‘ধুরন্ধর ২’-এর ব্লকবাস্টার সাফল্যের মধ্যেই নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠী। তিনি ছবিটিকে “বিজেপির সবচেয়ে ব্যয়বহুল বিজ্ঞাপন” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং বাস্তব ঘটনা ও কাহিনির উপস্থাপন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আদিত্য ধর পরিচালিত ধুরন্ধর ২: দ্য রিভেঞ্জ বক্স অফিসে রেকর্ড ভাঙতে থাকলেও এবং ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন মহল থেকে প্রশংসা পেলেও, প্রথম ছবির মতোই এটি সমান্তরালভাবে বিতর্কও তৈরি করেছে। কিছু দর্শক ও বিশ্লেষক ছবিটির রাজনৈতিক ইঙ্গিত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন; কেউ কেউ একে প্রোপাগান্ডা বলেও অভিহিত করছেন এবং নির্দিষ্ট মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগ তুলছেন।
এই আলোচনার মাঝেই ধ্রুব রাঠী, যিনি আগেও ধুরন্ধর নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন, এবার সিক্যুয়েলটি বিশ্লেষণ করে একটি বিস্তারিত ভিডিও প্রকাশ করেছেন। তার দাবি, আগেরবার যেসব উদ্বেগ তিনি তুলেছিলেন, এবার তা আরও তীব্র হয়েছে।
ভিডিওতে রাঠী বলেন, এটি নিছক বিনোদনের ছবি নয়, বরং একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার।
“ধুরন্ধর ২ কোনো বিনোদনের জন্য বানানো সিনেমা নয়… এটি বিজেপির সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনী বিজ্ঞাপন, যা দেখতে আপনাকে ৫০০ রুপি দিতে হয়,”—তিনি বলেন এবং ছবির পরিচালককে “চাটুকার” বলেও আখ্যা দেন।
কল্পনা ও বাস্তবের সীমারেখা ঝাপসা
ছবির বর্ণনাশৈলী অনুসরণ করে রাঠীও তার ভিডিওকে বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন—যখন একটি সিনেমা নিজেকে বাস্তব ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত কল্পকাহিনি বলে দাবি করে, তখন সেখানে বাস্তব মুখ, নাম এবং আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করলে সেই সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
“আপনি নরেন্দ্র মোদির আসল মুখ ও ফুটেজ দেখাচ্ছেন… দাউদ ইব্রাহিমের মতো বাস্তব নাম ব্যবহার করছেন… তারপর বলছেন সবই কাকতালীয়?”—তিনি বলেন। এ ধরনের ডিসক্লেইমারকে তিনি “আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে দর্শককে বিভ্রান্ত করার কৌশল” বলে উল্লেখ করেন।
আবেগ তৈরি করে বার্তা পৌঁছানো
রাঠীর মতে, ছবির কিছু দৃশ্য ইচ্ছাকৃতভাবে তীব্র আবেগ তৈরি করার জন্য নির্মিত। তিনি একে “ইমোশনাল প্রাইমিং” বলেন।
“আগে আবেগ তৈরি করো, তারপর তার ওপর গল্প দাঁড় করাও।”
তার দাবি, কিছু দৃশ্য গল্পের জন্য অপরিহার্য নয়, তবুও সেগুলো দর্শকের মানসিকতা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
“এটা যেন কাউকে খুব ঝাল খাওয়ানোর মতো, যাতে জিভ জ্বলে যায়—তারপর সে মিষ্টি কিনতে বাধ্য হয়। আদিত্য ধর দর্শকের আবেগ জ্বালিয়ে দেন, যাতে পরে তারা সহজে যেকোনো প্রোপাগান্ডা গ্রহণ করে,”—তিনি বলেন।
খলনায়কের মুখে প্রশংসা
রাঠী আরও বলেন, ছবিতে এমন কিছু দৃশ্য রয়েছে যেখানে খলনায়করা ভারতের নেতৃত্বের প্রশংসা করে। তার মতে, এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক কৌশল।
“নায়ক যদি প্রশংসা করে, তার প্রভাব কম হয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় খলনায়ক করলে, দর্শক অন্যভাবে বিশ্বাস করে,”—তিনি বলেন।
কী দেখানো হচ্ছে, আর কী নয়
রাঠী বিশ্লেষণ করেন, ছবিটি বাস্তব ঘটনাগুলো কীভাবে উপস্থাপন করেছে। তার দাবি, ২০১৬ সালের নোটবন্দিকে জাতীয় নিরাপত্তা অভিযানের মতো দেখানো হয়েছে, কিন্তু এর অর্থনৈতিক প্রভাব ও ক্ষতির দিকগুলোকে ছোট করে দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ছবিতে এমনভাবে বিষয়টি দেখানো হয়েছে যাতে নগদ সংকটজনিত মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো আড়াল হয়ে যায়।
এছাড়া ২০২৩ সালে আতীক আহমেদের হত্যাকাণ্ড থেকে অনুপ্রাণিত একটি দৃশ্যের কথাও তিনি উল্লেখ করেন, যেখানে বাস্তব ঘটনার সঙ্গে ভিন্নভাবে তা দেখানো হয়েছে।
রাঠীর দাবি, অর্জুন রামপালের অভিনীত আইএসআই চরিত্রটি এমন এক ব্যক্তির ওপর ভিত্তি করে, যিনি ২০১১ সালেই মারা গেছেন।
“এখানেই আদিত্য ধরের তথাকথিত ‘ডিটেইল’-এর যত্ন ভেঙে পড়ে। গল্প এগোনোর জন্য খলনায়ককে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে,”—তিনি বলেন।
তিনি আরও বলেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছবিতে দেখানো হয়নি—যেমন ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর নরেন্দ্র মোদির আকস্মিক পাকিস্তান সফর, যেখানে তিনি নওয়াজ শরিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
“এটা দেখানো হয়নি, কারণ এটি ছবির প্রচারিত বয়ানের সঙ্গে মেলে না,”—রাঠীর মন্তব্য।
সাম্প্রতিক ঘটনাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা
রাঠীর মতে, ছবিতে দেখানো অনেক ঘটনাই সাম্প্রতিক এবং মানুষের স্মৃতিতে এখনো জীবন্ত। তাই এগুলোর ভিন্ন ব্যাখ্যা দর্শকের বাস্তব উপলব্ধিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
“আপনি এটিএম লাইনের দৃশ্য দেখেছেন… আর এখন সিনেমা আপনাকে বলছে, আপনি যা দেখেছেন, তা বাস্তব নয়,”—তিনি বলেন।
‘গ্যাসলাইটিং’-এর অভিযোগ
রাঠী ছবিটির এই উপস্থাপনাকে “গ্যাসলাইটিং” বলে অভিহিত করেন।
“এই ধরনের গ্যাসলাইটিং যখন বড় পরিসরে ঘটে… তখন এটি শুধু একটি সিনেমা থাকে না, এটি একটি অস্ত্র হয়ে যায়,”—তিনি বলেন।
শেষে তিনি ধুরন্ধর ২-কে “পিক সিনেমা” নয়, বরং “পিক বিজ্ঞাপন” বলে মন্তব্য করেন।
এর আগে তিনি এক্স (সাবেক টুইটার)-এ লিখেছিলেন, “আমি ৩ মাস আগে আদিত্য ধরকে বিজেপির প্রোপাগান্ডিস্ট বলেছিলাম। এখন সবাই দেখবে। আগের ছবিতে বিষয়টি সূক্ষ্ম ছিল, এবার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে তা প্রকাশ্য হয়ে গেছে। ভালোভাবে বানানো প্রোপাগান্ডা বেশি বিপজ্জনক—এখন তো সেটাও ভালোভাবে বানানো নেই।”
বক্স অফিস সাফল্য
অন্যদিকে, রণবীর অভিনীত এই সিনেমাটি ভারতে মোট ৮০৫.৩২ কোটি রুপি আয় করেছে (গ্রস), যেখানে নেট আয় ৬৭৪.১৭ কোটি রুপি। বিশ্বব্যাপী আয় দাঁড়িয়েছে ১,০৬৭.২৪ কোটি রুপি—যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ব্লকবাস্টার।
উল্লেখ্য, এই প্রতিবেদনটি জনমত ও চলচ্চিত্র সমালোচনার একটি সম্পাদকীয় সংকলন। এখানে উল্লিখিত মতামত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব; এগুলোকে চূড়ান্ত তথ্য বা আইনি সত্য হিসেবে ধরা উচিত নয়। দর্শকদের বাস্তব ইতিহাস ও নাটকীয় উপস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণে নিজস্ব বিচারবোধ ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে