মোহাম্মদ ওমর ফারুক   
ওদের জন্মই অন্ধকার গলিতে। বেড়ে ওঠে অন্ধকার জীবন নিয়ে। অন্ধকার গলির অন্ধকার জীবনের গল্পটা শুধুই অন্ধকার। বলছি দৌলতদিয়া যৌন পল্লীর শিশুদের কথা। যে বয়সে শিশুদের স্কুলে যাওয়ার কথা, হাতে থাকার কথা বই ঠিক সেই সময়ে ভবিষ্যৎকে অন্ধকার করে মাদকের মতো ভয়াবহ মরণ নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে দেশের বৃহত্তম দৌলতদিয়া যৌন পল্লীর শিশুরা। অভিভাবক থাকার পরেও যেন অভিভাবক নেই তাদের।

বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জানা থাকলেও অদৃশ্য কারণে তারা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে বড়দের পাশাপাশি শিশু-কিশোররা মাদক ব্যবসা ও সেবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, যৌনপল্লীতে জন্ম নেয়া বেশির ভাগ শিশু-কিশোররাই বর্তমানে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে। এছাড়া চুরি, ছিনতাই, নারী পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে তারা। বাইরের প্রভাবশালী মাদক ব্যবসায়ী ও নারী পাচারকারীরা তাদের এ ব্যবসায় নামিয়ে নিজেরা ফায়দা লুটছে বলেও একাধিক সূত্রে জানা যায়।

যৌন পল্লীরর ভিতরে বর্তমানে প্রায় অর্ধশত মদের দোকান, শতাধিক গাঁজার দোকান ও ভাসমান হেরোইন, ফেনসিডিল ব্যবসায়ী প্রশাসনের চোখের সামনেই চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যবসা। পাশাপাশি অনেক প্রভাবশালী বাড়িওয়ালারাও মাদক বাণিজ্যে পল্লীর শিশু-কিশোরদের ব্যবহার করে টাকার পাহাড় গড়ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে প্রতিদিন সড়ক ও রেলপথে নানা ধরনের মাদক দ্রব্য যৌনপল্লীতে চলে আসে। এর বাইরে স্থানীয় সরকারি লাইসেন্সধারী মদের ডিলার হিসেবের মারপ্যাঁচে প্রতিদিন শত শত লিটার মদ যৌনপল্লীতে সরবরাহ করছে। প্রশাসনের নাকের ডগায় এ ব্যবসা চললেও অজ্ঞাত কারণে বিষয়টি তাদের নজরে আসছে না। ক্ষমাতাসীন দলের স্থানীয় একটি চক্র এ ব্যবসা থেকে প্রতিমাসে কয়েক লাখ টাকার মাসোহারা আদায় করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এভাবে বৈধ দোকানে অবৈধ মদ সরবরাহের কারণে পল্লীর ভেতরে অন্তত্য শতাধিক শিশু-কিশোর মাদক সেবন, পরিবহন ও ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

যৌনপল্লীর নারী ও শিশুদের নিয়ে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠন মুক্তি মহিলা সমিতির কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান মঞ্জু বলেন, যৌনপল্লীর এই অন্ধকার পরিবেশে একটি সুস্থ্য শিশুর স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা ও মেধাবিকাশ স্বপ্নহীন মাত্র। তবে আমরা যৌনপল্লীর এ অবহেলিত শিশু-কিশোরদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মিত তাদের শিক্ষা বিকাশ, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ, নৈতিক শিক্ষা, সঞ্চয়, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদানসহ নানা ধরনের কাজ করে আসছি। এরই মধ্যে পল্লীর অনেক শিশু-কিশোরকে হাতে-কলমে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দিয়েছি এবং বর্তমানে তারা স্বাভাবিক ও সুস্থ্যভাবে জীবন কাটাচ্ছে।

দৌলতদিয়ায় বাড়ছে শিশু যৌনকর্মীর সংখ্যা
রাজবাড়ীর দৌলতদিয়ায় দেশের বৃহত্তম পতিতা পল্লীতে শিশু যৌনকর্মীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। পল্লীর প্রভাবশালী বাড়িওয়ালীদের ছত্রছায়ায় এখানে গড়ে উঠেছে এক শ্রেণীর দালাল চক্র। চক্রটি আইনের চোখে ধুলো দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাধারণ মেয়ে শিশুদেরকে নানাভাবে ফুঁসলিয়ে যৌনপল্লিতে নিয়ে আসে। এরপর মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দেয় তাদের।

দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক কোনো শিশু-কিশোরীকে যৌন পেশায় বাধ্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও বিষয়টি নজরে আসছে না স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার। এ পল্লীতে বর্তমানে প্রায় চার হাজার যৌনকর্মীর বসবাস। এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক শিশু-কিশোরী যৌনকর্মীও রয়েছে।

পতিতা-পল্লীর এক মুদি দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এখানে অনেক প্রভাবশালী যৌনকর্মী রয়েছে যারা পল্লীর বাইরে গোয়ালন্দ পৌর শহরসহ উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে নিজস্ব বাড়িঘর তৈরি করে সেখানে নিয়মিত বসবাস করছে। একই সঙ্গে নারীপাচার কাজেও তারা ওই বাড়িগুলোকে ব্যবহার করছে।

এ ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে ফুঁসলিয়ে আনা নতুন কোনো মেয়েকে সরাসরি পতিতা-পল্লীতে না এনে প্রথমে তাকে পল্লীর বাইরে ওই সব বাড়িতে রাখা হয়। সেখানে দুই-তিন দিন ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখার পর সুযোগ বুঝে সংশ্লিষ্ট যৌনকর্মী মেয়েটিকে পতিতা-পল্লিতে নিয়ে তাকে মোটা অঙ্কের টাকায় বিক্রি করে দেয়। তিনি আরো জানান, দালালের মাধ্যমে প্রতি মাসে গড়ে ২০ জন নতুন শিশু-কিশোরীকে এই পল্লিতে আনা হয়। পরে বাড়িওয়ালিরা তাদের জোর করে যৌন পেশায় বাধ্য করে।

যৌনকর্মী সাথী বলেন, চার বছর আগে আমার বয়স যখন ১৩, তখন দালালের খপ্পরে পড়ে আমি দিনাজপুর থেকে এই পল্লিতে আসি। তখন নগদ ৩০ হাজার টাকায় ওরা আমাকে বিক্রি করে দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে খারাপ কাজে রাজি না হওয়ায় বাড়িওয়ালি আমাকে মারপিটসহ অমানুষিক নির্যাতন চালায়। দিনের পর দিন ওরা আমাকে না খাইয়ে রেখেছে। এক মুঠো ভাতের জন্য তখন তাদের পায়ে ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছি। তাতেও মন গলেনি ওদের। শারীরিক নির্যাতন ও ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে একপর্যায়ে এ পথে নামতে বাধ্য হয়েছি।

তিনি আরো জানান, বর্তমানে এ পল্লিতে তাঁর মতো অনেক শিশু-কিশোরী রয়েছে। যাদের মনে জমে থাকা কান্নার শব্দ কেউ শুনতে পায় না। শিশুদের যৌন পেশার হাত থেকে সুরক্ষা করতে দৌলতদিয়া পতিতা-পল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কাজ করছে মুক্তি মহিলা সমিতি, পায়াকট বাংলাদেশ, অবহেলিত মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থাসহ স্থানীয় বেশ কিছু বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। পল্লির যৌনকর্মী পিংকী জানান, পতিতা-পল্লিকে ঘিরে এখানে যে পরিমাণ এনজিও গড়ে উঠেছে ওই সব এনজিও যদি তাদের নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে, তবে এ পল্লিতে শিশুযৌনকর্মীর সংখ্যা অনেক কমে যেত। অথচ এ পল্লিতে শিশু যৌনকর্মীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। দৌলতদিয়ায় মাসে ২৫ শিশু যৌন পেশায় জড়িত হচ্ছে।

তবে জ্বলছে আশার আলো
যৌনকর্মী শিশুদেও আপতত কোন খবর না থাকলেও তাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে আছে আশার খবর। পতিতার সন্তানদের পতিতা হবে চিরাচরিত এ ধারণা বদলাচ্ছে। তারা বেছে নিচ্ছে সমাজস্বীকৃত বিভিন্ন বিকল্প পেশা। সামাজিকভাবে চলতে চলতে তারা সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখছেন। অথচ একটা সময় পতিতার সন্তানরা এ ধরনের স্বপ্ন দেখতে পেত না। তবে এর মাঝে এখনও পল্লীর অপ্রাপ্তবয়ষ্ক বহু মেয়ে মায়েদের আদিম পেশায় লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।

এবার এই ধরনের শিশুদের এ রকম কিছু আলো আঁধারির গল্প রয়েছে। ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিগত কয়েক বছরের মতো দৌলতদিয়া যৌনপল্লীর তিনটি মেয়ে ও একটি ছেলে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে। এর মাধ্যমে নিষিদ্ধ পল্লীতে জন্ম হলেও মায়েদের পথে না হেঁটে বরং একটি স্বাভাবিক জীবন লাভের কঠিন সংগ্রামে একধাপ এগিয়ে গেল তারা। তবে লেখাপড়া করে এরা প্রতিষ্ঠিত হতে চাইলেও সামনে অপেক্ষা করছে তাদের জন্য আরও কঠিন সংগ্রাম।

গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া মডেল হাইস্কুল থেকে এ বছর পতিতাপল্লীর চারটি শিশু এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। এরা হল বিজ্ঞান বিভাগের শ্যামলী আক্তার (জিপিএ ৪.১৭), বাণিজ্য বিভাগের সিমা আক্তার (জিপিএ ৩.৫০), সোহেল রানা (জিপিএ ৩.০৬) এবং মানবিক বিভাগের মৌসুমী আক্তার ডানো (জিপিএ ৩.২৯)। পতিতাপল্লীতে জন্ম নেয়া এখানকার অধিকাংশ মেয়েশিশুকে ১২/১৩ বছর বয়সেই পতিতাবৃত্তিতে যুক্ত করা হয়। এ অবস্থার মধ্যেও এ চার শিশুর এসএসসিতে সাফল্য অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। উত্তীর্ণ সীমা ও মৌসুমী সেফ দ্যা চিলড্রেনের অর্থায়নে পরিচালিত স্থানীয় কেকেএস সেফ হোম, শ্যামলী আক্তার পায়াক্ট বাংলাদেশ পরিচালিত সেফ হোম এবং সোহেল রানা তার মায়ের কাছে থেকে লেখাপড়া করে। কৃতী শিক্ষার্থী শ্যামলী আক্তার জানায়, সে কলেজে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী। বাকি তিনজন কারিগরি কলেজে ভর্তি হতে ইচ্ছুক। কিন্তু এতদিন সেফ হোম তাদের থাকা-খাওয়া ও অন্যান্য খরচ চালিয়েছে। এখন তাদের কলেজে পড়ার খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই। অন্ধকার জগতে থাকা তাদের মায়েদের পক্ষেও তাদের পড়াশোনার খরচ চালানো সম্ভব নয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে তাই তারা অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

আলোর পথ খুঁজে পাওয়া এ শিশুদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে কেকেএস সেফ হোম প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন জানান, একজন শিশুর বয়স ১৮ বছর পার হলে অথবা তাদের তত্ত্বাবধানে না থাকলে তাকে সহযোগিতা করার সুযোগ থাকে না। সে ক্ষেত্রে ঝরে গিয়ে শিশুদের বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে এ হোম থেকে যাওয়া ১৮ জন মেয়ে বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের প্রচেষ্টায় পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে চাকরি ও বিয়ে হয়ে স্বাভাবিক সংসার করছে আরও অন্তত ২০ জন মেয়ে।

দৌলতদিয়া মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. শহিদুল ইসলাম জানান, পতিতাপল্লীর শিশুদের সুযোগ দেয়া হলে তারাও সমাজের মূল স্রোতধারায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। এসএসসির পর তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসহ সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে।

এ ব্যাপারে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন‘আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে যৌন পল্লীর শিশুদের জন্য একটি প্রজেক্ট দাড় করিয়েছি এবং সেখানে অনেক শিশুকেই বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ করে দিয়েছি।তবে বাহির থেকে আনা এবং যৌনল্লীর শিশুদের যাতে এই কাজে না জড়ায় সরকারের সেই দিকে খেয়াল আছে।

বাংলাদেশ সময়: ১৩৪৩ ঘণ্টা, ২৮ এপ্রিল ২০১৬
লেটেস্টবিডিনিউজ.কম/এসএফ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews