একজন স্কুলছাত্রী আত্মহত্যা করলো, নাকি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাকে ‘হত্যা’ করলো? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাকি আসলে রাষ্ট্র? এই ‘হত্যাকাণ্ডগুলো’ সংঘটিত করবার যন্ত্র আসলে কোনটি? ৩ ডিসেম্বর ভিকারুন্নেসা নূন স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েন এবং পরে তার বাবা-মায়ের উপস্থিতিতে তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত বাবা অধ্যক্ষের কাছে অনেক অনুনয় করেও লাভ হয়নি। পরিণতি- আত্মহত্যা। যার গেলো, তার গেলো। আমাদের কী আসে যায়? এই মানসিকতা জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তা না হলে আজ সারাদেশের স্কুল-কলেজগুলো থেকে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের প্রতিবাদ করার কথা। আমাদের যাদের একটু আধটু কষ্ট হয়, তারা দু’কলম লিখি। কী লাভ! কোনও শিক্ষক, শিক্ষা বিক্রেতা, সিলেবাস বিক্রেতা, শিক্ষা কর্মকর্তা, শিক্ষামন্ত্রী অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবসা নিয়ে যারা জড়িত তাদের কিন্তু ন্যূনতম নজর নেই এদিকে। কারণ, ব্যবসা ভালো চললেই হলো। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোটাই এমনভাবে তৈরি হয়েছে এবং নাগরিক পরিচালনার কৌশলটি এত উদার যে আমরা সবাই উদার হয়ে গিয়েছি। আমাদের চিন্তার প্রকোষ্ঠটি সব সময় খালি। এটা একদিক দিয়ে ভালো। কারণ, সমাজে বা দেশে অভ্যন্তরীণ ঝামেলা কম হয়। সমাজের মূল কাঠামোর ভিত্তি হিসেবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হয়। যার অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দুর্বল এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজনীতির দাপটে যে প্রতিষ্ঠানটি আদতে কখনোই আদর্শ হয়ে উঠতে পারেনি। শিক্ষকরাও রাজনীতি, চেয়ার এবং অন্যান্য অনেক কিছুর পেছনে ছোটাছুটিতে ব্যস্ত। আমরা কিংবা আমাদের পূর্ববর্তী মানুষরা যা কস্মিনকালেও কল্পনা করতে পারি না। শিক্ষকদের চিন্তার গভীরতা এত কমে যাচ্ছে যে, শিক্ষক এত বড় শিক্ষা দিতে যাচ্ছেন তিনি বুঝতেই পারলেন না যে এর পরিণতি কী ভয়াবহ হতে পারে। আমি বলছি না যে আমাদের যুগে এমন বহিষ্কারের ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে– আমরা এই সময়ে কিশোর-তরুণদের নিয়ে একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তাই কতখানি কঠোর আচরণ করবো তারও একটা নিজস্ব এবং সম্মানজনক মিটারস্কেল থাকা প্রয়োজন। কিশোর তরুণদের কতখানি সামাজিক যুক্তিবোধ তৈরি করতে পারছি, তার আগে ভাবতে হবে আমরা কতটুকু সামাজিক যুক্তিবোধের ধারক এবং বাহক হতে পেরেছি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ছাত্রছাত্রীর আচরণের যে পারস্পরিক সম্পর্ক সেটি সমাজের জন্য খুবই গুরুত্ব বহন করে এসেছে এতদিন, তা যেন বর্তমানে অনেকটাই অনুপস্থিত। ‘নকল ঠেকাও, নকল ঠেকাও’ একটা ধুয়া তুলে সাধু সাজার চেষ্টা করছেন কিংবা বাহবা কুড়াবার চেষ্টা করছেন– তারা কী আদতেই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে ভাবছেন?

শিক্ষা নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের কথা ধর্তব্যের মধ্যেই তো আনা হয় না। তাদের চিন্তাগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রূপ দিতে গেলে ব্যবসা ভালো করা যাবে না। সব সময় লাভ লোকসানের খাতায় খরচার হিসেবে পড়ে যাচ্ছে আমাদের সন্তানরা। তারা পড়া, পরীক্ষা আর বইখাতার বিশাল চাপে অস্থির। একজন মানুষ সামান্য জ্ঞান হওয়ার পর স্কুলে ভর্তি হয়। তারপর একে একে কতগুলো বছর কাটে কাগজ আর কলমের মধ্যে। প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে তার সাধ্যমতো জ্ঞানচর্চার। কিন্তু চাপিয়ে দেওয়া জ্ঞান হলে নকলের দিকেই হাত প্রসারিত হবে। এটাই বাস্তবতা। অরিত্রীর মতো আরও অনেকের এই প্রসারিত হাত যে আমাদের গালে একেকটা আঘাত! এটুকু বোঝার মতো মেধাস্তর আছে কিনা সেটাও সন্দেহের অতীত নয়।

তাই সেই বহিষ্কারের আদেশ দেওয়া শিক্ষককে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে লাভ নেই। প্রিয় সন্তানতুল্য ছাত্রছাত্রীদের প্রতি আহ্বান, আপনারা একটি সুষ্ঠ-সুস্থ-বৈষম্যহীন শিক্ষানীতিমালার জন্য দাবি তুলুন। শিক্ষাকে যেন রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে, শিক্ষাকে সুপারশপ থেকে বের করে আনতে হবে। সেজন্য আপনারা সচেতন হোন। আপনাদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। চিন্তার প্রকোষ্ঠগুলোকে খালি না রেখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে উজ্জীবিত করুন।

লেখক: সিনিয়র ফটোসাংবাদিক, দৈনিক কালের কণ্ঠ



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews