গতকাল বৃহস্পতিবার বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক খবর প্রকাশিত হয়েছে। ঐ খবর থেকে দেখা যায়, যতই দিন যাচ্ছে ততই বাংলাদেশ থেকে পুঁজি পাচার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০০৪ সালে যেখানে বাংলাদেশ থেকে পুঁজি পাচারের পরিমাণ ছিল ৩৩৫ কোটি ডলার, অর্থাৎ ২৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা সেখানে ২০১৩ সালে সেই পাচার বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৭ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এই ৮ বছরে পুঁজি পাচারের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৫০ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। এখানে বলা দরকার যে, আমরা ডলার এবং টাকার বিনিময় হার ধরেছি ১ ডলার = ৮০ টাকা। ২০০৫ সালে পাচার হয়েছে ৪২৬ কোটি ডলার। ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৬ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার, ২০১২ সালে ৭২৩ কোটি ডলার এবং ২০১৩ সালে ৯৬৬ কোটি ডলার। এই ডলারের পাশে ৮০ দিয়ে গুণ করলে সেটি বাংলাদেশী টাকায় রূপান্তরিত হবে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) গতকাল বুধবার অর্থ পাচারের এই তথ্য প্রকাশ করেছে। জিএফআই সাত বছর ধরে উন্নয়নশীল দেশ থেকে কী পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে পাচার হয়, তা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এবার উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে অবৈধ অর্থের প্রবাহ ২০০৪-১৩’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূলতঃ আমদানি-রফতানির সময়ে পণ্যের প্রকৃত মূল্য গোপন করার মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশী অর্থ পাচার করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ওই অর্থ বাংলাদেশের ২০১৫-১৬ অর্থবছরের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহন, পল্লী উন্নয়ন, শিল্প ও ভৌত অবকাঠামো খাতের মোট উন্নয়ন বাজেটের সমান। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, গত ২/৩ বছর ধরে বিনিয়োগের গতি অত্যন্ত স্থবির। এটি অর্থ পাচারের একটি বড় কারণ হতে পারে বলে তিনি মনে করেন। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে ২০১২ সালের পুঁজি পাচারের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ঐ রিপোর্টে এই মর্মে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল যে, আগামী দিনেও পুঁজি পাচার অব্যাহত থাকবে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কোনো আইন করে এই পাচার ঠেকানো যাবে না। কারণ, টাকা পাচারের বিষয়টি অনেকাংশেই সুশাসনের সাথে জড়িত। বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান মুনসুর বলেছেন, যারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থসম্পদ গড়ে তোলেন তারাই বিদেশে অর্থ পাচার করেন। এর পাশাপাশি দেশের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের একটি অংশ নিজেদের পরিবার এবং সন্তানদের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তার জন্য বিভিন্নভাবে অর্থ বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। তারা মনে করছে, যেভাবে ব্যবসা, কারখানা ও সম্পদ এ দেশে তারা গড়ে তুলেছে, তাদের সন্তানেরা তা পারবে না। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৮৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার বা ৪ লাখ ৪১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে অন্তত দুই বছরের বাজেট তৈরি করতে পারত বাংলাদেশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গড়ে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৫৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থ পাচারের এই ধরন নিয়ে এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেছেন, আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের কথা সবাই জানেন। আমার তো মনে হচ্ছে, রপ্তানির আড়ালেও অর্থ পাচার হতে পারে। গত মাসে দেশের যে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তার পেছনেও অর্থ পাচার থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করেছেন তিনি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ পুঁজি পাচার হয়েছে সেটি বিগত ১ দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এটি দেশের জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশী এবং ২০১৩ সালের মোট রফতানি আয়ের ১ তৃতীয়াংশের সমান। সাম্প্রতিক কালে  বাংলাদেশে যে পরিমাণ বিদেশী বিনিয়োগ এসেছে পাচারকৃত অর্থ তার ৩ গুণ বেশী। পত্র-পত্রিকায় যে রিপোর্ট বেরিয়েছে সেই রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, ২০১৩ সালে দেশে যে রাজনৈতিক সংঘাত এবং সহিংসতা ঘটেছিলো এবং তার ফলে যে অশ্চিয়তার সৃষ্টি হয়েছিলো তার ফলেই এই পুঁজি পাচার ঘটেছে।
আমরা একটু আগে বলেছি যে, আইন করে যেমন অর্থনীতির অবনতি রোধ করা যাবে না তেমনি আইন করে অর্থ পাচারও রোধ করা যাবে না। সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণেই অর্থনীতির অনেক খাতেই ধস নেমেছে। যে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকা- প্রায় স্থবির, যেখানে বিনিয়োগ অত্যন্ত মন্থর, সেখানেই টাকাওয়ালাদের উদ্বৃত্ত অর্থ বিদেশে পাচার হয়। যেখানে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অন্যদিকে ভৌত অবকাঠামোর অনুপস্থিতি অথবা অপ্রতুল ভৌত অবকাঠামো, সেখানে তো অর্থ পাচার হবেই। কেউ যদি ব্যবসা-বাণিজ্য বিশেষ করে শিল্প খাতে বিনিয়োগ করে এবং সেই বিনিয়োগ প্রসেস করতে ২ বছর লাগে তাহলে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে কিভাবে? বিনিয়োগ করার পর ব্যবসা-বাণিজ্য বা শিল্পের জন্য অপরিহার্য গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য মাসের পর মাস বসে থাকতে হলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হবেই। দেশী বা বিদেশী যে কোনো উদ্যোক্তা যদি বড় বিনিয়োগ করতে আসে তাহলে তাকে চাঁদবাজদের হুমকির মুখে পড়তে হয়। অন্যদিকে অফিস খরচ অর্থাৎ উৎকোচ প্রদানের অংকটাও বিশাল হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগ সুনিশ্চিত করতে হলে সর্বাগ্রে দুর্নীতি রোধ করতে হবে।  দুর্নীতি দূর হলে দু’রকম লাভ হবে। দুর্নীতির টাকার হিসাব দেওয়া যায় না বলে সেটি চোরাপথে দেশের বাইরে চলে যায়। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রিত হলে ঐ টাকা দেশেই থেকে যাবে। অন্যদিকে পরিবেশ যদি উন্নত হয় তাহলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে টাকা পাচার সম্পূর্ণ বন্ধ না হলেও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews