খাপছাড়া কাব্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিয়াছিলেন—‘সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে,/ সহজ কথা যায় না লেখা সহজে|’ সুতরাং বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ‘সহজ কথা’ কিংবা ‘সহজ বিষয়’ সহজ করিয়া প্রকাশ করা যায় না| বিশ্ব কেন আজ এত সমস্যার অতলান্তে পতিত—তাহার কারণ অনেকের নিকট সহজ ও স্পষ্ট| কিন্তু সেই ‘সহজ কথা’ আমরা কি ‘সহজ করিয়া’ বলিতে পারি? নানা কারণে তাহা পারা যায় না| আর তখন আমাদের ভরসা হয় নীতিগল্প, ঈশপ কিংবা বিভিন্ন উপকথায়| কী চমৎকারভাবে এই সকল নীতিগল্প প্রকাশ করিয়া দেয় কত জটিল বিষয়ের সহজ সাবলীল জবাব| ‘হাতের পাঁচ’ রাখিয়া কোনো কাজ না করিলে বিপদ শিয়রের কাছে ওত পাতিয়া বসিয়া থাকে| এই জন্য প্রবচন রহিয়াছে যে, ‘হাতের পাঁচ’ রাখিয়া কাজ করিতে হয়| এখন প্রশ্ন জাগিতে পারে, ‘হাতের পাঁচ’ কী জিনিস? কঠিন উত্তর হইল—একসময় জমিদারেরা স্ত্রীদের সহিত তাসের বিন্তি খেলিতেন| বিন্তি খেলায় যে শেষের পিঠ পায়, তাহার পাওনা হয় পাঁচ ফোঁটা| এই পাঁচ ফোঁটা হইতে ‘হাতের পাঁচ’ বাগ্ধারা আসিয়াছে, যাহার সহজ অর্থ হইল—শেষ সম্বল|
এই জন্য হাতের পাঁচ ছাড়িতে নাই| সেই কথায় জানা যায় আরো একটি উপকথায়| একদিন এক ধূর্ত শিয়ালের সহিত বিড়ালের দেখা হইলে শিয়াল বলিল, ‘বিড়াল ভায়া তুমি তো অনেক কৌশল জানো| আমিও কিছু জানি| এসো আমরা পরস্পরকে কৌশলগুলি শেখাই|’ শিয়ালের তুলনায় বিড়াল ছোট ও দুর্বল, সেই জন্য বিড়াল সকল কৌশল শিখাইল বটে কিন্তু ‘হাতের পাঁচ’ ছাড়িল না| শিয়াল যখন সকল কৌশল শিখিয়াছে মনে করিয়া বিড়ালকে আক্রমণ করিতে গেল—তখন বিড়াল তাহার শেষ কৌশল হিসাবে এক লাফে গাছে উঠিয়া গেল| শিয়াল অবাক হইয়া বলিল—এই কৌশল তো তুমি আমাকে শিখাও নাই বিড়াল ভায়া! বিড়াল বলিল, ‘হাতের পাঁচ ছাড়িতে নাই| হাতের পাঁচ না রাখিলে বিপদে বেঘোরে প্রাণ হারাইতে হয়|’
এই হাতের পাঁচ তথা শেষ সম্বল হাতে না রাখিয়া যাহারা চার্বাকের দর্শন না বুঝিয়াই ‘যাবৎ জীবেত্ সুখং জীবেত্’-এর জন্য ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেত্’ নীতি অনুসরণ করেন এবং ‘শ্বেতহস্তী’ ক্রয় করেন, তাহাদের ক্ষেত্রে ‘বিপদ’ দেখা দিবেই| প্রশ্ন জাগিতে পারে—শ্বেতহস্তী আবার কী জিনিস? সহজ কথায়, শ্বেতহস্তী হইল সাদা হাতি, যাহা পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে শখ করিয়া লালনপালন করা হইত| এই শ্বেতহস্তীকে কোনো পরিশ্রম করানো হইত না, কাজেও লাগানো হইত না, কিন্তু উহাকে বিপুল অর্থ ব্যয় করিয়া প্রতিপালন করা হইত| কোনো কাজে লাগে না, আবার অর্থেরও অপচয় করে এবং সেই অর্থ যদি হয় ঋণের অর্থ তখন ইহাকে অনেকে আবার ‘ঘোড়া রোগ’ও বলিয়া থাকেন| মনে রাখিতে হইবে, বিপদ যখন আসে তখন ‘ষোলোকলা’ পূর্ণ করিয়াই আসে| আবার প্রশ্ন জাগিতে পারে—ষোলোকলা কী জিনিস| সহজ কথায়, ষোলোকলা হইল ষোলো জন দেবী| প্রাচীনকালে মনে করা হইত—অমাবস্যার পর চাঁদ একটু একটু করিয়া বৃদ্ধির নেপথ্যে রহিয়াছে ষোলো জন দেবী| এই দেবীরা থাকেন সূর্যে| প্রতি রাতে একজন করিয়া চাঁদে আসিতে থাকেন, ফলে চাঁদের আকারও বাড়িতে থাকে| যেই দিন ষোলো জন দেবীর সবাই চাঁদে আসেন সেই দিন ‘পূর্ণিমা’| ঠিক তেমনি ষোলো জন দেবী পূর্ণিমার পর একে একে চলিয়া যাইতে থাকেন| যখন সকল দেবী চলিয়া যান তখন সেই দিন ঘোর অমাবস্যা নামিয়া আসে|
আমাদের জীবন সভ্যতা জনপদেও এমনই অমাবস্যা-পূর্ণিমার খেলা চলে| কখনো চাঁদের হাট বসে, কখনো ঘোর দুর্যোগ অমারজনির মতো সময়ে কেহই থাকে না পাশে| তখন ‘হাতের পাঁচ’ না থাকিলে বিপদেরও শেষ থাকে না| সুতরাং আমাদের সমাজ-রাষ্ট্র-সভ্যতার সকল সমস্যার আলামত এই সকল প্রবাদ-প্রবচন বাগধারার মধ্যে লুকাইয়া রহিয়াছে| আমরা যেন ইহা উপেক্ষা না করি|