১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে একটি বধ্যভূমি বানিয়েছিল হানাদার পাকিস্তানি ও তাদের দোসররা। এ তথ্যটি মনে রেখে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি দেশজুড়ে গণহত্যার ওপর যে গবেষণা চালায় তাতে প্রতীয়মান হয়, পুরো দেশে প্রায় পাঁচ হাজার ছোট-বড় বধ্যভূমি রয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪০টি বধ্যভূমি শনাক্ত করে এ কমিটি। যার মধ্যে ঢাকায় রয়েছে ৬৫টি।
এর মধ্যে মিরপুরেই বধ্যভূমির সংখ্যা ২৫। এগুলো হলো-১. জল্লাদখানা, ২. মুসলিম বাজার, ৩. মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন পানির ট্যাংক, ৪. মিরপুর ১০নং সেকশন ওয়াপদা বিল্ডিং, ৫. মিরপুর ১৩নং সেকশন, ৬. মিরপুর ১০/সি লাইন ১৪নং সেকশন, ৭. মিরপুর ১৪নং সেকশন, ৮. মিরপুর ১৪নং কবরস্থান, ৯. সিরামিক ফ্যাক্টরি, ১০. শিয়ালবাড়ি, ১১. হরিরামপুর, ১২. মিরপুর ব্রিজ, ১৩. ১২নং সেকশনের কালাপানির ঢাল, ১৪. মাস্তানার গৃহসংলগ্ন কুয়ো, সেকশন-১২, মিরপুর, ১৫. রাইনখোলা বধ্যভূমি, ১৬. মিরপুরের দারুল রশিদ মাদ্রাসা, ১৭. মিরপুরের বায়তুল আজমত জামে মসজিদ, ১৮. আলোকদি, ১৯. বাঙলা কলেজ, ২০. বাঙলা কলেজের কাছে আমবাগান, ২১. ১নং সেকশনের সারেংবাড়ি, ২২. চিড়িয়াখানার কাছে শিন্নিরটেক, ২৩. গোলারটেক, ২৪. প্রিন্স আয়রন অ্যান্ড স্টিল ইন্ডাস্ট্রিজ, ২৫.কল্যাণপুর বাসডিপো।
মিরপুরের মতো বিহারি অধ্যুষিত এলাকার বধ্যভূমিগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো-কুয়ো, ম্যানহোল, সেপটিক ট্যাংক ও ছোট জলাশয়গুলোকে বধ্যভূমি হিসাবে ব্যবহার। ওই এলাকার প্রতিটি ম্যানহোল, কুয়ো ও জলাশয় পূর্ণ ছিল বাঙালির মরদেহে। বীভৎস নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের চিহ্ন বিদ্যমান ছিল এলাকার প্রতিটি মরদেহে।
১৯৯৯ সালের ২৭ জুলাই নুরী মসজিদের কাছে দুটি মাথার খুলি পাওয়া গেলে আমি তা তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমানকে ওই স্থানে বধ্যভূমির সম্ভাবনার বিষয়টি জানাই। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমতিক্রমে সেনাবাহিনীর ৪৬ ব্রিগেডের সদস্যদের মুসলিম বাজার ও জল্লাদখানা থেকে শহিদের হাড়গোড় বা দেহাবশেষ উদ্ধারে নিয়োজিত করেন।
আমি ওইসব হাড়গোড় আল-বিরুনী হাসপাতালে রেখে জীবাণুমুক্ত করি এবং প্রাথমিক ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে নিজ উদ্যোগে দেশে ও দেশের বাইরে ফরেনসিক প্রোফাইলিং ও ডিএনএ টেস্টসহ উচ্চতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠাই। ওই সময় এ কাজে আমাকে সাহায্য করেন গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজিস্ট প্রফেসর ভ্যানেজিস এবং ভারতের সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাবের প্রধান ড. ভি আই কেশ্যপ।
ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির পক্ষে হাড়গোড় জীবাণুমুক্ত করে দীর্ঘ মেয়াদের জন্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেন তৎকালীন আল-বিরুনী হাসপাতালের চিকিৎসক ও টেকনিশিয়ানরা।
ধারণা করা হয়, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব কর্তৃক দেশকে শত্রুমুক্ত করার নির্দেশ পালনকালে ৩০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে মিরপুরকে পাকিবাহিনীর দলছুট সদস্য ও বিহারিদের কবল থেকে মুক্ত করতে গিয়ে লে. সেলিম ও পুলিশ বাহিনীর এএসপি লোদীসহ যে শতাধিক সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তি শহিদ হন, তাদেরসহ বহু বাঙালির দেহ ছুড়ে ফেলা হয়েছিল ১২নং সেকশনের ডি ব্লকে নুরী মসজিদের পেছনসহ ওই এলাকায় ছড়ানো-ছিটানো কুয়োগুলোতে।
এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস অনেক বাঙালি নর-নারী ও শিশুকে হত্যা করে এ এলাকার একাধিক কূপে ফেলে দেওয়া হয়। এর মাঝে বিহারি আখতার গুণ্ডা ও মাস্তানার গৃহসংলগ্ন কুয়ো রয়েছে। তারা ছিল এলাকার অন্যতম প্রধান ঘাতক। এখানে প্রাপ্ত হাড়গোড়গুলো ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি সংরক্ষণ করে এবং ফরেনসিক পরীক্ষা চালায়।
এরই ধারাবাহিকতায় জল্লাদখানা বধ্যভূমি থেকে মোট ৭০টি মাথার খুলি ও ছোট-বড় ৫ হাজার ৩৯২টি হাড়গোড় এবং শহিদদের ব্যবহৃত বিভিন্ন নিদর্শন উদ্ধার করে সেনাবাহিনী। জল্লাদখানা থেকে প্রাপ্ত হাড়গোড়ের গুনাগুনতি থেকে শুরু করে নিহতদের বয়স ও লিঙ্গ নির্ধারণসহ ইনজুরি প্যাটার্ন লিপিবদ্ধ করেন ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির বিশেষজ্ঞরা।
১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি নীরবে একটি তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় কমিটির কার্যক্রম সামনে আসে ১৯৯৯ সালে মিরপুরের বধ্যভূমি খননের পর। ২০০১ সালে যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যা তথা বধ্যভূমি নিয়ে রচিত হয় ‘যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা ও বিচারের অন্বেষণ’, যা যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি মূল্যবান দলিল হিসাবে গ্রহণ করে।
এর পরপর ৪ লাখ ৬০ হাজার নির্যাতিতা নারীর পরিসংখ্যান ও কথ্য ইতিহাস নিয়ে ২০০২ সালে রচিত হয় ‘যুদ্ধ ও নারী’ নামক গ্রন্থ। ১৯৭১ সালের নির্যাতিতা নারীদের ১৯৯৯ সাল থেকে তৎকালীন আল-বিরুনী হাসপাতালে সেবা দেওয়া শুরু হয়, তাদের শারীরিক ও মানসিক আঘাত বা ট্রমা সারিয়ে তোলার ব্যাপারে।
বধ্যভূমি শনাক্তকরণসহ যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রণয়নের পর বারবার আঘাত আসে আমার ও আমার পরিবারের ওপর। আর্থিক আঘাতে ছেড়ে দিতে হয় আল-বিরুনী নামক হাসপাতালটি।
সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমতিক্রমে মাননীয় সেনাপ্রধান ’৭১-এর শহিদদের দেহাবশেষ, বিশেষ করে মিরপুরের মুসলিম বাজার ও জল্লাদখানায় প্রাপ্ত হাড়গোড় বা দেহাবশেষ সমাধিস্থ করা হয়। এ হাজার হাজার দেহাবশেষ দীর্ঘ ২২ বছর পরম যত্নে, বিজ্ঞানসম্মতভাবে সংরক্ষিত ছিল আমার উত্তরাস্থ গৃহে।
আমার বিশেষ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনী ৭১-এর দেহাবশেষগুলো বিশেষ মর্যাদায় সমাধিস্থ করায় ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সব সদস্য এবং দেশবাসী কৃতজ্ঞ। এ কাজের জন্য ৩০ বছরের বেশি সময় দিয়ে সবটুকু কাজ সুসম্পন্ন করতে পেরে কমিটি আজ গর্বিত। এ কাজের পেছনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন অতিপ্রশংসনীয়।
অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ৭১-এর শহিদ ও গণহত্যায় নিহতদের দেহাবশেষ সমাধিস্থকরণ শুধু শহিদের আত্মার যথাযথ মর্যাদা ও তাদের নিকটজনের শান্তি নিশ্চিত করবে না-এটা জাতির মূল্যবোধকে সুদৃঢ় করবে। এটা কমিটির এত বছরের পরিশ্রমের পর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিও বটে।
এ উদ্যোগের ফলে ৭১-এর গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলবে এবং মানবাধিকার হাইকমিশনসহ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ওই গণহত্যার মুখ্য সংঘটকদের বিচারে সমর্থন দেবে-এমন প্রত্যাশা করছে ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি।
ডা. এম এ হাসান বীরপ্রতীক : মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সামরিক অফিসার, সিএনসি সনদপ্রাপ্ত; চেয়ারপারসন, ওয়ার ক্রাইম্স ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি
dhasan471@gmail.com