আজ ঈদ, কিন্তু যেন উৎসবের ঈদ নয়। নিউ নরমালের কালে এক অ্যাবনরমাল ঈদ। করোনা আবহে এবার সরকার সতর্ক, ঈদের ছুটি মাত্র তিন দিনের। সরকারি কর্মচারীদের স্টেশন ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ছিল, সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান ছিল তারা যেন যার যার অবস্থানে থেকেই ঈদ করেন। কিন্তু যেহেতু গণপরিবহন সব চলেছে তাই মানুষের চলাচল থামানো যায়নি। রোজগার কমায় কিছুটা কাটছাঁট হলেও যে যতটা পারে গরু ছাগল কিনেছে, উৎসবের সাথেই জবাই করছে।

কিন্তু করোনাকালে এবার আয়োজন কম। নামাজ পড়া থেকে করোবানির পশু জবাই সব বিষয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানার কথা বারবার বলা হলেও সেটা যে শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি মানা হয়নি।

বাস্তব বড় কঠিন। সাত মাস ধরে এক অজানা ভাইরাসের দখলে গোটা বিশ্ব। আমরা লড়ছি পাঁচ মাস ধরে। এর মাঝেই এসেছিল পহেলা বৈশাখ, রোজার ঈদ এবং আজ কোরবানির ঈদ। এমন রঙহীন বাংলা নববর্ষ, এমন বিমর্ষ ঈদ আগে দেখেনি কেউ। দেখেনি বিশ্ববাসীও। সৌদি আরবে হজ্জের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ১০ হাজার স্থানীয় মুসল্লিকে নিয়ে। বড় সময় ভাইরাসের ভয়ে মসজিদ বন্ধ রাখতে হয়েছে সেখানে।

করোনাভাইরাস আমাদের সামনে এক নতুন পৃথিবীকে উপস্থিত করেছে। আমাদের একটা প্রজন্ম ১৯৭১-এ, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ দেখলেও, সেসময় কষ্ট সইলেও, আমরা, আমাদের আগের ও পরের একটা প্রজন্ম, যুদ্ধ ও মহামারির কারণে মানুষের এমন হাহাকার দেখিনি। তুলনামূলকভাবে আমরা একটি স্থিতিশীল সময়কেই দেখেছি।

কিন্তু সেই পৃথিবী বদলে গেছে। নিউ নরমাল নামের যে বাস্তবতার সম্মুখীন আজ আমরা, তা বড় চ্যালেঞ্জিং। মানুষের আয় কমছে, রোজগার হারিয়ে যাচ্ছে, কাজ হারিয়ে যাচ্ছে, জীবন আর জীবিকা অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। যে মানুষ দলবদ্ধ থাকতে পছন্দ করে তাকে বলা হচ্ছে বিচ্ছিন্ন থাকতে। মানুষ থেকে মানুষের থেকে দূরে থাকাটাই আজ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শ্রেষ্ঠ উপায়। সত্যিকার অর্থেই আমাদের চেনা পৃথিবী আজ বদলে গিয়েছে পুরোপুরি। যা কিছু তার সবই নতুন।

কিন্তু আমরা কি পারছি নতুন হতে? কিছু কিছু প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে করোনা রোগী বা সাধারণ রোগী তাদের কাছে কেবলই টাকা কামাই করার মেশিন। নিষ্ঠুর, নির্দয় আচরণ করে লাখ লাখ টাকা বিল আদায় করা, জবরদস্তি করার এমন নজির এই অতিমারির সময় সারা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায়নি। কী নিষ্ঠুর পরিতৃপ্তি এসব হাসপাতালের মালিকদের মুখে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়। সারাদেশে এমন ঘটনা ঘটেই চলেছে, দুই-একটা আলোচনায় আসছে, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা চুপচাপ দেখে চলেছি।

আমি জানি ঈদের দিনে অনেকের কাছেই এ কথাগুলো ভালো লাগবে না। কিন্তু কথা আমাদের চালিয়ে যেতেই হবে। হাসপাতাল বা চিকিৎসা কেন্দ্রিক যাবতীয় নিষ্ঠুরতাকে আমরা পাশ কাটিয়ে চলেছি বলেই দিনে দিনে এসব পল্লবিত হয়েছে। পারার ছোট ডায়গনস্টিক সেন্টার থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হাসপাতাল সর্বত্র সর্বব্যাপী নৃশংসতাকে আমাদের চিনতে হবে। তার বিরুদ্ধে সরব হতে হবে। কাজটা কঠিন। কারণ নিষ্ঠুরতাকে আমরা ঠিকমতো বিচার করতে পারি না, কিংবা এই কাজ যারা করেন সেই বাজে লোকদের হাত অনেক লম্বা।

সারাবিশ্বে আমরা মৃত্যুর মিছিল দেখছি, আক্রান্ত মানুষের হাহাকার দেখছি, বিজ্ঞানীদের প্রাণপণ প্রচেষ্টা দেখছি ভ্যাকসিন আবিষ্কারের, চিকিৎসকদের লড়াই দেখছি। কিন্তু আমাদের দেশে কেন এমন এক নিষ্ঠুর, হৃদয়হীন প্রাইভেট সেক্টর চিকিৎসাব্যবস্থা দেখছি সেটা ভাবনার বিষয়। এই দুঃসময় থেকে কি আমরা খুঁজে পেতে পারি না এক নতুন বোধ, এক নতুন উপলব্ধি?

অতীতেও পৃথিবীতে মহামারি, মহামন্দা এসেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মৃত্যু মিছিলকে একপর্যায়ে মানুষই থামিয়েছে। নতুন করে আবার জয় করার লড়াই শুরুও হয়েছে।

এই করোনাভাইরাসে বিপর্যন্ত, দিশেহারা সময় অতিক্রম করে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরব আবার আমরা। অর্থনৈতিক বিপর্যয় হয়তো কয়েক বছর বাদে কাটিয়ে উঠবে গোটা পৃথিবী, নিশ্চয়ই আমরাও পারব। এই দুঃসময় হয়তো আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের ইতিহাস পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে জানবে একদিন। কিন্তু আমরা যারা আজ এই দুঃসময় প্রত্যক্ষ করলাম, তাদের জীবনে, যাপনে, মননে, চিন্তনে কি এই অভিজ্ঞতা কোনো প্রভাব রেখে যাবে?

করোনায় বারবার জাত ধুতে শিখেছি। যেখানে সেখানে থুথু ফেলা সেটাও শিখেছি। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা কম, সেটা রপ্ত করেছি। এসব শিক্ষার পাশাপাশি একটু মানবিক হওয়ার শিক্ষাও প্রয়োজন। যারা এই সময়েও দুর্নীতিতে নিজেদের গা ভাসিয়েছেন, মানুষের পকেট কেটেছেন তারা একটু ভাবতে শিখুন, তারা একটু দৃষ্টি সম্প্রসারিত করুন, দেখুন সারা পৃথিবীতে বড় ব্যবসায়ীরা কতটা মানবিক হয়ে এসে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

করোনাকে ঘিরে এই পরিস্থিতিতে আমরা আজ একটু নিজেদের সমীক্ষা করি। আমরা সকলেই জীবনে ভালো থাকতে চাই। কিন্তু এই সুখে থাকা কি এই যে, সংকট মুহূর্তে মানুষের বিপদের সময় তাকে আরও বিপর্যস্ত করে তোলা? এই দুঃসময়ে এটাই হোক শিক্ষা যেন আমরা সেই পথে থেকে সরে আসি সবাই। যারা ভাবছেন মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে বেশি মুনাফা করে জিতে যাচ্ছেন অনেক, তারা হেরেও যেতে পারেন কিন্তু।

এইচআর/এমএস



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews