প্রজাতন্ত্রের বা অন্য কোনো পাবলিক বা প্রাইভেট সেক্টরের এমন কোনো কর্ম আছে কি—যেটাতে
১৫-১৮ বছর আগে যিনি যোগদান করে অবিচ্ছিন্নভাবে অদ্যাবধি কাজ করছেন, তাঁর সঙ্গে ওই কর্মে সদ্য যোগদান করা অন্য ব্যক্তি মাস শেষে সমান বেতন পাবেন? অন্য কথায়, ২০০২ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারপতি ২০১৮ সালের জুন মাসের শেষে যে পরিমাণ অর্থ বেতন-ভাতাদি হিসেবে সরকারি কোষাগার থেকে পাবেন, সেই একই পরিমাণ অর্থ পাবেন মে মাসের ৩০ তারিখে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়া ১৮ জন বিচারপতি। এর
পক্ষে কী যুক্তি থাকতে পারে, সেটা ভেবে পাই না। যুক্তি একটাই হতে পারে, আর সেটা হলো উভয়ের বিচারিক ক্ষমতা যেহেতু সমান, বেতনও সেহেতু সমান। অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘকাল বিচারকর্মে নিয়োজিত থেকে অর্জিত যোগ্যতার আর্থিক মূল্য আমরা নির্ধারণ করতে অপারগ।
ভারত-পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনায় আমাদের বিচারপতিদের বেতন-ভাতা অনেক কম। আর বিচারব্যবস্থায় হরেক রকমের গাফিলতির কারণে হাইকোর্টের বিচারপতিদের প্রতিবছর শুনতে হয় ৩০ হাজারের বেশি জামিনের মামলা। সাধারণত জামিনের আবেদন প্রথম করা হয় ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে, ম্যাজিস্ট্রেট জামিন না দিলে সেই জামিন নামঞ্জুর করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা হয় দায়রা আদালতে। দায়রা বা অতিরিক্ত দায়রা বিচারকও জামিন না দিলে তার বিরুদ্ধে জামিন চেয়ে আবেদন করা হয় হাইকোর্টে। বছরে এই ধরনের জামিন আবেদন-মামলা দায়ের হয় হাজার হাজার। প্রতিবছর জট বাড়তে থাকে। অভিজ্ঞ আর নতুন বিচারপতি উভয়ের বেতন-ভাতাদি সমান, বাজেটে গবেষণা সহকারী, বিদেশভ্রমণ বা বিনোদনের অর্থ বরাদ্দ নেই, অধস্তন আদালতের বিচারকেরা জামিন না দেওয়ার কারণে জামিন মামলার পাহাড়সম স্তূপ, কাজের চাপ সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা আর বাজেট নিশ্চুপ।
এবারের বাজেটে দেখলাম ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সরকারের ধার শোধ বাবদ (আসল+সুদ) বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বাজেটের শতকরা প্রায় ১১ ভাগ। অতএব, এখন দেখা যাক গত কয়েক বছরে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয় বাবদ বরাদ্দ হয়েছে বাজেটে শতকরা কত ভাগ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা, আইন ও বিচার বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ২১৯ কোটি টাকা, অর্থাৎ মোট বাজেটের ০.৪৬ শতাংশ। ২০১৬-১৭ সালে ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকার বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪২৩ কোটি টাকা, বাজেটের ০.৪৪ শতাংশ। ২০১৭-১৮ বাজেটে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকার বাজেটে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা, বাজেটের ০.৩৯ শতাংশ। আর এবারের ২০১৮-১৯ বাজেটে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ হাজার ৫২১ কোটি টাকা, বাজেটের ০.৩২ শতাংশ।
দেখাই যাচ্ছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভাগ্যে জুটেছিল শতকরা ১ ভাগের অর্ধেকের কিছু কম। প্রস্তাবিত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভাগে জুটবে শতকরা শূন্য দশমিক ৩ দুই ভাগ। অন্য কথায়, বাজেটের প্রতি ১০০ টাকায় আমরা পাব ৩২ পয়সা। শতকরা হিসেবে বরাদ্দ প্রতিবছরই কমছে। প্রায় সবারই বাড়ে, কমে শুধু আইন, বিচার ও আইনের শাসনের ক্ষেত্রে।
বরাদ্দের টাকার অঙ্কে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যাদের টাকার হিসাবে আমরা বলি খুচরা প্রতিষ্ঠান। যেমন আইন কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস, জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন, জুডিশিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। এদের কিছু খুচরা বরাদ্দ দেওয়া হয়, অর্থাৎ দুই কোটি, চার কোটি, সাত কোটি বা ওই গোছের এত অল্প টাকা যে খুঁজে বের করতে যে সময় ব্যয় হবে আর যে বরাদ্দের পরিমাণ খুঁজে পাব, তাতে পড়তা পড়বে না।

২.
সুপ্রিম কোর্টেরও কপাল মন্দ। ২০১৫-১৬ সালে সুপ্রিম কোর্টের ভাগ্যে জুটেছিল ১৩৫ কোটি টাকা; ২০১৬-১৭ সালে ১৬৮ কোটি; ২০১৭-১৮–তে বরাদ্দ বাড়েনি, ছিল ১৬৮ কোটি, আর আসছে ২০১৮-১৯ সালে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা। গত বছরের তুলনায় আসছে বাজেটে ১২ কোটি টাকা বেশি রাখা হয়েছে, অর্থাৎ প্রতি মাসে বাড়তি ১ কোটি টাকা। ১৮ জন নতুন বিচারপতির বেতন-ভাতা, গাড়ি-পেট্রল, কাগজপত্র, কম্পিউটার-প্রিন্টার-বিদ্যুৎ, সহযোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী, রায় লেখার কাগজ-কালি ইত্যাদির ব্যয় মিটিয়ে প্রতি মাসে এই ১ কোটি টাকা থেকে সুপ্রিম কোর্টের নতুন কিছু করার কোনো অর্থ থাকার কথা নয়। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, আগামী অর্থবছরে নতুন বিচারপতি নিয়োগের কোনো সম্ভাবনা নেই।
কারণ, বরাদ্দ নেই। গত বছরের তুলনায় এই বছরের বরাদ্দ যদি অন্তত ২০০ কোটি টাকা হতো, তাহলেও আশা করা যেত, আরও কিছু নতুন বিচারপতি নিয়োগ পেতে পারেন। বেতন-ভাতাদিও বাড়বে না। কারণ, বরাদ্দ রাখা হয়নি। দু-তিন মাস আগে অধস্তন আদালতে ৩৩ বছর দায়িত্ব পালন করা এবং স্বাভাবিকভাবেই অবসরের দ্বারপ্রান্তে এসে এক বিচারক আমাকে জানিয়েছিলেন যে আগের মাসে সরকারি সফরে জীবনে প্রথম বিদেশে গিয়েছিলেন তিন সপ্তাহের জন্য। ৩৩ বছরের বিচারক-জীবনের প্রথম এবং সম্ভবত শেষ বিদেশভ্রমণ। লোকমুখে শুনেছি, আমাদের নীতিনির্ধারণী বিচারপতি মহলে একটা ধারণা নাকি প্রচলিত আছে যে বিচারকদের বিদেশ থেকে শেখার কিছুই নেই, আর তাই যুগের পর যুগ ধরে বিচারক ও বিচারপতিদের বিদেশভ্রমণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় না। তাঁরা কখনো বিদেশে না গিয়ে বেশ সুখে-শান্তিতে আছেন। ভাগ্যিস, আমাদের ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, প্রশাসক-পুলিশ, কৃষিবিদ-অর্থনীতিবিদ—কেউই নিরবচ্ছিন্ন এবং ক্রমাগতভাবে দেশের সুখ-শান্তি ভোগ করার সুযোগ পান না। তাঁদের ট্রেনিং, উচ্চশিক্ষা বা নতুন পদ্ধতি ও সমাধানের সঙ্গে পরিচিত হতে বিদেশে যেতে হয়। তাঁদের জন্য এই বাবদ বরাদ্দ থাকে।
বিচারক-বিচারপতিদের জন্য এই বাবদ বরাদ্দ থাকে না। অতএব, প্রশিক্ষণ, উচ্চতর শিক্ষা কিছুই হয় না বললেই চলে। অবশ্য গত বছর চালু হওয়া একটা বিশেষ প্রজেক্টের আওতায় অধস্তন আদালতের বেশ কিছু বিচারক এখন অস্ট্রেলিয়ায় যাচ্ছেন। আরও বেশি যাওয়া উচিত, অন্য দেশেও।

৩.
অর্থ বরাদ্দ ছাড়া দেশের কোনো বিভাগ, কার্যক্রম, সেক্টর, এমনকি ভৌগোলিক অংশের অগ্রগতি বা উন্নতি সম্ভব হয় বলে কেউ নিশ্চয়ই দাবি করবেন না, সেই কারণেই ২০০৯-১০-এর ১ লাখ ১৪ হাজার কোটি টাকার বাজেট ৯ বছরে চার গুণের বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। আইন ও বিচারের বাজেট আনুপাতিক হারে বাড়ে তো না-ই, বরং শতকরা হিসাবে গত কয়েক বছরে ক্রমাগতভাবে কমেছে। অনেকগুলো কারণের মধ্যে অর্থের অভাবও আইন ও বিচারব্যবস্থার করুণ অবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী। শুধু আইন ও বিচার নয়, আইনশিক্ষার জন্যও সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের দেশই একমাত্র দেশ, যার কোনো স্থায়ী আইন ক্যাডার বা স্থায়ী আইন কর্মকর্তা নেই। পাবলিক প্রসিকিউটর, সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল—সবাই রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং অস্থায়ী ভিত্তিতে কাজ করেন। সরকারের যখন খুশি তখন তাঁদের চাকরির অবসান ঘটায়।
স্থায়ী আইন ক্যাডার লাগবে, বিচারকাজে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও সরঞ্জামাদি, সেই সঙ্গে দক্ষ কর্মীর নিয়োগ অত্যাবশ্যক এবং দরকার দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর শিক্ষা। সংস্কারের দিকনির্দেশনার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের প্রাপ্ত চাকরিকালীন বেতন ও সুবিধাদি প্রলম্বিত করার জন্য চাকরির স্থান হিসেবে আইন কমিশন নামক প্রতিষ্ঠানটির পরিবর্তে সত্যিকার সংস্কারপন্থী উদ্যোগী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আইন কমিশন গঠন করতে হবে। সর্বোপরি আইন ও বিচারের গুরুত্ব আমলে নিয়ে এ খাতে বরাদ্দ অবিলম্বে দ্বিগুণ করতে হবে। এতে খরচ বাড়বে মাত্র ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মতো। সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকার বেশি বাজেটের অর্থবছরে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা তেমন বেশি চাওয়া নয়, শতকরা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের কম।
অবশ্য এত বছর এত কম টাকা পেয়ে আমরা গরিবি হালতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, তাই হঠাৎ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বাড়ালে আমরা হকচকিয়ে যাব। তাই এই অর্থবছরে ৫০০, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১ হাজার এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে দেড় হাজার কোটি টাকা বাড়াতে হবে। অবশ্য যদি মনে করেন আইনের শাসন আর ন্যায়বিচারের কোনো প্রয়োজন নেই, গুলি করে মানুষ মেরে সব সমস্যার সমাধান হবে, তাহলে বাজেট যা আছে, তা-ই থাক।

শাহদীন মালিক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের আইনের শিক্ষক



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews