তমসুর হোসেন

মুহাম্মাদ সা:-এর সেই আকর্ষণীয় বিশ্বাসগুলো

‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তাঁর সহচরেরা কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদের রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমণ্ডলে থাকবে সিজদার চিহ্ন, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইঞ্জিলেও। তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, অতঃপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের ওপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষির জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দিয়ে কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে ও সৎ কর্ম করে আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের’ (সূরা ফাতহ : ২৯)।

সব নবী-রাসূল যার রেসালত প্রকাশে অঙ্গীকারাবদ্ধ, যিনি কিতাবপ্রাপ্তদের কাছে দিবসের রোদের মতো স্পষ্ট এবং সুবিদিত, যিনি আদম সৃষ্টির বহু আগে নবী বলে প্রকাশিত, যিনি প্রথম মুসলিম এবং সর্বশেষ নবী, যিনি ইসলামের প্রদীপ্ত রাসূল, যিনি সব নবীর উম্মতের চেয়েও নিকটতম, যিনি মুমিনের আত্মার সুরভি এবং তার বিবিরা তাদের জন্মদাত্রী সমতুল্য, যিনি মহান রবের পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি বিশেষ অনুকম্পা, যিনি সৃষ্টির সেরা এবং মানবজাতির সর্দার, যার অনুসরণ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহরই আনুগত্য। যার রিসালাত বিশ্বজনীন এবং যিনি উম্মতের নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু, যিনি নিষ্পাপ এবং নৈশযোগে ঊর্ধ্বলোকে গমনকারী, সব গুপ্তভাণ্ডারের চাবি ছিল যার আয়ত্তে। যার জামানা সব জামানার চেয়ে শ্রেষ্ঠ, যিনি সব নবীর ইমাম, যিনি চন্দ্র দ্বিখণ্ডকারী, যিনি সামনে এবং পশ্চাৎ যুগপৎ প্রত্যক্ষ করতে পারতেন, যার স্বপ্ন ছিল প্রকৃত বাস্তবের সম্যক দর্শন, যার পতাকাতলে সব নবী হবেন সমবেত, যিনি সর্বপ্রথম সুরক্ষিত জান্নাতের কড়া নাড়বেন। যিনি হবেন আল-ওয়াসিলাহ্ এবং আল ফাদিলাহ্ প্রাপ্ত, তার কুরসি থাকবে মহান আল্লাহ পাকের আরশের ডান পাশে। যাকে মাকামে মাহমুদ ও চিত্ত প্রশান্তকারী আল কাওসার দান করা হয়েছে, আল্লাহ পাক তাকে বহুমুখী শাফায়াতের ক্ষমতা দান করেছেন এবং তিনিই সর্বপ্রথম আপন উম্মতসহ পুলসিরাত পার হবেন। সর্বজ্ঞ আল্লাহ পাক যে নবীকে হাবিব হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তাকে তিনি বিশ্ববাসীর সামনে রাসূল বলে প্রকাশ করাই যথার্থ মনে করেছেন। তাকে তিনি মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ বাক্যের মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন।

নবী করীম সা:-এর বাহ্যিক গঠন ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং লাবণ্যময়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাবলীল এবং ক্ষিপ্রগতি সম্পন্ন। সাধারণত সুশ্রী এবং কোমল তনুর কোনো মানুষ এতটা কর্মঠ এবং আলস্যহীন হয় না। আবু ইউনুস রহ: হজরত আবু হুরায়রা রা:-কে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, ‘আমি নবী সা: অপেক্ষা অধিক সুন্দর ও সুশ্রী কোনো মানুষ দেখিনি। (তাঁর সৌন্দর্য এবং রূপ এমন ছিল) যেন কোনো সূর্য তাঁর ললাটের ওপর দিয়ে বিচরণ করছে। অনুরূপ আমি নবী সা: অপেক্ষা অধিক দ্রুত গতিতে পথ চলতে কাউকে দেখিনি। (তাঁর পথ চলাকালে মনে হতো) যেন ভূমিকে তার জন্য সঙ্কুচিত করে দেয়া হয়েছে। (শামায়েলে তিরমিজি)

রাসূল সা:-এর চেহারা মোবারক এমন নিষ্পাপ এবং নিষ্কলঙ্ক ছিল যে শুভ্র বস্ত্রখণ্ডের ওপর কালিঝুলির দাগের মতো তার মেজাজের আবেগ উৎকণ্ঠা চেহারায় ভেসে উঠত। হজরত আনাস রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,‘রাসূল সা: পর্দানশিন কুমারী অপেক্ষাও অধিক লজ্জাশীলা ছিলেন। তিনি যখন কোনো কিছু অপছন্দ করতেন তা তাঁর চেহারা মোবারক দেখেই বোঝা যেত। হজরত আনাস ইবনে মালিক রা: বলেন, ‘নবী সা: কুমারী অপেক্ষাও লজ্জাশীলা ছিলেন।’

আল্লাহপাক রাসূলকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন একটি ন্যায়দর্শী সমাজ নির্মাণের জন্য। তিনি তাঁর জীবনের একটি মুহূর্তও অকাজে নষ্ট করেননি। অন্যায়ের আধিক্যে দিশাহীন হয়ে পাপাসক্ত পৃথিবীকে প্রচলিত নিয়মে পরিশুদ্ধ করার কাজে করেননি আত্মনিয়োগ। তিনি আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমা ও মার্জনার নীতিতে বিশ্বব্যবস্থা বদলে দেয়ার মহান আন্দোলনে নিয়োজিত হন। রাসূল সা: এরশাদ করেন, তাওরাতে আছে : আল্লাহ পাক বলেন, ‘(হে আমার প্রিয়নবী) যারা কিতাবপ্রাপ্ত নয় সেই মূর্খদের উৎসাহিত করুন। কারণ আপনি আমার বান্দাহ ও রাসূল। আমি আপনাকে মুত্তাওয়াক্কিল উপাধিতে ভূষিত করেছি। আপনি রূঢ় ও কর্কশভাষী নন, বাজারে বসে গালগল্প করেন না, আপনি অন্যায়কে অন্যায় দ্বারা প্রতিহত করেন না বরং তা ক্ষমা ও মার্জনা করেন। আর আপনাকে মহান আল্লাহ এই পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেবেন না, যতক্ষণ না দুর্বলদের মিলাত এভাবে গঠিত না হয় যে তারা তখন বলবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, তখন অন্ধের চোখ খুলে যাবে এবং কুফরির চাদরে ঢাকা অন্তরসমূহ আবরণমুক্ত হবে।’

রাসূল সা:-এর রিসালাত আল্লাহ প্রেরিত নবী-রাসূলদের পরম্পরাগত ধারাক্রমের চূড়ান্ত বিকাশ। সত্য দ্বীন প্রকাশের কার্যক্রমে প্রত্যেক নবীরই ছিল বিশেষ ভূমিকা। সব নবীরই মিশন ছিল বাতিল উৎখাত করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ পাক তার শেষ নবীর মাধ্যমে তার মনোনীত দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণতা দান করেন। হজরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: এরশাদ করেন : আমার এবং আগেকার নবীদের দৃষ্টান্ত এরূপ যে, এক লোক একটি ইমারত নির্মাণ করল, সে ইমারতটি উত্তমভাবে তৈরি করার পর এটিকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করল। কিন্তু এক জায়গায় একটি ইট খালি রাখল। লোকেরা ইমারতটির চাকচিক্য এবং স্থাপত্যশৈলী ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। সবাই এর অনুপম গঠননৈপুণ্য এবং বিরল নান্দনিকতায় মুগ্ধ হলো। কিন্তু একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে সবাই করতে লাগল- এই জায়গায় একখানা ইট বসানো হয়নি কেন। রাসূল সা: বলেন : আমিই সেই সর্বশেষ ইট এবং আমিই শেষনবী’ (বুখারি, মুসলিম)।

রাসূল সা:-এর প্রচারিত দ্বীনকে যারা প্রত্যাখ্যান করেছে তাদের সামনে সঙ্গত কোনো যুক্তি ছিল না। মিথ্যা অহমিকা, অন্ধগর্ব এবং গোত্রদ্বন্দ্বের জাত্যাভিমানই তাদের এই মহান দ্বীন অস্বীকার করার প্রেরণা জুগিয়েছে। সুলতান ইবনে আসিম রা: থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন : রাসূল সা: একদিন মসজিদে নববীতে এক মজলিসে বসেছিলেন। তখন মসজিদের ভেতরে এক ব্যক্তি পায়চারী করছিল। হজরত সা: সেই ব্যক্তির দিকে অপলক চেয়ে হাসলেন। তারপর তাকে ডেকে বললেন : ওহে অমুক। সে ব্যক্তি জওয়াবে বললেন : লাব্বাইকা ইয়া রাসূলুল্লাহ, হে আল্লাহর রাসূল আমি আপনার খেদমতে হাজির। তিনি আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে আবার শুধু উচ্চারণ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! হজরত সা: এরশাদ করলেন, ‘তুমি কি সাক্ষ্য দাও যে আমি আল্লাহর রাসূল?’ তিনি জওয়াবে বললেন, না। হজরত সা: বললেন, ‘তুমি কি তাওরাত পড়ো?’ লোকটি জওয়াব দিলেন, জি হ্যাঁ। হুজুর সা: বললেন, ইনজিল পড়ো? তিনি বললেন, জি হ্যাঁ, পড়ি। হজরত সা: বললেন, পবিত্র কুরআন? তিনি বললেন, ‘যার হাতে আমার জীবন তার শপথ। আমি ইচ্ছে করতাম তবে পড়তে পারতাম।’ তারপর হুজুর সা: লোকটিকে শপথ করিয়ে বললেন : ‘তুমি কি আমাকে তাওরাত ও ইনজিলে পেয়েছ?’

লোকটি বললেন : ‘আমরা তাওরাত ও ইনজিলে আপনার আবির্ভাবের এবং আপনার আকার আকৃতির হুবহু বর্ণনা পেয়েছি। কিন্তু আমরা আশা করেছিলাম যে, আপনি আমাদের ইসরাইলি গোত্র থেকে আবির্ভূত হবেন। তারপর যখন প্রকৃতই আপনি আবির্ভূত হলেন, তখন আমরা আশঙ্কা করলাম যে আপনি হয়তো সেই ব্যক্তি হবেন। তারপর আমরা লক্ষ করলাম এবং দেখলাম যে আপনি সেই ব্যক্তি নন।’ হুজুর সা: জিজ্ঞেস করলেন : ‘কিভাবে তোমরা তা লক্ষ করলে?’

লোকটি জওয়াব দিলেন : ‘তাঁর সাথে তাঁর সত্তর হাজার এমন উম্মত থাকবেন যাদের কোনো হিসাবও হবে না, কোনো আজাবও হবে না। কিন্তু আপনার সাথে মুষ্টিমেয় কিছু লোক দেখা যায়।’ হুজুর সা: বললেন, ‘যে সত্তার হাতে আমার জীবন, তার কসম করে বলছি, নিঃসন্দেহে আমিই সেই ব্যক্তি। তোমার বর্ণিত গুণাবলিসম্পন্ন সেই সব লোক আমারই উম্মতভুক্ত এবং তারা সত্তর হাজার ও সত্তর হাজার অপেক্ষাও অনেক বেশি হবে’ (আজমাউজ যাওয়ারিদ)।

হজরত মুহাম্মাদ সা:-এর আবির্ভাবের অল্পকালের মধ্যেই একটি অতুলনীয় ইতিহাস সৃষ্টি করে ফেললেন। ইসলামি বিপ্লবী কলেমার অপ্রতিরোধ্য প্রচারের কারণে এশিয়া, ইউরোপ এবং অরণ্যময় আফ্রিকার নিভৃত জনপদে হৃদয় কাঁপানো সাম্য সভ্যতার বিস্তার ঘটতে লাগল। সুদূর আরবের মরুভূমি থেকে দিগি¦জয়ী অশ্বের পিঠে আরোহণ করে ইসলামের সুমধুর আহ্বান ছুটে চলল পৃথিবীর উন্মুক্ত প্রান্তরে। ইসলামের মহান নবীর সে কালজয়ী কীর্তি অনুধাবন করে খ্রিষ্টান ঐতিহাসিক উইলিয়াম মুর বলেছেন : ‘মুহাম্মাদ সা: যে যুগে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন, তাকে শুধু সে যুগেরই একজন মনীষী বলা ঠিক হবে না, বরং তিনি ছিলেন সর্বকালের, সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী।’

নামকরা ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক ও চরম ইসলাম বিদ্বেষী সমালোচক এইচ জি ওয়েলসের মুখেও মুহাম্মাদ সা:-এর স্তুতি দেখে অবাক না হয়ে পারা যায় না। তিনি তার বিদ্বেষপরায়ণ মনোভাব সত্ত্বে¡ও ইসলামের অনুপম বিশ্বাসের আলোকে প্রতিষ্ঠিত শান্তিময় সমাজব্যবস্থার প্রশংসা করেছেন অতলস্পর্শী বিবেচকের ভাষায়। তিনি বলেছেন : ‘মুহাম্মাদ সা: সেই আকর্ষণীয় বিশ্বাসগুলো মানবজাতিকে হৃদয়ঙ্গম করিয়েছিলেন। ইসলাম সৃষ্টি করেছিল এমন এক সমাজ, এর আগে দুনিয়ার অস্তিত্বশীল যেকোনো সমাজের তুলনায়, যা ছিল ব্যাপক নিষ্ঠুরতা ও সামাজিক অত্যাচার থেকে অধিকতর মুক্ত।’

মুহাম্মাদ সা: সম্পর্কে গুরু নানকের বিখ্যাত উক্তিটি স্মরণ করার মতো একটি দলিল। মানবরচিত সাড়া জাগানো বাহ্যিকতাসর্বস্ব মতবাদগুলোর অসারতা নিগূঢ়ভাবে খতিয়ে দেখে তিনি বলেছিলেন : ‘এখন দুনিয়াকে পরিচালিত করার জন্য কুরআনই একমাত্র গ্রন্থ। সাধু, সংস্কারক, গাজী, পীর, শেখ ও কুতুবরা অশেষ উপকার পাবেন যদি তারা পবিত্র নবীর ওপর দরুদ পাঠ করেন।’
লেখক : কবি





Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews