বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী শিশু, ব্যক্তিদের স্বীকৃতি, অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং সামাজিক জীবনে পূর্ণ অংশগ্রহণে বাধাগুলোর উপর সচেতনতার জন্য প্রতিবছর মার্চ মাস ‘বিকাশ জনিত প্রতিবন্ধকতা সচেতনতা মাস’ পালন করা হয় ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অফ কাউন্সিলস অন ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅ্যাবিলিটিজ (এনএসিসিডি) এর উদ্যোগে। এর সূচনা হয়েছিল ১৯৮৭ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট রোনাল রিগাল মার্চ মাসকে জাতীয় বিকাশ জনিত অক্ষমতা সচেতনতা মাস হিসেবে ঘোষণা করেন।
বিকাশ জনিত প্রতিবন্ধকতা একটি আজীবন অবস্থা যা শেখা, ভাষা, চলাফেরা বা স্বাধীনভাবে জীবন যাপনকে প্রভাবিত করে। শিক্ষা, অর্থপূর্ণ কর্মসংস্থান, মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা এবং আন্তরিক সামাজিক যোগাযোগে প্রকৃত সুযোগ। এই মৌলিক অধিকারগুলোর পথে এখনো অনেক বাধা রয়েছে। যার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি খুবই জরুরি।
২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য হল ‘আমরা এখানেই আছি: তখন, এখন, সর্বদা’ । এবারের প্রতিপাদ্যটিকে একটি শক্তিশালী গল্প বলার কাঠামোর মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতকে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ছবি: ডা. সেলিনা সুলতানা
তখন: এমন এক সময় যখন বিকাশগত প্রতিবন্ধী বহু শিশু ও ব্যক্তিদেরকে লুকিয়ে রাখা হতো, বিচ্ছিন্ন করে রাখা হতো বা সমাজজীবন থেকে বাদ দেওয়া হতো।
এখন: শিশু ও ব্যক্তিরা পরিপূর্ণ জীবনযাপন করছেন; কাজ করছেন, বন্ধুত্ব গড়ে তুলছেন, সন্তান পালন করছেন, স্বেচ্ছাসেবা করছেন, ধর্মীয় সম্প্রদায়ে অংশগ্রহণ করছেন এবং নিজেদের সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছেন।
সর্বদা: এমন এক ভবিষ্যৎ যেখানে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত, জীবনযাপন সুরক্ষিত, প্রত্যাশিত এবং অর্থায়িত হবে এবং এগুলোকে কোনো কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের অংশ হিসেবে দেখা হবে।
বিকাশজনিত অক্ষমতা হলো শারীরিক, শিখন, ভাষা বা আচরণগত ক্ষেত্রে দুর্বলতার কারণে সৃষ্ট বিভিন্ন অবস্থার সমষ্টি। এ অবস্থাগুলো শিশুর বিকাশকালে শুরু হয়, দৈনন্দিন কার্যকলাপে প্রভাব ফেলতে পারে এবং সাধারণত ব্যক্তির সারা জীবন ধরে স্থায়ী থাকে। বেশিরভাগ বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতা শিশুর জন্মের আগেই শুরু হয়, কিন্তু আঘাত, সংক্রমণ বা অন্যান্য কারণবশত জন্মের পরেও কিছু প্রতিবন্ধকতা দেখা দিতে পারে।
বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতার কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে জিনগত কারণ; গর্ভাবস্থায় পিতামাতার স্বাস্থ্য ও আচরণ (যেমন ধূমপান ও মদ্যপান); জন্মকালীন জটিলতা; গর্ভাবস্থায় মায়ের বা শিশুর জীবনের একেবারে শুরুতে সংক্রমণ, মা বা শিশুর সীসার মতো উচ্চ মাত্রার পরিবেশগত বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে আসা।
সাধারণ পরিচিত কারণের মধ্যে রয়েছে ফিটাল অ্যালকোহল স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার, যা গর্ভাবস্থায় মদ্যপানের কারণে হয়, তার কারণ জানতে পারলেও বেশিরভাগ কারণ গবেষণার পর্যায়ে রয়েছে। জিনগত বা ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতা, এর কারণে ডাউন সিনড্রোম, ফ্র্যাজাইল-এক্স-সিনড্রোম এবং রেট সিনড্রোমের মতো রোগগুলো দেখা দেয়।
ছবি: ডা. সেলিনা সুলতানা
শিশুদের শ্রবণশক্তি হ্রাসের অন্তত শতকরা ২৫ ভাগ এর কারণ হলো গর্ভাবস্থায় মায়ের সংক্রমণ, যেমন সাইটোমেগালোভাইরাস (সিএমভি) সংক্রমণ, জন্মের পরবর্তী জটিলতা ও শিশুর মাথায় আঘাত। যেসব শিশুর ভাই বা বোনের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার রয়েছে, তাদেরও এ সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নবজাতকের জন্ডিসের (জন্মের পর প্রথম কয়েক দিনে রক্তে বিলিরুবিনের উচ্চ মাত্রা) চিকিৎসা না করা হলে, তা কার্নিকটেরাস নামে পরিচিত এক ধরনের মস্তিষ্কের ক্ষতির কারণ হতে পারে। কার্নিকটেরাসে আক্রান্ত শিশুদের সেরিব্রাল পলসি, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা এবং দাঁতের সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। নবজাতকের জন্ডিস দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার মাধ্যমে কার্নিকটেরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রারম্ভিক বিকাশ অন্বেষণ গবেষণা হলো সিডিসি দ্বারা অর্থায়িত যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম গবেষণা, যা শিশুদের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার এবং অন্যান্য বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এমন কারণগুলো শনাক্ত করতে সহায়তা করে।
বিকাশজনিত প্রতিবন্ধকতায় ভুগছে, যেমন-

বিকাশগত প্রতিবন্ধকতা কীভাবে নির্ণয় করা হয়, তা শিশুর অবস্থার উপর নির্ভর করে। কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যা আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য স্ক্রিনিং টেস্ট বা শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। অন্যান্য পরীক্ষা ও প্রশ্ন শিশুর বিকাশগত প্রতিবন্ধকতা আছে কিনা তা খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। এগুলোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে-
এগুলো থেকেই শিশুটির চিকিৎসক বুঝতে পারেন ঠিক কোথা থেকে শিশুটির জন্য শুরু করতে হবে, তার সাথে পুরো একটি মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম কাজ করে থাকে যাদের মধ্যে থাকেন,ফিজিক্যাল(শারীরিক), স্পিচ (বাক) এবং অকুপেশনাল (পেশাগত থেরাপি), স্পেশাল টিচিং মেথডস (বিশেষ শিক্ষণ পদ্ধতি), সাইকোলজিক্যাল কাউন্সিলিং (মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ)এবং সময়ের সাথে সাথে সবাই শিশুদের বৃদ্ধি ও পরিবর্তনের উপর নজর রাখেন।
লেখক: ডা: সেলিনা সুলতানা
কনসালটেন্ট: নিউরোডেভলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার এবং চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পেডিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্ট, বেটার লাইফ হসপিটাল।
প্রাক্তন অটিজম বিশেষজ্ঞ: ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল।
জেএস/