২৮. গৃহকর্তা যখন দেখল তার [ইউসুফ (আ.)-এর] জামা পেছন দিক থেকে ছিন্ন করা হয়েছে তখন (সে প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পেরে) বলল, ‘নিশ্চয়ই এটা তোমাদের নারীদের ছলনা। তোমাদের ছলনা খুবই মারাত্মক।
’ [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২৮ (তৃতীয় পর্ব)]’ [সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ২৮ (তৃতীয় পর্ব)]
তাফসির : ইহুদিদের বিধিবিধানমূলক গ্রন্থ হলো ‘তালমুদ’। সেখানে এ ঘটনার বিবরণ এভাবে এসেছে : ‘পোটিফর যখন তাঁর স্ত্রীর মুখ থেকে এ অভিযোগ শুনলেন, তখন তিনি ইউসুফকে খুব মারধর করেন। তারপর তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালতে কর্মকর্তারা ইউসুফের পোশাক পরীক্ষা করে রায় দিলেন—দোষ ওই নারীর। কারণ কাপড় সামনের দিক থেকে নয়, পেছনের দিক থেকে ছেঁড়া। ’
সামান্য চিন্তা করলে বোঝা যায়, কোরআনের বর্ণনা তালমুদের বর্ণনার চেয়ে অনেক বেশি যুক্তিসংগত। কেননা এটা কিছুতেই সম্ভব নয় যে একজন রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদমর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি নিজের স্ত্রীর ওপর দাসের চড়াও হওয়ার ঘটনা নিয়ে আদালতে গেছেন কিংবা মামলা করেছেন। অথচ দাসের ব্যাপারে যেকোনো ফয়সালা করার ইখতিয়ার তাঁর ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি আদালতে যাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। এটাই কোরআন ও আগের আসমানি গ্রন্থগুলোর মধ্যে পার্থক্য। কোরআন কেবল পুরনো দিনের ইতিহাস বর্ণনা করেনি, একই সঙ্গে যুক্তিযুক্ত ও ঘটনার বাস্তবসম্মত বিবরণ তুলে ধরেছে। বিকৃত ইতিহাস সংশোধন করেছে। সত্য ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছে।
এসব ইসরায়েলি বর্ণনা অনুসরণ করে যুগে যুগে ইউসুফ (আ.)-কে নিয়ে বহু কাল্পনিক কাহিনী রচিত হয়েছে। ফারসি ভাষায় মহাকবি ফেরদৌসী (১১ শ শতক) তাঁকে নিয়ে কাব্য উপাখ্যান লেখেছিলেন। আবদুর রহমান জামি (১৫ শ শতক) ইউসুফ-জুলায়খার ‘প্রেমকাহিনী’ অবলম্বনে সুফি ধারার কাব্য রচনা করেন। মূল কাহিনী পল্লবিত করে তাঁরা ‘ইউসুফ-জোলেখা’ নামে কাব্য রচনা করেছিলেন। ফেরদৌসীর কাব্য ছিল রোমান্সজাতীয় আর জামির কাব্য ছিল রূপকজাতীয়। আবদুর রহমান জামির কাহিনী প্রাচীন ফারসি প্রণয়কাহিনী থেকে গৃহীত। আবদুর রহমান জামি ১৪৮৩ খ্রিস্টাব্দে ফারসি ভাষায় তাঁর অমর কাব্য ‘ইউসুফ-জুলায়খা’ রচনা করেন। সেই কাব্যের অনুসরণে শাহ মুহম্মদ সগীর দেশীয় ভাষায় তাঁর ‘ইউসুফ-জোলেখা’ প্রণয়ন করেন।
শাহ মুহম্মদ সগীর ছিলেন পনেরো শতকের কবি। তিনি ছিলেন গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের (১৩৮৯-১৪১০) সভাকবি। তিনি সুলতানের নির্দেশে প্রেমের মাধ্যমে ধর্মের বাণী শোনানোর জন্য দীর্ঘ এ আখ্যানকাব্য রচনা করেন। এ কাহিনীকাব্যে ধর্মভাবের পাশাপাশি মানবপ্রেমের আবেগ-উচ্ছ্বাস বর্ণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে সাহিত্যের ব্যাপক রংচং মাখা হয়েছে। গ্রন্থের শেষে ইউসুফ (আ.)-এর ভ্রাতা ইবনে আমিন ও বিধুপ্রভার অলৌকিক প্রেমকাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এভাবেই যুগে যুগে ইউসুফ (আ.)-এর চরিত্র হননের অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। একজন নবীর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কাহিনীকে গৌণ করে সেটিকে প্রেমের উপাখ্যানে পরিণত করা সাহিত্যের আদালতে অপরাধ না হলেও নৈতিকতার দিক দিয়ে নিকৃষ্ট পর্যায়ের—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এসব গ্রন্থ সাহিত্যের মানে উত্তীর্ণ হয়েছে বটে; কিন্তু কোরআনবিরোধী বর্ণনা একজন নবীর নামে চালিয়ে দেওয়া নৈতিকতার দিক দিয়ে জঘন্য অপরাধ।
গ্রন্থনা : মাওলানা কাসেম শরীফ