কে কাকে ক্ষমা করবে?

অবশেষে বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসমাবেশ করতে পারলো এটা রাজনৈতিক একটা স্বস্তির লক্ষণ। আমি রাজনৈতিক কোনো বিশ্লেষক নই। এই দেশের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে সব সময় সুন্দর, স্বস্তিকর, আনন্দদায়ক পরিবেশের কথা ভাবি। দেশটা সুন্দর হবে, দেশের মানুষগুলোর মন আরো উদার হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ থাকলেও তাদের মধ্যে কথাবার্তা ও আচার আচরণ হবে বন্ধুর মতো।

প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু সেটা হবে মেধার ভিত্তিতে অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায়। একে অন্যের কাজের সমালোচনা করবেন কিন্তু তা যেন হুমকির কারণ হয়ে না দাঁড়ায়। চুপ, একদম চুপ... এ ধরনের শাসানো বাক্যে সুন্দর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একজন অন্যজনকে দেখে নেয়ার হুমকি দিলেই প্রতিপক্ষ যতই দুর্বল হোক তার সবল হতে সময় লাগে না। তখন তৃতীয় পক্ষ কারও কারও বন্ধু হয়ে দাঁড়ায়।

প্রথম পক্ষ অথবা দ্বিতীয় পক্ষ না চাইলেও তৃতীয় পক্ষের ইন্ধনে সোচ্চার হয়। কোনো কারণ ছাড়াই হয়তো তাদের মধ্যে আবার শুরু হয়ে যায় ঠোকাঠুকি... তৃতীয় পক্ষ এই সুযোগে গরম তেলে ফোড়ন দেয়। ব্যাস জ্বলে ওঠে চারপাশ। তারপর হয়তো লেগে যায় বিবাদ। তৃতীয় পক্ষ দূর থেকে বসে বসে খেলা দেখে আর ভাবে খেলাতো ভালোই জমেছে... লাগ ভেলকি লাগ চোখে মুখে লাগ। ছুহ! মন্তর ছুহ!

যেই জিতুক সে তো আমার। হ্যাঁ, একটা পর্যায়ে একপক্ষ তো জিতেই যায়। কিন্তু মাঝখানে ঠেলাঠেলি, ঠোকাঠুকি আর দেখে নিব টাইপের কথাবার্তা ও আচরণের ফলে দেশের যা ক্ষতি হয় তার আর পোষাণো যায় না।

তবে আশার কথা বাংলাদেশ জ্বালাও পোড়াও আর ‘হরতাল’ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হয়েছে। এই সময়ের স্কুলগামী কোনো কিশোর-কিশোরী হয়তো হরতাল সম্পর্কে কিছুই বলতে পারবে না। কিন্তু একটা সময় এই বয়সী ছেলে-মেয়েরাই হরতালের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কগ্রস্ত ছিল। কারণ ‘হরতাল’ তাদের পরীক্ষা নষ্ট করে দিত। স্কুলে ক্লাস হতো না হরতালের কারণে।

হরতালের কারণে এই দেশে গভীর রাতেও পরীক্ষার হলে বসতে হয়েছে এই দেশের কোমলমতি ছাত্র-ছাত্রীকে। সে কারণে হরতাল শব্দটিই এক সময় ভয়াবহ আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কথায় কথায় হরতাল। জীবন যাপন স্থবির। সে এক দুঃসহ পরিস্থিতির মধ্যে সময় কেটেছে এই দেশের মানুষের।

তারপর এক পর্যায়ে আতঙ্ক ছড়ালো ‘অবরোধ’ নামে আরেকটি শব্দ। কী বীভৎস ছিল সে সময়কার পরিবেশ। রাস্তায় গাড়িতে আসছিল নিরীহ মানুষ। হঠাৎ গাড়িতে ফাটলো পেট্রোল বোমা। মানুষ পুড়ে ছাই হলো। ট্রেনের কামরায় রাতের অন্ধকারে আগুন দেয়া হলো। রেল লাইন উপড়ে ফেলা হলো।

কেন এগুলো করা হয়েছিল সে ব্যাপারে সন্তোষজনক কোনো ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত দেশের জনগণ পায়নি। তাই ভয় দূর হয়নি দেশের জনগণের মাঝে। জাতীয় নির্বাচন এলে এই ভয় কেন যেন বৃদ্ধি পায়।

বলছিলাম বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জনসভার কথা। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই জনসভার অনেক তাৎপর্য আছে। সরকার তার বিরোধী পক্ষকে রাজনৈতিক চর্চা করার সুযোগ দিচ্ছে না এ ধরনের অভিযোগ অনেকেই করে আসছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভা প্রমাণ করে এ ধরনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নাই।

বিএনপি একটি সফল জনসভা করেছে একথা বলাই যায়। যদিও এই জনসভাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হয়েছিল। সাধারণ মানুষ ও পথচারীরা ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন। সামনে আসছে ভোটের মওসুম। আমরা ধরে নিতেই পারি সরকারি দল, বিরোধী দল উভয়ই এভাবেই রাজধানীতে জনসভা ডাকবেন, জনসভা করবেন।

তখন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির চিত্রটা আরো কত করুণ হবে তা ভাবতে গিয়ে আতঙ্কিত হচ্ছি। একথা সবাই জানেন, রাজধানী ঢাকা এখন ভয়াবহ যানজটের শহর। লোকসংখ্যা অনেকগুণ বেড়েছে। কাজেই নির্বাচনের মৌসুমে প্রকাশ্যে এভাবে জনসভা না করে বিকল্প কোনো পদ্ধতি চালু করা যায় কি না ভাবা জরুরি।

দেশে এখন তো অনেকগুলো টেলিভিশন চ্যানেল। নির্বাচনী প্রচারে টিভি চ্যানেলগুলোর সহযোগিতাও নেয়া যেতে পারে।

যা বলছিলাম, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সম্পন্ন করা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছেন। এই দাবি তিনি করতেই পারেন।

কিন্তু তিনি সরকারের উদ্দেশ্যে একটু ‘ঠোকাঠুকি’ টাইপের বক্তব্যও দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগ সরকারের সকল দোষ ক্ষমা করে দিবেন। বিএনপি নেত্রীর বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, ‘খালেদা জিয়া এখন ক্ষমার নাটক করছেন। তিনি জানেন, তিনি যে মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন তা আওয়ামী লীগ দেয়নি।

তারই তৈরি করা লোকজন ১/১১ সরকার মামলাটা দিয়েছে। খালেদা জিয়া জানেন, হয়তো এসব মামলায় তার দণ্ড হয়ে যেতে পারে। এজন্য তিনি ক্ষমার নাটক সাজিয়েছেন’।

একথা সবাই জানেন ও মানেন যে জাতীয় নির্বাচন অনেকটা কথার লড়াইও। জনসভায় তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে ভালো বক্তৃতা করাও একজন জননেতার অন্যতম গুণ। কিন্তু কথার লড়াই যখন হিংসা আর বিদ্বেষ ছড়ায় তখনই দেখা দেয় বিপত্তি। তখন ‘কে কাকে ক্ষমা করবে’ এই প্রতিযোগিতায় নামলেই ভয়াবহ বিপদে পড়বে দেশের জনগণ।

আশঙ্কা হচ্ছে ভবিষ্যতে নির্বাচনী ডামাডোলে কথার লড়াই কী সত্যি সত্যি অতীতের মতোই হিংসা আর বিদ্বেষ ছড়াবে? আবারও সর্বনাশা হরতাল আর অবরোধ কর্মসূচি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলবে? বালাইষাট! দেশের মানুষকে যেন আর কোনোদিন এরকম দুর্বিষহ জীবনে ফেলা না হয়। ভালো থাকবেন সকলে।

রেজানুর রহমান: সাংবাদিক, নাট্যকার, কথাসাহিত্যিক।
rezanur.alo@gmail.com



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews