বিশ্ব দাবার বড় তারকা নাইজেল শর্ট। ফিদের সহসভাপতি পদে বসে এই ব্রিটিশ তারকা ঢাকায় আসেন চলমান সার্ক দাবা উপলক্ষে। খেলেছেন এখানকার দাবাড়ুদের সঙ্গে, ট্রেনিংও করিয়েছেন। বাংলাদেশের দাবা-চর্চা দেখেছেন তিনি খুব কাছ থেকে। কয়েক দিন দেখা-জানার সুবাদে এই গ্র্যান্ড মাস্টার ঢাকা ছাড়ার আগে সনৎ বাবলার কাছে বাংলাদেশের দাবার অবস্থান পরিষ্কার করে গেছেন।

প্রশ্ন : এই কদিনে বাংলাদেশের দাবা কেমন দেখেছেন?

নাইজেল শর্ট : আমি ছোট সফরে এসেছি, তাই ঠিক পর্যবক্ষণ বলতে যা বোঝায় সেটা পুরোপুরি হয়নি। গতকাল (পরশু) আমি ২৫ জন তরুণ খেলোয়াড়ের সঙ্গে খেলেছি। ওখানে প্রমিজিং খেলোয়াড় দেখেছি কিছু। সত্যি বললে বাংলাদেশের দাবা চলছে তবে সাড়া ফেলে দেওয়ার মতো কিছু নয়। আমার প্রায় সমসাময়িক খেলোয়াড় নিয়াজ মোরশেদ দারুণ আকর্ষণীয় এক দাবড়ু ছিলেন, মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন। তাঁর পাশাপাশি গ্র্যান্ড মাস্টার জিয়াউর রহমান, এনামুল হোসেনসহ অন্যরা এখনো খেলছেন। তাঁরাই আলোচনায়। এই ধারায় এ দেশে এখন অনেক নতুন প্রতিভা থাকার কথা, যারা খেলাটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নেবে। সে রকম তারুণ্যের ঝাঁক আমি দেখিনি।

প্রশ্ন : সর্বশেষ গ্র্যান্ড মাস্টার এনামুল হোসেনের পর ১১ বছর কেটে গেছে জিএমহীন...

নাইজেল : এটা বড় শূন্যতা। আমার মনে হয় নতুন কিছু চেস একাডেমি হয়েছে, সামনের দিকে এগোনোর উদ্যোগ নিয়েছে ফেডারেশন। অনেক পরে হলেও তারা চেষ্টা করছে, সামনের দিকে যাওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। দাবার উন্নতির ব্যাপারে আমি সব সময় তুলনামূলক বিশ্লেষণ করতে পছন্দ করি। এই মুহূর্তে ভারতের চেয়ে অনেক অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ, আবার পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে অনেক এগিয়ে। ব্যাপারটাকে আমি কিভাবে দেখছি, সেটাই হলো আসল। গ্লাসের অর্ধেকটা ভরা নাকি অর্ধেকটা খালি—দুই ভাবেই বলা যায়। আমার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের দাবা ভালো তবে উৎসাহব্যঞ্জক কিছু নয়। বিশেষ করে এত বড় জনগোষ্ঠীর দেশে আরো চমত্কার দাবাড়ু থাকা উচিত।

প্রশ্ন : এই অঞ্চলের প্রথম জিএম বাংলাদেশের নিয়াজ মোরশেদ। সেই জায়গা থেকে দেখলে বাংলাদেশের কোথায় থাকা উচিত ছিল?

নাইজেল : নিঃসন্দেহে ভারতের মতো তাদের অগ্রগতি থাকার কথা ছিল। কিন্তু এখানে টুর্নামেন্টের বড় অভাব, এত কম খেলে ভালো দাবাড়ু হওয়া যায় না। নতুন দাবাড়ুও তৈরি হয় না। ২০ বছর আগে এসে আমি যাদের সঙ্গে খেলেছি, তারাই এখনো খেলছে। চারপাশে তাদের দেখছি আমি। নতুন প্রজন্ম দেখছি না, আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক প্রতিভাবান দাবাড়ু দেখছি না। ওদিকে ভারতে খেলাটি পৌঁছে গেছে নতুন উচ্চতায়। প্রতি সপ্তাহে তাদের নতুন গ্র্যান্ড মাস্টারের জন্ম হচ্ছে এমন নয়, তবে নতুন নতুন প্রতিভা হরহামেশাই দেখা যায়। তাদের দাবার পরিবেশটা চমত্কার, খুব দ্রুত আগে বাড়ছে। অসাধারণ সব প্রতিভা আসছে। আমি অবশ্য আশাবাদী বাংলাদেশকে নিয়ে, ফেডারেশনের উদ্যোগে এখানকার দাবায় গতি আসবে। এটাও ঠিক যে কোনো প্রগ্রাম হাতে নিলে তার সুফল মিলবে পাঁচ বছর বাদে।

প্রশ্ন : আপনি খেলা শুরু করেছিলেন পাঁচ বছরে বয়সে। আপনার বাবাও দাবাড়ু ছিলেন, হয়তো তাই...।

নাইজেল : না। আমার বাবা কখনো আমাকে দাবা খেলায় উৎসাহ দেননি। তিনি বরং নিরুৎসাহ করেছিলেন। মায়ের চাপাচাপিতে তিনি আমাকে খেলার সুযোগ দেন। কয়েক মাস বাদে বাবাকে হারিয়ে দিই আমি। এরপর তিনি ভাবতে শুরু করেন, তাঁর ছেলে একজন ‘চেস জিনিয়াস’ (হাসতে হাসতে)। আসলে তা নয়, বাবা ছিলেন খুব দুর্বল খেলোয়াড়। কয়েকটা কম্পিটিশনে অংশ নেওয়ার পর আমি বুঝেছিলাম, বাবার খেলার মান অত ভালো নয়।

প্রশ্ন : বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ দাবার ফাইনাল খেলা প্রথম ব্রিটিশ দাবাড়ু আপনি। কাসপারভের সঙ্গে সেই ম্যাচ নিয়ে অনেক বিতর্ক...। ফিদের বাইরে গিয়ে ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে খেলেন সেই শিরোপার ম্যাচ।

নাইজেল শর্ট : প্রথমে বলি, ব্রিটেনে জন্ম নেওয়া দাবাড়ু হিসেবে আমি প্রথম খেলি শিরোপার ম্যাচ। তবে ১৮৯০ সালে আরেক ব্রিটিশ দাবাড়ু ইসদর গুনসবার্গ বিশ্ব দাবায় শিরোপার ম্যাচ খেলেছেন আমেরিকান উইলিয়ান স্টেইনিজের সঙ্গে। গুনসবার্গ ছিলেন অভিবাসী ব্রিটিশ, তাঁর জন্ম হাঙ্গেরিতে। জন্মসূত্রে ব্রিটিশ হিসেবে আমি প্রথম বিশ্ব দাবা চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করি এবং ১৯৯৩ সালের সেই ফাইনাল বিশ্ব দাবায় নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। সত্যি বললে আমি ও কাসপারভ নানা কারণে ফিদেকে চ্যালেঞ্জ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। ফিদের কর্মকাণ্ডের কারণে তৈরি হয়েছিল এই প্রেক্ষাপট। প্রফেশনাল চেস অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে এই ফাইনাল হয়েছিল এবং কাসপারভ খেতাব ধরে রেখেছিলেন। যদিও পরে ফিদে বেশ সমস্যা করেছিল।

প্রশ্ন : দাবায় রুশদের আধিপত্য ভীষণ। অন্যরা সেভাবে এগোতে পারছে না কেন?

নাইজেল : আমার মনে হয়, আপনি আগের কথা বলছেন। আধুনিক দাবায় অনেক বৈচিত্র্য এসেছে। ভারত ও চীন ভালো করছে, তাদের উন্নতি দেখার মতো। আমেরিকা তো খুব ভালো অবস্থানে এখন। দেশের জনসংখ্যাও একটা ব্যাপার। যেমন আয়ারল্যান্ডের জনসংখ্যা খুবই কম, তারা যত চেষ্টাই করুক তাদের প্রতিভাবান দাবাড়ুর সংখ্যার চেয়ে চীন-ভারত এগিয়ে থাকবে। সাফল্যও তাদের বেশি হবে।

প্রশ্ন : কিছু বছর আগেও রুশ আধিপত্য ছিল। লেনিন, স্ট্যালিন, মতো নেতারা খেলাটিকে খুব ভালোবাসতেন, সেই সূত্রেই কি জাতীয়ভাবে খেলাটির ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে?

নাইজেল শর্ট : সেটা নয়। শুরুতে খেলাটি ছিল শুধু পিটার্সবার্গকেন্দ্রিক, অভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে মুষ্টিমেয় কিছু লোক খেলতেন। পরে পরে মস্কো, কিয়েভে খেলাটি ছড়ায়, তবে অন্যান্য শহরে দাবা বড় কোনো খেলা ছিল না। আমি যতটুকু জানি, ১৯২০ সালে নিকোলাই ক্রেলেঙ্কোই খেলাটিকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য, নিজে খেলতেন এবং খেলাটির খুব সমঝদার মানুষ ছিলেন। খেলাটিকে নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা করেন, এর মাধ্যমে দেশের সাংস্কৃতিক উন্নয়নের চেষ্টা করেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অর্থনৈতিক মন্দার সময় খেলাটির মাধ্যমে জুয়ার চর্চাও হয়। ওই পরিকল্পনার সুফল দেখা যায় ২০ বছর পর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষভাগ থেকেই দাবায় বিশাল শক্তিধর হয়ে আভির্ভূত হয় রুশরা। তখন ব্রিটিশ দাবা দল ছিল মাঝারি মানের। আমেরিকা ছিল ভীষণ শক্তিশালী, তাদের অনেক নামি দাবাড়ু ছিল। কিন্তু আমেরিকানদের আধিতপ্য খর্ব করে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়ে ওঠে বিশ্ব দাবার এক নম্বর শক্তি।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের দাবায় সমস্যা কী দেখছেন? উন্নতির কোনো প্রেসক্রিপশন কি দিয়েছেন?

নাইজেল শর্ট : এখানে বড় সমস্যা হলো খেলা খুব কম। স্থানীয় পর্যায়ে কম্পিটিশনের সঙ্গে প্রতি দুই মাস অন্তর একটি করে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট করা দরকার। এটা না পারলেও এক বছরে অন্তত চারটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট হওয়া উচিত। এখানে মধ্যবয়সীরা বছরে একটি কিংবা দুটি টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পায়। এত কম টুর্নামেন্ট দিয়ে কিছু হবে না। আরেকটি জরুরি ব্যাপার হলো, খেলোয়াড়রা নিশ্চিন্তে যেন দাবা খেলার মতো সময় বের করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। দাবা যখন তার আয়ের উপায় হবে তখন সে অন্য কিছু চিন্তা করবে না, শুধু দাবাই খেলবে। মাথায় অন্য চিন্তা রেখে দাবায় উন্নতি করা কঠিন।

প্রশ্ন : আপনি পেশাদার দাবাড়ু তৈরির কথা বলছেন?

নাইজেল শর্ট : পেশাদার পরে, আগে ছেলে-মেয়েদের আকর্ষণ করার মতো কিছু লাগবে দাবায়। আমার ছেলেবেলায় আমি উইক-এন্ড টুর্নামেন্টগুলো খেলতাম। প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকে অত উঁচুমানের না হলেও প্রত্যেকটিতে এক-দুই শ পাউন্ড করে পুরস্কার থাকত। সেটা ১৯৭০ সালের কথা, এখন নিশ্চয়ই কয়েক হাজার ডলারে দাঁড়িয়েছে প্রাইজমানি। দাবায় মনোযোগী হলে অনেক সময় দিতে হবে, তাই খেলাটিকে জীবিকার উপায় হিসেবে দাঁড় করাতে হবে। সোজা কথা হলো, অর্থ ছাড়া খেলাটিকে আকর্ষণীয় করে তোলা যাবে না। এ জন্য স্পন্সর ও সরকারকে একসঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে সামনে এগোনোর।

প্রশ্ন : ফিদের পক্ষ থেকে কি কিছু করার থাকে না?

নাইজেল শর্ট : অবশ্যই ফিদেরও দায়িত্ব আছে। বিশ্ব দাবা সংস্থার আগের কমিটির কর্মকাণ্ড ছিল অন্য রকম। ফিদের নির্বাচন এলেই তারা জাতীয় ফেডারেশনগুলোকে কিছু অর্থ দিত। স্পষ্টতই এ সহযোগিতায় প্রাধান্য পেত ভোটের ইস্যু। এই কমিটি ভাবছে অন্যভাবে। প্রথম বছরে আমরা বেশ কিছু জাতীয় ফেডারেশনকে অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিয়েছি। ফিদেরও সীমাবদ্ধতা আছে, এটা ফিফা বা আইসিসির মতো ধনী সংস্থা নয়। তাই আমাদের পক্ষে অর্থের চেয়ে দাবা সম্পর্কিত অন্যান্য সহযোগিতা দেওয়া সহজ হয়। তাই বলে অর্থ দিচ্ছে না, এমন নয়। নির্দিষ্ট লক্ষ্যে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে ফিদে অর্থ বরাদ্দ দেয়।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। সার্ক দাবা দেখেছেন, দাবাড়ুদের কোচিং করিয়েছেন এবং একসঙ্গে ২৫ জনের সঙ্গে খেলেছেনও। সে রকম কাউকে কি চোখে পড়েছে?

নাইজেল শর্ট : বিশেষভাবে বলার মতো কেউ নয়। তবে ২৫ জনের বিপক্ষে খেলায় একটি বাচ্চা মেয়ে আমাকে চমকে দিয়েছে। শেষমেশ আমি জিতেছি, হয়তো জেতারই কথা। মেয়েটি খুব ভালো খেলেছে, কয়েকটি চাল ছিল অবাক করার মতো। পরে জানতে পারি তার বয়স নাকি সাত বছর (ওয়ারসিয়া খুশবু)। সাত বছর বয়সে আমি তার মতো খেলতে পারতাম না, এটা নিশ্চিত।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews