিস্তৃত করার অঙ্গীকার করেছে এবং ১২০০-র মতো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করার খবর পাওয়া গেছে। এতে রাজপরিবারে দ্বন্দ্বসংঘাত প্রকট হওয়ার খবর মিলেছে। এরইমধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সৌদি প্রিন্সের বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান খবর দিয়েছে, রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যদের কাছে দুটি চিঠি বিতরণ করা হয়েছে। এতে তাদের রাজা সালমানের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানে পশ্চিমা বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ারও আভাস মিলেছে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেতজ-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে রাজনীতি বিশ্লেষক জেভি ব্যারেল মন্তব্য করেছেন, সাক্ষীর জবানবন্দি সংগ্রহ করা যাবে এবং অর্থ পাচার ও অন্যান্য জালিয়াতি কর্মকাণ্ডের প্রমাণ উপস্থাপন করা যাবে এমন একটি যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া কবে হবে তা দুরাশা। এভাবে এ ধরনের প্রমাণ উপস্থাপন করা গেলে তা বিপুল সংখ্যক সৌদি ব্যবসায়ীর ক্ষতি করতো। পাশাপাশি রাজ দরবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এমন মধ্যস্থতাকারীদেরকে ঘুষ দিয়ে যেসব বিদেশি কোম্পানি টেন্ডার পেয়ে যায় তারাও ক্ষতির সন্মুখীন হবে।

গত ৩ নভেম্বর ৪৭ বছর বয়সী সৌদি-সমর্থক ও লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে বৈরুত থেকে রিয়াদে তলবের একদিরেন মাথায় এক টেলিভিশন ভাষণে পদত্যাগের ঘোষণা দেন তিনি। লেবানন একে অপহরণ আখ্যা দিয়েছে। অনেকের দাবি, হারিরিকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে এবং তাকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আটকে রাখা হয়েছে। হারিরির এ আকস্মিক পদত্যাগকে দেখা হচ্ছিল আঞ্চলিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সৌদি-ইরান যুদ্ধের সন্মুখ সারিতে লেবাননকে টেনে নিয়ে যাওয়া সৌদি চেষ্টা হিসেবে। তবে এই ঘটনা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে যেমন নাড়া দিয়েছে তেমনি বিস্মিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্ব। হারিরিকে দেশে ফিরতে দেওয়া হোক এমন দাবিতে লেবানিজদের মধ্যে দেখা যায় বিরল ঐক্য। এপির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হারিরির পদত্যাগকে কেন্দ্র করে লেবাননে যে সংকট তৈরি হয়েছে তা সৌদি আরব কিভাবে মোকাবিলা করবে এবং তিনি আদৌ হিজবুল্লাহর সঙ্গে মীমাংসার চেষ্টা করতে পারবেন কিনা সে ব্যাপারে এতো তাড়াতাড়ি বলা সম্ভব নয়। তবে সৌদি সরকারের স্পষ্ট নির্দেশনা মোতাবেক তার আকস্মিক পদত্যাগের ঘটনাটি এখন পর্যন্ত পরিণতি না ভেবে নেওয়া পদক্ষেপ বলেই মনে হচ্ছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি আরবের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, যারা আটক হয়েছে তারা বছরের পর বছর ধরে দেশকে শুষে খাচ্ছিল। অবশ্য, মাকিন পররাষ্ট্র দফতর এ ব্যাপারে ‘সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ’ বিচার প্রক্রিয়া চালানোর জন্য রিয়াদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ট্রাম্প ও কুশনারের কাছ থেকে সৌদি যুবরাজ সমর্থন পেলেও লেবানন প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর যে প্রতিক্রিয়া জানালো তা ছিল লজ্জাজনক। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলে দিলেন, লেবাননের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিজনক এমন কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে যুক্তরাষ্ট্র। যারা লেবাননকে ‘প্রক্সি যুদ্ধের ভেন্যু’ হিসেবে ব্যবহার করছে সেইসব দেশকেও সতর্ক করা হয়। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়, মূলত সৌদি আরব ও ইরান দুই দেশকে উদ্দেশ্য করেই ওই বিবৃতি দেওয়া হয়েছে। আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, সকল রাষ্ট্র ও পক্ষকে লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে সম্মান দেখানোর জন্য আহ্বান জানিয়ে দৃঢ় ভাষায় একটি বিবৃতি দেয় হোয়াইট হাউস। ওই বিবৃতিতে লেবাননের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশারী করা, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং শরণার্থীদের সুরক্ষায় হারিরিকে যুক্তরাষ্ট্রের আস্থাভাজন অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এ ব্যাপারে কার্নেগির বিশ্লেষক সায়িগ বলেন, ‘আমি মনে করি সৌদি সরকার প্রাথমিকভাবে ভুল বিবেচনা করেছে....এবং তাদের আরও ভালোভাবে জানাশোনা করা দরকার। তারা অনেক বেশি করে ট্রাম্পের লোকজনের ওপর ভরসা করছে এবং এই ভেবে ভুল করছে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন মানেই কেবল ট্রাম্প নন।’



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews