একজন প্রবীণ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘আপনজন থাকলে কী আর নিবাসে থাকি?’ আরেকজন বললেন, কেউ দেখতে আসে না। এক মেয়ে মাঝেমধ্যে টেলিফোনে খবর নেয়। করোনা–আতঙ্কে মেয়ে বলে দিয়েছে বাড়ি যাওয়ার দরকার নেই। গরম পানিতে লেবু চিপে খাওয়ারও পরামর্শ দিয়েছে মেয়ে।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গতকাল বুধবার বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের প্রবীণ নিবাসে গিয়ে একাধিক প্রবীণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয়। কেউ কেউ একেবারেই কথা বলতে অনিচ্ছুক। আবার কেউ কেউ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বললেও যাতে তাঁর নাম প্রকাশ করা না হয় তা বারবার সতর্ক করে দেন। কেননা এই প্রবীণদের অনেককেই ছেলে, মেয়ে বা পরিবারের অন্য কারও দেওয়া আর্থিক সহায়তায় চলতে হচ্ছে—যদি সেই টাকা দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তখন চলবে কেমনে?

প্রবীণ ব্যক্তি ও নিবাসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বললেন, অন্য সময়ই এই প্রবীণদের পরিবারের সদস্যরা খোঁজ নেন না, আর বর্তমানের করোনা–আতঙ্কের সময় তো আসবেনই না।

এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের গবেষণা বলছে, সব বয়সী মানুষই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তবে সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছেন এই প্রবীণেরাই। গত বছরের ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। বিশ্বের ১৭০টি দেশে ছড়িয়ে পড়া এ ভাইরাসে আজ বুধবার পর্যন্ত বাংলাদেশে আক্রান্ত হয়েছে ৩৯ জন। এ পর্যন্ত মারা গেছেন পাঁচজন, যাঁদের সবাই ছিলেন প্রবীণ। ১৮ মার্চ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রথম যে পুরুষ মারা যান, তাঁর বয়স ছিল ৭০ বছর। ওই ব্যক্তি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। পাশাপাশি তাঁর হার্টে স্টেন্ট পরানো ছিল। আজ বুধবার যিনি মারা যান, তাঁর বয়স ৬৫ বছর।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা সেদিনই নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বয়স্ক ব্যক্তিদের সুরক্ষায় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেন।

জীবনে বিশ্বাস, এখনো। ছবি: মানসুরা হোসাইনবাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা করোনাভাইরাস প্রতিরোধে এই প্রবীণদের বাইরে চলাফেরা সীমিত করে দিয়েছেন। তা ছাড়া এই সময়ে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কেউ যাতে নিবাসে প্রবেশ না করেন, তা–ও নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে মুখে মাস্ক এবং হাত যথাযথভাবে পরিষ্কার করেই প্রতিবেদক কয়েকজন প্রবীণের সঙ্গে কথা বলেন।

যাঁরা নিবাসে আছেন, তাঁদের অনেকেই ১০ বছর, ৬ বছর বা দীর্ঘ সময় ধরেই থাকছেন। কেউ পরিবারের সদস্যদের আচরণে কষ্ট পেয়ে, অভিমান করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিবাসে এসেছেন। ছেলে বা মেয়ে বিদেশে চলে যাওয়ায় কেউ বাধ্য হয়েছেন নিবাসে আসতে। কেউ কেউ নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিবাসে থাকার। অন্য সময়ও স্বজনদের খোঁজ নেওয়া বলতে হুটহাট কেউ হয়তো দেখতে আসেন অথবা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পাঠিয়ে দায়মুক্ত হন। তাই করোনা–আতঙ্কের সময় পরিবারের স্বজনেরা খোঁজ নেবেন, সে আশাও আর করেন না এই প্রবীণেরা।

প্রবীণেরা জানালেন, কর্তৃপক্ষ করোনাভাইরাস প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে জানিয়েছে। নিয়মিত হাত ধোয়া, মুখে মাস্ক লাগানো, বাইরে না বের হওয়া, বড় কোনো জমায়েতে অংশ না নেওয়ার বিষয়গুলো তাঁরা মেনে চলারও চেষ্টা করেন।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইংরেজি বিষয়ে শিক্ষকতা করা মেহেরুননেছা বললেন, ‘আমি ঘরেই থাকি। অন্যদের সঙ্গে তেমন একটা মিশিও না। আমার তো মনে হয় আমি নিরাপদেই আছি।’ মুক্তিযোদ্ধা ভাতাপ্রাপ্ত মো. গোলাম হোসেনও জানালেন, একদম প্রয়োজন ছাড়া তিনি বাইরে বের হন না।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে বাবার রাখা নাম মিনি মর্জিনা পরিবর্তন করে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন চন্দনা শতদ্রু। ৭৮ বছর বয়সী এই প্রবীণও বললেন, শারীরিকভাবে যেহেতু তিনি সক্ষম, তাই তিনি মনে করেন, করোনাভাইরাস তাঁকে ধরলেও খুব একটা কাবু করতে পারবে না। একই সঙ্গে যোগ করলেন, তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও ফোনে এই পরিস্থিতিতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন।

প্রবীণ নিবাসে নিরাপদ বোধ করেন মো. গোলাম হোসেন। ছবি: মানসুরা হোসাইনইতালিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের গড় বয়স ৭৮ দশমিক ৫। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, চীনে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের মধ্যে যাঁদের বয়স ৮০-এর বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ১৫ শতাংশের বেশি। বিশেষজ্ঞরা প্রবীণদের বেশি আক্রান্ত হওয়ার পেছনে প্রবীণদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় বলে তাঁরা কোনো রোগ বা জীবাণুর সঙ্গে লড়তে পারেন না বলে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন গবেষণায়। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন, হার্টের সমস্যা, ক্যানসার, হাঁপানির মতো সমস্যা থাকলে করোনাভাইরাসে মৃত্যুর আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।

প্রবীণ নিবাসে একজন প্রবীণ বললেন, তাঁর দীর্ঘদিন ধরেই সর্দি–কাশি। তাই তিনি বেশ ভয়েই আছেন করোনাভাইরাস নিয়ে।

স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ও সহায়তাপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘে বর্তমানে ৪৮ জন প্রবীণ বসবাস করছেন। এ সংঘের ইনস্টিটিউট অব জেরিয়েট্রিক মেডিসিনের বার্ধক্য বিষয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মহসীন কবির বললেন, নিবাসে থাকা প্রবীণদের সচেতন করতে বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে। নিবাসের সঙ্গে লাগোয়া হাসপাতাল আছে। অ্যাম্বুলেন্স আছে। তবে সরকারঘোষিত সবমিলে বৃহস্পতিবার থেকে ১০ দিনের ছুটিতে হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, শুধু জরুরি বিভাগ খোলা থাকবে।

মহসীন কবীর করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভিটামিন সি আছে, এমন খাবার বেশি করে খাওয়ার পরামর্শ দেন। মহসীন কবীর যখন প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছিলেন, পাশেই থাকা নিবাসী মেহেরুননেছা বলছিলেন, এত দিন হাসপাতাল খোলা থাকায় মানুষজন ছিল। হাসপাতালটিও বন্ধ হয়ে গেলে একা একা লাগবে। মহসীন কবীরকেই অনুরোধ করলেন, যাতে মাঝেমধ্যে এসে তাঁদের দেখে যান।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews