ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন নিয়ে দেশে আলোচনার ঝড় বইছে। ভাবনার গতিপথ কখনও প্রথাবদ্ধ ধারায় প্রবাহিত; কখনও বিশ্লেষণের পরিসর এমন প্রাসঙ্গিক উপাদানে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠছে, যা উপেক্ষা করা চলে না। মতামত আসছে নানা ভঙ্গিতে, নানা দৃষ্টিকোণে, নানা মাত্রায়।

কথা বলছেন-রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ, একাডেমিশিয়ান- এমনকি দেশি-বিদেশি গোষ্ঠী বা সংস্থা- সবাই। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক অংশীজনের মতামত বিদ্যমান বাস্তবতায় যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করছে না। এমনকি বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী অথবা দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও যে নির্ভরতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ- এমন ভাবারও সুযোগ নেই। এ ধরনের আস্থার সংকটে বিভ্রান্ত জনপরিসরে রাজনৈতিক ইস্যুতে মতপ্রকাশ করা রীতিমতো একটা চ্যালেঞ্জ।

একটা জটিল আর্থ-সামাজিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে দেশ। স্বাধীনতা-উত্তরকালে বঙ্গবন্ধু হত্যা, সামরিক শাসন, দায়মুক্তি ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে তামাশায় পরিণত করার মতো ঘটনা দেশ প্রত্যক্ষ করেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। ’৯০ পরবর্তীকালে পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটলেও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি ও সামাজিক অস্থিরতার লেগাসি জাতিকে বহন করতে হয়েছে।

নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে ২০০৮ সাল থেকে নতুন অঙ্গীকারে দেশ সামনে এগোতে শুরু করে। এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়।

প্রথমত, বিশ্বায়নের নতুন ধারণা; ভূ-রাজনীতি, পরিবর্তিত ব্যবস্থায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে সম্পর্ক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি সরকারের কর্মসূচিতে প্রাধান্য পায়। দ্বিতীয়ত, দেশের নাগরিকদের, বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে পরিণত করা ও লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করে দেশের বিশাল নারী শক্তিকে উৎপাদনশীল জনশক্তিতে বদলে ফেলার অঙ্গীকার রাষ্ট্রীয় এজেন্ডায় মনোযোগ আকর্ষণ করে।

তৃতীয়ত, সুশাসন নিশ্চিত করার পথে দুর্নীতি, অপচয় ও অদক্ষতাকে চিহ্নিত করে উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এমডিজির বিভিন্ন মানদণ্ডে লক্ষ্য পূরণ, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া; এমনকি এসডিজির অভীষ্ট অর্জনে দেশকে অনেকটাই সাবলীল মনে হওয়াটা নিঃসন্দেহে ২০০৮-পরবর্তী সংস্কারমূলক জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়নের সুফল বলে ধরে নেয়া যায়। তবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবাধ অনুশীলন ক্ষেত্র তৈরি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য করতে না পারলে দেশের সোনালি সম্ভাবনা যে ম্লান হয়ে পড়বে, এ বিষয়ে সবাই প্রায় একমত।

যে বিষয়ে ভিন্নমত নেই তা হল, জনসাধারণের বৈষয়িক সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। জীবনমানে আধুনিক রূপান্তর এসেছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন হয়েছে। সামাজিক চাহিদা বদলেছে। চিরকালীন মূল্যবোধের জায়গাগুলো নতুন মাপকাঠি পুনর্গঠন করছে। প্রযুক্তির নতুন সংযোজন শুধু কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য বা যোগাযোগের পরিসরে নীরব বিপ্লব ঘটায়নি, নাগরিকের মনোজগতে; এমনকি সমাজ মননেও কাঠামোগত রূপান্তর ঘটিয়ে ফেলেছে।

মানুষ আত্মকেন্দ্রিক হয়েছে, বিচ্ছিন্নতা বেড়েছে। সমষ্টিগত নাগরিকতাবোধ খানিকটা হালকা হয়েছে। অন্যদিকে রাজনীতি চর্চায়ও চরিত্রগত পরিবর্তন প্রবল হয়ে উঠেছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ত্যাগী শিক্ষক, চিকিৎসক ও আইনজীবীদের জায়গা নিয়েছে নব্য ধনিক ব্যবসায়ী শ্রেণি। সামাজিক অনুশীলনেও কপটতা, ভুয়া তথ্য বা মিথ্যাচারের সংস্কৃতি প্রশ্রয় পেয়েছে, রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে পথের ন্যায্যতা মূল্য হারিয়েছে। বিত্ত ও পেশির দাপট আমজনতাকে খানিকটা নিষ্ক্রিয়, নিরাসক্ত করেছে কিনা সমাজতাত্ত্বিকরা নিশ্চয়ই ভেবে দেখবেন।

এবার নির্বাচনের প্রসঙ্গে ফিরি। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ৫৫ লাখ ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছে ১৫ লাখ। নির্বাচন কমিশন বলছে, প্রায় ৩০ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের একাংশ ভোট প্রদানে এক ধরনের অনীহা লক্ষ্য করেছেন।

অনেকে বলেছেন, ইভিএম যন্ত্রের কারসাজিও এখানে ভূমিকা রেখে থাকতে পারে। অনেক সাংবাদিকদেরও ধারণা, এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে তারা একই সঙ্গে বলছেন, নির্বাচনে অংশ নেয়া বা পরিচালনার কাজে যুক্ত কোনো ব্যক্তির ওপর প্রশাসনিক চাপের কোনো প্রমাণ ছিল না। কারচুপিরও কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ছিল।

বিরোধীরা উচ্চকণ্ঠ- কারচুপির কৌশল অভিনব। জনতার নির্লিপ্ততা, ঔদাসীন্য ও ভোটারের নগণ্য উপস্থিতি সংশয়ের মূল ভিত্তি। তাদের ধারণা, মানুষ ভেবেছে নির্বাচনের ফলাফল পূর্বনির্ধারিত। পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে অভিজ্ঞতা বলে, পোলরেট বেশি হলে ন্যারেটিভ বদলে যায়। কম হলেও বিশ্লেষণের রেখাচিত্র পরিচিত ছকে ভেসে ওঠে। আর ধারণার এ প্যাটার্ন পূর্ব অনুমিত। বিপদ হল, বিভ্রান্তির এ ধোঁয়াশায় সত্যিকারের বিচ্যুতি শনাক্ত করার সুযোগ থাকে না।

যন্ত্রের কারসাজি সংক্রান্ত যে অভিযোগটি সর্বাধিক আমলযোগ্য তা হল, ভোটারের বায়োমেট্রিক সমর্থন ছাড়া নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভোট প্রদানের সক্ষমতা। অভিযোগে স্বীকার করা হচ্ছে, যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাত্র ১ শতাংশ ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা এমন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পেরেছেন। দ্বিতীয় অভিযোগটি হল, দীর্ঘ সারিতে দাঁড় করিয়ে ভোট প্রদানে কৃত্রিমভাবে ধীরগতি সৃষ্টি করা হয়। তৃতীয় অভিযোগ হল, ফলাফল প্রকাশে অহেতুক বিলম্ব করা।

এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই যে, নতুন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে অভিযোজনের সময় কিছু বাস্তব ত্রুটি-বিচ্যুতির মুখোমুখি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সম্ভাব্য সাময়িক অসুবিধার কারণে ব্যবস্থাপনার টেকসই ও প্রযুক্তিগত উত্তরণকে ঠেকিয়ে রাখা সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে কখনই সমীচীন নয়। উদ্দেশ্য সৎ থাকলে যে কোনো সীমাবদ্ধতাকে কাটিয়ে ওঠা মানুষের পক্ষে কখনই অসম্ভব হয়ে ওঠেনি।

পক্ষপাতদুষ্ট ধারণার বাইরে এসে লক্ষ করলে দেখা যাবে, মানবচালিত প্রক্রিয়ার পরিবর্তে যান্ত্রিক ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও সময়ক্ষেপণের সুযোগ কম। অভিযোগের পেছনে একটি মানসিক ধাঁচ ধরা পড়ে; যা পূর্ব অনুমান বা ধারণাকে সমর্থন করে।

গাজীপুর, বগুড়া, কুমিল্লা বা সিলেটের ক্ষেত্রে ইভিএমের যান্ত্রিক সীমা আলোচনায় উঠে আসেনি। পরাজয়েই যত বিপত্তি! ফল পক্ষে গেলে বিচারের ধারাপাত এক রকম; বিপক্ষে গেলে অন্যরকম। শুধু এ দেশে নয়, অনেক পরিণত গণতন্ত্র ভারতের রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খন্ড বা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা উপনির্বাচনে বিরোধীরা টুঁ-শব্দ করেনি। আঞ্চলিক সংস্কৃতির ভৌগোলিক নৈকট্য আমাদের আচরণে অনেক মিল খুঁজে নেয়। ক্রমান্বয়ে ভিভিপ্যাট ব্যবহারের পরও ভারতীয় নির্বাচনে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি। তবে লক্ষণীয় পার্থক্য হল, ভারতে নির্বাচন শেষে ফলাফল সবাই মেনে নেয়।

ইভিএম বিতর্ক টিকে থাকলে অথবা পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সহজ না থাকলেও জনগণ মনে করে নির্বাচনই হল ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র উপায়। পোলিং রেট ভারতীয় গণতন্ত্রের সুস্থ পরিক্রমার পথে হতাশার দেয়াল তোলে না।

সাম্প্রতিক দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে ভোটারদের উপস্থিতি কম ছিল। আবার ভিন্ন ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। ভারতে কেউই মনে করেনি, অন্য কোনো বিকল্প পথে সরকার বদলান সম্ভব; সেটা সামরিক হস্তক্ষেপ বা বৈদেশিক আনুকূল্য- যাই হোক না কেন।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, যে জাতি ভাষার জন্য প্রাণ দেয়, বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে; গণতন্ত্রের জন্য গণজাগরণ ঘটায়, সে সমাজে কেন গণতন্ত্রচর্চার পরিসর প্রশস্ত হবে না, রাজনীতির আবহ কেন অনভিপ্রেত আশঙ্কার মেঘমুক্ত হবে না- তা অবশ্যই ভাবনার সুযোগ রাখে।

ইভিএমচালিত ব্যবস্থায় ছোটখাটো ত্রুটি থাকলেও সেটা বিভিন্ন মানদণ্ডে আমাদের সমাজ বাস্তবতায় অপেক্ষকৃত গ্রহণযোগ্য। এমন কোনো ব্যবস্থা নেই, বিশেষ করে যে ব্যবস্থার সঙ্গে মানুষ এখনও পরিচিত নয়, তার সঙ্গে অভিযোজিত হওয়ার পথে কিছু অন্তরায় থাকবে না। কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি মাঝে-মধ্যে দেখা দিলেও ইভিএমের বিশ্বাসযোগ্যতা যে কোনো ব্যবস্থার চেয়ে ভালো।

বিশেষ করে ব্যালটচর্চায় মানুষের আস্থা নেই। কাল্পনিক কিংবা বাস্তব কিছু সমস্যা সেখানে থেকেই যায়। প্রযুক্তির এই যুগে মানুষের কাছে নানা তথ্যসূত্র আছে। মিথ্যা বা গুজবের তাৎক্ষণিক শক্তি থাকলেও স্থায়িত্ব কম। মিথ্যার ধূম্রজালে সত্য কোণঠাসা হয়ে পড়ে ঠিকই। মানুষ নিরাসক্তও হয়। তবে তা সাময়িক। কেউ বলছে না যে, ইভিএম ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত। সমস্যাটি অন্য জায়গায়।

ত্রুটি সংশোধনে বা একটি স্থায়ী নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে আমরা আসলে কতটা আগ্রহী, তা বিবেচ্য। দ্বিতীয়ত, ইভিএমের বিকল্প ম্যানুয়াল ব্যালট আমাদের সন্তুষ্ট করেছিল কিনা ভেবে দেখতে হবে। ভোট প্রদানের স্বাভাবিক বা অস্বাভাবিক হারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

আগের রাতে অগোচরে ভোট হওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এখানে অন্তত সে সুযোগ ছিল না। নির্ধারিত দিনে প্রকাশ্যে ভোট হয়েছে। সে প্রক্রিয়াতেও ত্রুটি থাকতে পারে।

ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, আরও উন্নত করার সুযোগও তো থেকে গেছে। কিন্তু যে কথাটা নিঃসন্দেহে বলা যায় তা হল, যন্ত্র বা প্রযুক্তিকে ম্যানিপুলেট করা তত সহজ নয়, যা ম্যানুয়াল ব্যালটে সম্ভব। আসল ব্যাপার হল, আমাদের লক্ষ্যভেদে যতটা আগ্রহ, ব্যবস্থাপনার টেকসই উন্নয়নে ততটা সততা বা আন্তরিকতা- কোনোটাই নেই।

সে যাই হোক, এখন প্রশ্ন উঠবে- নির্বাচনের প্রচারে অংশ নেয়া বিপুল সমর্থকগোষ্ঠী ভোটকেন্দ্রে গেল না কেন। তাহলে কি তারা অনুমান করেছিল, ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত। সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন এসে যায়, প্রহসনের নির্বাচন প্রচারে তবে কেন তারা অংশ নিল?

অন্যদিকে, বিজয়ী প্রার্থীদের একটা সমর্থকগোষ্ঠীও ভোটকেন্দ্রে আসেনি- তা প্রাপ্ত ফলাফল দেখেই বোঝা যায়। তাহলে এ কথা সহজে অনুমেয় যে, ভোট মেশিনকে যদি ইচ্ছামাফিক প্রভাবিত করার সুযোগ থাকে, তবে ইলেকশন কমিশন বা সরকার সে সুযোগ গ্রহণ করেনি কেন। কাজেই এটা বিশ্বাস করার কারণ আছে যে, প্রযুক্তিনির্ভর এ নির্বাচন ব্যবস্থা অতীতে পরীক্ষিত যে কোনো পদ্ধতির তুলনায় অনেকটা উন্নত ও বিশ্বাসযোগ্য।

এখন প্রশ্ন থেকে যাবে, নির্বাচন প্রক্রিয়ার প্রতি তাহলে কেন অনাস্থা তৈরি হচ্ছে। এ আস্থাহীনতার পেছনে কি কোনো যৌক্তিক বা মনোজাগতিক সারবত্তা আছে? নাকি এটিও প্রত্যাখ্যানের সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত প্রতিক্রিয়া। বিষয়টি আলোচনা করতে গেলে বিজয়ের প্রেক্ষাপট নির্মোহ দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

প্রথমত, দেশের প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি আজ যে উচ্চতায় আসীন, রাজনীতির সমকালীন প্রেক্ষাপটে তো বটেই; নিকট ভবিষ্যতেও তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দৃষ্টিসীমায় আসে না। বঙ্গবন্ধুর পর দেশের আর কোনো নেতা জনগণের ওপর এমন মোহনীয় কর্তৃত্ব বা আস্থার সেতুবন্ধ রচনা করতে পেরেছিল বলে মনে হয় না। সরকারি প্রার্থীরা নেতার ঈর্ষণীয় এ জনপ্রিয়তার সুবিধা ভোগ করেছে বলে মনে হয়।

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জয়-পরাজয় সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে না; বরং সরকারি প্রার্থী থাকলে এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতি পায়- এ বিশ্বাস অনেকের মাঝে আজও বেঁচে আছে। জনগণের আস্থা এখন প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজের চেয়ে দলের সামগ্রিক সক্ষমতার ওপর বেশি নির্ভরশীল। এসব সূচকে সরকারি দল এখন বিরোধী দলগুলোর চেয়ে অনেকটা এগিয়ে; যার সুবিধা বিজয়ী প্রার্থীদের ঘরে পৌঁছেছে।

তবে এটাও বিচার্য যে, সরকারি-বিরোধী নির্বিশেষে সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে কম উপস্থিতি ভোট সম্পর্কে নাগরিকদের নিস্পৃহতার একটি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে, যা এ জনপদে অপরিচিত।

এখানে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে- প্রথমত, প্রার্থীদের শ্রেণিগত অবস্থান ও নৈকট্য একটি অভিন্ন চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ভোটারদের নিঃসন্দেহে প্রার্থীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে; যা ভোটদানের নৈতিক ও আবেগি দায় থেকে তাদের মুক্ত করেছে। এমন একটি বাস্তবতায় জনমনে এ ধারণা সৃষ্টি হওয়াও অমূলক নয় যে, প্রার্থী স্বাভাবিকভাবেই বিজয়ী হবে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর আদর্শ, সরকার পরিচালনার পূর্ব অভিজ্ঞতা বা বর্তমান অবস্থা ভোটারদের মনে এমন উন্মাদনা বা আবেগ সৃষ্টি করতে পারেনি- যা সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে তাদের তাৎক্ষণিক সুবিধা বা স্বার্থ ত্যাগ করায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে। বিরোধী মিছিলে সরব উপস্থিতি ক্ষমতার বিপরীতে একটি প্রতীকী ‘না’ হতে পারে; কিন্তু সেই নেতিবাচকতা ভোটের মাধ্যমে ‘প্রত্যাখ্যান’- এ পরিণত করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না।

দেশের নাগরিক সমাজ এখন মতামত প্রকাশে যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে বিশেষজ্ঞরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দেশের জন্য এটা এক অশনিসংকেত বলে সাবধান বাণীও শুনিয়েছেন। যদিও এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, ইনডেমনিটি, হ্যাঁ-না ভোট, সামরিক শাসনামলের হোন্ডা-ডাণ্ডাশাসিত ভোট, রাষ্ট্রীয় মদদে বিভিন্ন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বা সহিংসতা ঘটানোর মতো বিষয়ে এসব মহল থেকে খুব একটা আলোচনা শোনা যায়নি। এ কথাও সত্য যে, অতীতে ঘটে যাওয়া এসব ভয়ংকর স্খলনের অসভ্য নজির ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার স্বপ্নকে যাতে বাধাগ্রস্ত না করে; সে বিষয়ে, বিশেষ করে সরকারি দলকে দায়িত্বশীল হতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলের শাসনকালে নির্বাচন কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেললে জাতির পিতার রেখে যাওয়া আদর্শের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন হবে না।

সেজন্যই চাই নির্ভেজাল দেশপ্রেম ও অন্তর্দৃষ্টি। অন্তত কিছু বিষয়ে জাতীয় ঐক্য। সেসব ইস্যুতে আলোচনা হতে হবে খোলামনে। দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করতে হবে সততার সঙ্গে; সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল- প্রচলিত রাজনীতিতে মানুষের আস্থাকে যে কোনো মূল্যে ধরে রাখতে হবে। তাই সত্যকে কোণঠাসা করে বিভ্রান্তির জাল বুনে ঘোলা জলে মাছ শিকার করতে গেলে সরকারি বা বিরোধী কারও জন্যই তা মঙ্গলজনক হবে না।

সময়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বিশ্বে প্রবেশের দ্বারপ্রান্তে দেশ। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য সেবাকে গুণসম্পন্ন করা ভীষণ জরুরি। সামাজিক স্থিতি, সাম্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা টেকসই উন্নয়নের নিয়ামক। দুর্নীতি নির্মূল করে সুশাসন প্রতিষ্ঠাই সময়ের বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রতিষ্ঠা করা, মানুষের মাঝে আস্থা সৃষ্টি করা, অহেতুক দলাদলি বন্ধ করা এবং প্রয়োজনে আনুপাতিক গণপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে হলেও একটি সুস্থ ভবিষ্যৎ তৈরির জন্য জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তুলতে হবে। বিশ্বে এমন উন্নত, অনুন্নত অনেক দেশ আছে; যেখানে প্রদত্ত ভোটের হার যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে না।

কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে- হেরে গেলেও তার ব্যক্তিগত ব্যবসা বা চাকরির কোনো ক্ষতি হবে না। অপরাধী অপরাধ করলে সে যেই হোক শাস্তি পাবে। দুর্নীতি করলে সে রেহাই পাবে না। এটাই সুশাসন; এটাই আধুনিক, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের পূর্বশর্ত।

অমিত রায় চৌধুরী : সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ

[email protected]



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews