ফরিদপুরের মধুখালীতে বিক্ষুব্ধের পিটুনিতে আপন দুই সহোদর নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ এরাই মন্দিরে আগুন দিয়েছে। নিহত দু’জনই নির্মাণ শ্রমিক এবং অন্য ইউনিয়নের লোক। মন্দিরে পাশেই একটি নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানে এরা দুই ভাই নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে এখানে রাত্রি যাপন করে কাজ করতেন।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ওই নির্মাণাধীন প্রতিষ্ঠানের পাশে অবস্থিত মন্দিরে কে বা কারা আগুন দিয়েছে এরকম প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ সাক্ষ্য দেওয়ার মতো কাউকেই পাওয়া যায়নি। অথচ সন্দেহবশত গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকা শ্রমিকদের ঘুম থেকে তুলে স্থানীয়রা প্রচণ্ড নির্যাতন করে। আগুন লাগানোর বিষয় অস্বীকার করায় তাদের মধ্যে তিন যুবকের হাত-পা বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করে। প্রচণ্ড নির্যাতনে নির্মাণ শ্রমিক দুই ভাই ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। সংঘবদ্ধ নির্যাতনে আহত হয় আরো ৪ শ্রমিক। এদের প্রাথমিকভাবে মধুখালী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি ঘটলে তাদের মধ্যে দু’জনকে ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলার ডুমাইন ইউনিয়নের পঞ্চপল্লীর কৃষ্ণনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ পঞ্চপল্লী হিন্দু অধ্যুষিত বসতি, যা পাঁচটি গ্রাম নিয়ে গঠিত। নিহতরা হলেন উপজেলার নওপাড়া ইউনিয়নের চৌপেরঘাট গ্রামের শাহজাহান খানের দুই পুত্র আশরাফুল খান (২১) ও আরশাদুল খান (১৮)। এছাড়া নান্নু মন্ডল ও সিরাজ নামে দু’জন ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। ফরিদপুর মেডিকেল ভর্তি শ্রমিকদের সাথে কথা বলে উল্লেখিত তথ্য পাওয়া যায়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এ ঘটনায় বিক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছে স্থানীয়রা। সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এলাকাজুড়ে পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ফুঁসে উঠছে আশপাশের ৮/৯ গ্রাম। তরতাজা দুটি প্রাণ, আপন দুই ভাই, দুটি মুসলমান ছেলেকে কথিত অভিযোগে সন্দেহের ওপর পিটিয়ে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। নিহতদের বাড়ীতে চলছে কান্নার রোল। একই মায়ের বুক থেকে দুটি সন্তান হারানো পিতার কাঁধে নিস্পাপ দুটি সন্তানের লাশ। একসাথে দুই সন্তানের শেষ গোসল, এক সাথে পাশাপাশি দুটি কবর বানানোর দৃশ্য দেখে বারবার জ্ঞান হারিয়ে নিরব নিথর হয়ে পড়ছেন সন্তানহারা বাবা- মা।

রাত ১২টায় সরেজমিনে গিয়ে ওই এলাকায় আরো দেখা যায়, মোড়ে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কেউ ঢুকলে তার পরিচয় জানতে চাচ্ছে পুলিশ। কালীমন্দির এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পঞ্চপল্লী কালি মন্দিরে একটি মূর্তি আগুনে পুড়ে গেছে। তারপাশে একটি নছিমন গাড়িতে আগুন জ্বলছে। তারপাশেই অবস্থিত পঞ্চপল্লী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টির টয়লেট নির্মাণের কাজ চলছে। বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে শ্রমিকেরা থাকতেন। সেই কক্ষেই সাত জন শ্রমিককে মন্দিরে আগুন দেয়ার সন্দেহে নির্মমভাবে মারধর করে উত্তেজিত হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা। রুমের ভেতর স্পষ্ট রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা গেছে।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন মধুখালী থানা পুলিশ। পরে আহত শ্রমিকদের উদ্ধারের সময় উত্তেজিতরা পুলিশের উপর হামলার চেষ্টা চালায় জানিয়েছেন পুলিশ। এ সময় ফাঁকা গুলি চালায় পুলিশ। পুলিশের গায়েও উত্তেজিতরা অনেক ইট পাটকেল ছুঁড়ে মারে। পুলিশ আঘাতপ্রাপ্ত হন। পরে রাত ১টার দিকে সেখানে ছুটে যান জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম।

এ ঘটনার বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, মন্দিরে আগুনের ঘটনা গ্রামে ছড়িয়ে পড়লে লোকজন উত্তেজিত হয়ে সেখানে জড়ো হয়। আগুন দেওয়ার জন্য শ্রমিকদের অভিযুক্ত করে তারা স্কুলে গিয়ে শ্রমিকদের মারধর করে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে পলিশ। এতে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।

মধুখালি ডুমাইন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান তপন ইনকিলাবের এই প্রতিবেদককে জানান, পঞ্চপল্লীর একদল মানুষ ওই নির্মাণ শ্রমিকদের পিটিয়ে আহত করে নির্মাণাধীন স্কুল ঘরে আটকে রাখে। স্কুল ভবনের দরজা, জানালা, গ্রিল ভেঙে ফেলে তারা। এ সময় বাইরে থেকে কেউ ওই গ্রামে যেতে পারেনি। সেখানে একটি কালী মন্দিরে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

তপতি মন্ডল নামে ওই গ্রামের এক নারী জানান, তিনি মায়ের ঘরে (কালীমন্দির) সন্ধ্যাবাতি দিচ্ছিলেন, তখন শ্রমিকরা জানালা দিয়ে দেখছিলেন কোনো অসুবিধা হয়েছে কিনা। তারপর আমি বাড়ি গিয়েছিলাম ঘোষি নিতে। তখন ওরা (শ্রমিকরা) রড ওঠানামা করতেছিল আর নিজেরাই বকাবাজি করতেছিল। তারপর আমি চিৎকার শুনতে পাই। এগিয়ে গিয়ে দেখি, মা একদম পুড়ে গেছে। তারপর লোকজন জড়ো হয়ে গেল। এই যা। তারপর কী হলো তা তিনি দেখেননি। এছাড়া কারা মন্দিরে আগুন দিয়েছে তাও তারা কেউ দেখেননি বলে জানান।

এদিকে রাত তিনটার দিকে ফরিদপুর মেডিকেলে ছুটে আসেন নিহতের বাবা-মা, বৃদ্ধ দাদি ও স্বজনরা। এ সময় দুই ছেলের এমন মৃত্যু দেখে চিৎকার শুরু করেন তারা। হাসপাতালটির নতুন ভবনের সামনে বারবার মুর্ছা যেতে দেখা যায় তাদের বাবা শাহজাহান খানকে। কিছুক্ষণ পরপর ‘বাজান বাজান’ বলে চিৎকার করতে থাকেন তিনি।
বৃদ্ধ দাদি গড়াগড়ি করতে থাকেন হাসপাতাল চত্ত্বরে। এসময় নিহতদের চাচাতো ভাই আলমাস খান জানান, ঈদের পরই তারা নির্মাণ কাজে চলে যায়। সেখানেই থাকতো। আজ খবর পাই, ওদের মারধর করেছে হিন্দুরা। পরে হাসপাতালে এসে দেখি দুজনের লাশ। অপরদিকেই রাতেই ওই এলাকার পাশে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক সংলগ্ন কথা হয় কয়েকজনের সাথে। তাদের চোখে-মুখে উত্তেজনা। উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলতে থাকেন। এমনকি এর প্রতিশোধ নেয়া হবে বলে জানান তারা।

তবে সহিংসতা বন্ধে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে জানান জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার। তিনি বলেন, পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে। কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য বিজিবি মোতায়েন করা হচ্ছে। স্থানীয় বহু লোক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনকিলাবকে বলেন, আজ হোক কাল হোক হিন্দুদের সাথে একটা বোঝাপড়া হবে। হিন্দু হয়ে ওরা অন্যায়ভাবে শুধু সন্দেহ করে মুসলমান দুটি ছেলেকে পিটিয়ে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলল। আমরা কিছুতেই মানতে পারছি না।

তবে এই ঘটনার প্রায় ১২/১৩ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা অথবা কেউ আটক আছে কিনা তা জানা যায়নি।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews