রোহিঙ্গা সংকট : মিয়ানমার সবল, বাংলাদেশ দুর্বল 

মিয়ানমারের গণহত্যা বা জাতিগত নিধনের যেসব চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তাতে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত, বর্তমানে সে দেশের সরকার নীতিগতভাবে এই পদ্ধতিতে তাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই পদ্ধতি যতই লোকে খারাপ বলুক, তার পক্ষে দাঁড়াবার মতো দেশের বা মানুষের অভাব নেই। অনেকে বলেন, ‘এটি সেনা সরকার করছে, সেখানে সু চির কোনো ভূমিকা নেই।’ অর্থাৎ সামরিক মিয়ানমার বা বেসামরিক মিয়ানমার এক নয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের চরিত্র বা ক্ষমতাচিত্র একটিমাত্র গোষ্ঠীর চোখ দিয়ে দেখা যায় না। কম উন্নত দেশগুলোতে এ ব্যাপারটি বিশেষ করে প্রযোজ্য, যেখানে সব সরকারই সামরিক ও বেসামরিক শক্তির মধ্যে মিশ্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত।

সু চি যখন স্বেচ্ছায় ক্ষমতা গ্রহণ করেন তখন তিনি জানতেন এই সরকারের চরিত্রটি কী। তাই যদি হবে তাহলে সু চিকে বাঁচানোর বিশেষ করে পশ্চিমা দুনিয়ার প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুতপক্ষে তার অপরাধ আরও অনেক গর্হিত। কারণ, তিনি গণহত্যার ওপর গণতন্ত্রের চাদর পরিয়ে গলাধঃকরণ করার চেষ্টা করছেন।

সু চিকে বাঁচাবার জন্য পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রচেষ্টাটা আমার কাছে পরিষ্কার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে যেসব জায়গায় আমি লিখি, সেখানে সু চিপন্থীরাও লেখেন। সেখানে তারা বলে আসছেন একই কথা। সেটা হলো, ‘সেনাপ্রধানদের সব দোষ, সু চির না। ওরা খারাপ তিনি ভালো।’ এর মাধ্যমে এই গণমাধ্যমকর্মীরাও মিয়ানমারের কর্মকাণ্ডে হালাল করার প্রচেষ্টার অংশে পরিণত হয়েছেন।

পশ্চিমা গণমাধ্যম বাদ দিলে, যে দুটি দেশ নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি আলাপ করি তার একটি চীন, অন্যটি ভারত। দুটি দেশই প্রথম দিকে মিয়ানমারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মিয়ানমার সরকারের দিকে যে তিরস্কারগুলো এসেছিল সেগুলো ঠেকিয়েছে তাদের সমর্থনের মাধ্যমে। জাতিসংঘে তাদের ভূমিকা সবার কাছে পরিষ্কার, মিয়ানমারকে সমর্থন করা তাদের কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে কারণ হচ্ছে, মিয়ানমারকে সমর্থনের মাধ্যমে তারা নিজেরা সুবিধা পেতে চায়।

ভারত ও চীনের ক্ষেত্রে এটা আরও জটিল। কারণ, উভয় দেশ একে- অন্যের শত্রু এবং বাংলাদেশের মতোই মিয়ানমারেও তারা একে- অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় রয়েছে। অতএব এই প্রতিযোগিতার ভিত্তিতেই তাদের এই অবস্থান। দুদেশই মোটামুটি গণহত্যা ও নির্যাতনের বিষয়টি উপেক্ষা করতে সক্ষম। আমরা চীনকে একদলীয় শাসন ব্যবস্থার রাষ্ট্র হিসেবে দেখি বলে তার মানবাধিকার অবস্থান নিয়ে অতটা ঝামেলা করি না। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে এটা অনেকের কাছে ভিন্ন মনে হয়েছে, যেহেতু ভারত নিজে ও ভারতপন্থীরা একে পৃথিবীর অন্যতম গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে অভিহিত করে। তবে এখনো পরিষ্কার না, এই বৃহত্তর গণতন্ত্র বলতে জনসংখ্যার দিক থেকে বৃহৎ নাকি গণতান্ত্রিক চর্চার  ক্ষেত্রে উত্তম সেটা। নিজের স্বার্থে উভয় দেশই গণহত্যার বিষয়ে চোখ বন্ধ করে থাকবে। এই বাস্তবতা মেনে নিলে বাংলাদেশের জন্যই মঙ্গল।

বাংলাদেশ কিন্তু প্রমাণ করেছে এই চার দেশের খেলার মধ্যে সে-ই সবচেয়ে দুর্বল। একে তো বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আছে, অন্যদিকে ওই দেশগুলোর ওপর রয়েছে নির্ভরশীলতা। যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘বর্ডার আটকাতে হবে’, তখন আমাদের দক্ষতা ও ভাবনার সীমাবদ্ধতা বোঝা যায়। কেননা ওই বর্ডার দিয়ে স্বাধীনতার পরপরই লোকজন ঢুকছে। এর মধ্যে আবার কিছু মানুষ আছেন যারা বলছেন, ‘বর্ডার খোলা রাখতে হবে, যেহেতু রোহিঙ্গারা নির্যাতিত মুসলমান।’ তার মানে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বলে কিছু নেই, তাকে রক্ষা করার কোনো অধিকারও নাই।

আমরা প্রথমে নিজেদের মানবিক প্রমাণ করতে বর্ডার খুলে রাখলাম, তারপরে রোহিঙ্গারা আমাদের কতটা ঝামেলা করছে সেটা নিয়ে কান্নাকাটি শুরু করলাম। এই ব্যর্থতা ধারাবাহিকভাবে আমাদের চলছে, ১৯৭৭ সালে, যখন থেকে রোহিঙ্গারা প্রথম গণহারে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপরে বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও সেনাবাহিনী, সবাই ক্ষমতায় এসেছে। কিন্তু কারও মনে হয়নি, সীমান্তে এত বড় একটা ঝামেলা চলছে। বর্ডার রক্ষার দায়িত্ব যে সবার ছিল এবং সে দায়িত্ব যে পালিত হয়নি সেটা স্বীকার করার মতো সৎ সাহস আমাদের নেই। কারণ, আমরা নিজের জন্য ভাবতে সাহস পাই না যে কোনো নতজানু জাতির মতো। আমরা মনে করি, ‘কেউ এসে আমাদের সমস্যার সমাধান করে দেবে, সেটা যেই হোক।’ একটা রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিপক্বতা যখন দুর্বল হয় তখন এমনটা হওয়াই স্বাভাবিক।

এসব সমস্যা থেকে যে দেশটি উত্তরণ করেছে, সেটা হচ্ছে মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গণমাধ্যম ও গবেষকরা বেশ আশ্চর্য হয়ে বলছেন, মিয়ানমার সবগুলো দেশকে অত্যন্ত সফলভাবে খেলতে পেরেছে। একসময় চীন ছিল মিয়ানমারের প্রধান বন্ধু এবং তার ওপর নির্ভরশীলতা ছিল। কিন্তু সেটা কেটে গেছে খুব দ্রুত। পাঁচ-সাত বছর ধরে মিয়ানমারের মুখাপেক্ষী হয়ে আছে চীন। তারা হাজার হাজার কোটি ডলার স্থায়ী লগ্নি করেছে, যেটা তাদের পক্ষে উঠিয়ে নেওয়া সম্ভব না। চীন বাধ্য হয়েছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী জনগোষ্ঠীদের শান, কাচেন, কারেন ইত্যাদি- যে সমর্থন দিচ্ছিল সেটা তারা উঠিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে। এখন সবাই শান্তির টেবিলে বসেছে। এদের সঙ্গে রাশিয়ার অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করেছে মিয়ানমার, যার ফলে চীনের বিপক্ষে আরেকটি বড় শক্তি মিয়ানমারে খুঁটি গাড়তে সক্ষম হয়েছে।

ভারত পুরোপুরি নির্ভরশীল মিয়ানমার সরকারের দয়ার ওপরে। তারা সবচেয়ে বেশি চায় একটি ট্রানজিট, ভারতীয় নর্থইস্টে পৌঁছানোর জন্য। কারণ, ভুটানের কাছাকাছি ডোকলাম দিয়ে যেটা, সেটা অনেকটাই চীনের থাবার নিচে। অন্যদিকেরটা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে, যেখানে চীনের প্রভাব বাড়ছে এবং যদি সরকার পাল্টায় তাহলে ভারতের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। মিয়ানমারকে বহু লোভ-ঘুষ দেখাচ্ছে ভারত, কিন্তু কাজে লাগেনি। রশিটা তাদের হাতেই রয়ে গেছে। সেই অর্থে এই রোহিঙ্গা সংকটের স্পষ্ট বিজয়ী মিয়ানমার। এটা ভাবার কোনো কারণ নেই, এই অবস্থা সহসা পরিবর্তন হচ্ছে। এই অবস্থায় চীন বিব্রত, ভারত কিছুটা বেকুব, মিয়ানমার খুশি। আর বাংলাদেশ আত্মপ্রশংসা করতে করতে ঘুমাতে পারছে না। যদিও কেন এত সফল মনে করছে সেটা বললে সবার সুবিধা হতো। নিজের শক্তি না থাকলে, পরিপক্বতা না থাকলে এই দুনিয়ায় খেলা করা সহজ নয়।

আফসান চৌধুরী : গবেষক ও সাংবাদিক।
afsan.c@gmail.com



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews