সমাজ ও রাজনীতি দুটিই বাস্তবিক সত্য। এদের মধ্যে পরস্প-নির্ভরশীলতাও রয়েছে; তবে চূড়ান্ত বিচারে সমাজ অধিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের চেয়ে। ওদিকে আবার সমাজ ও রাজনীতি উভয়েই নিয়ন্ত্রিত হয় অর্থনীতির দ্বারা। সাম্প্রতিক রাজনীতির যে চেহারা আমরা দেখছি, সেই চেহারায় ফুটে উঠেছে পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য। বিশ্ব রাজনীতিতে যেমন, তেমনি বাংলাদেশেও সমাজবদলের রাজনীতি যে মূলধারা হতে পারছে না, সেটাও ওই পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্যের কারণেই। টাকাওয়ালারাই এখানে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনীতি চলে গেছে টাকার অধীনে। যাদেরকে বুর্জোয়া বলা হয়, সেই ধনীরাই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে।পুঁজিবাদ যে কতটা বিবেকহীন ও নির্মম হতে পারে, তার নিদর্শন হচ্ছে বর্তমান চীন। সমাজতান্ত্রিক চীন একদিন তার দেশের মানুষকে মুক্ত করেছিল। আগের কালে চীন ঝিমাত, সমাজতন্ত্র এসে তাকে কেবল জাগায়নি, হাসি-আনন্দে মুখর করে তুলেছিল। চীন বিশ্বের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনকে অনুপ্রেরণা দিত, সমর্থন জোগাত, সংশোধনবাদী সোভিয়েত নেতৃত্বের সমালোচনা করত। পুঁজিবাদী উন্নতির আদর্শে দীক্ষিত হয়ে সেই চীন এখন নিজের দেশে মানুষকে উৎপাটিত করছে, সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন শুরু করে দিয়েছে, জ্বালানি-পুড়িয়ে ধরিত্রীকে উত্তপ্ত ও বিপন্ন করায় মনোযোগ দিয়েছে, দুর্নীতির দায়ে বড় বড় নেতাকে শাস্তি দিতে বাধ্য হচ্ছে এবং জাতীয় স্বার্থে পৃথিবীকে দখল করে ফেলতে চাইছে। মিয়ানমারে গণহত্যা হয়েছে। চীন বলছে, এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এ ব্যাপারে বিশ্বের কিছু করার নেই। অর্থাৎ গণহত্যা বৈধ, সেটা কোনো অপরাধ নয়। চীনের পুঁজিবাদী লক্ষণটা '৭১-এও টের পাওয়া গেছে। '৭১-এ বাংলাদেশে নৃশংস গণহত্যা চলছিল। চীন বলেছিল, সেটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার।এটা একটা দৃষ্টান্ত। পুঁজিবাদীদের এটাই স্বভাব। বাংলাদেশের রাজনীতিও পুঁজিবাদীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তথাকথিত বুর্জোয়ারাই রাষ্ট্র, সমাজ ও অর্থনীতিতে অপ্রতিহতভাবে কর্তৃত্ব করছে। তারাই বীর, তারাই আদর্শ। ফলে এটা খুবই স্বাভাবিক যে, বুর্জোয়াদের নোংরা ও হাস্যকর রাজনীতিই মূলধারা হিসেবে বিরাজ করবে এবং সমাজতন্ত্রীরা কোণঠাসা হয়ে থাকবে। কিন্তু বুর্জোয়াদের রাজনীতি মানুষের মুক্তি আনবে না, সমাজকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাবে, এখন যেমন যাচ্ছে। নৈতিকতার দিক থেকে সমাজতন্ত্রীদের অবস্থান বুর্জোয়াদের তুলনায় অনেক উঁচুতে। বুর্জোয়াদের রাজনীতি ব্যক্তিগত মুনাফার লোলুপতা দ্বারা পরিচালিত; এর বিপরীতে সমাজতন্ত্রীরা চান সমষ্টিগত উন্নতি। বুর্জোয়ারা স্বার্থপর, সমাজতন্ত্রীরা সামাজিক। কিন্তু কেবল নৈতিক উচ্চতায় তো আন্দোলনে সাফল্য আসে না, আসবে না। প্রয়োজন জ্ঞানের উচ্চতাও। আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতারা যেমন নৈতিকতায়, তেমনি জ্ঞানেও ছিলেন বুর্জোয়াদের চেয়ে অনেক উঁচুতে। বাংলাদেশের বামপন্থি আন্দোলনের একটা বড় দুর্বলতা হচ্ছে, জ্ঞানের ক্ষেত্রে অব্যাহত ও অগ্রসরমান অনুশীলনের অভাব। কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, প্রয়োজন বাস্তবিক জ্ঞানও। যে সমাজে তারা কাজ করছেন সেটির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সেখানে মানুষের স্বপ্ন, সমাজ ও রাষ্ট্রে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব। এগুলোকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার জন্য তারা যথেষ্ট জ্ঞানের পরিচয় দিতে পারেননি। এ দেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বামপন্থিরা ছিলেন চালিকাশক্তি; কিন্তু তারা নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। নেতৃত্ব চলে গেছে বুর্জোয়াদের হাতে। এর মূল কারণ, বামপন্থিদের নিজেদের ভেতর ঐক্যের অভাব, তাদের মস্কো ও পিকিংয়ের ওপর নির্ভরতা এবং প্রধান দ্বন্দ্বকে চিহ্নিতকরণে অপারগতা।মুক্তিযুদ্ধের পরে ক্ষমতা চলে গেছে জাতীয়তাবাদীদের হাতে এবং স্বভাবতই তারা তাদের প্রধান শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে বামপন্থিদের। বামপন্থিদের মধ্যে যারা মস্কোপন্থি ছিলেন, তারা জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে চলে যাওয়াটাকে সঠিক পন্থা ভেবেছেন; অন্যদিকে পিকিংপন্থিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছেন, জাতীয়তাবাদীরা তাদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছে। সমাজতন্ত্রের আওয়াজটা তখন তুলে নিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদীদেরই একাংশ, নিজেদের যারা নাম দিয়েছিলেন জাতীয় সমাজতন্ত্রী বলে। এরা সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। যে কাজটা এরা করেছেন তা হলো, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষতিসাধন। ওদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন সমাজতন্ত্রীদের হতাশ করেছে। মস্কোপন্থিদের একাংশ যারা আসলে মস্কোপন্থিই ছিল, কমিউনিস্ট ছিল না, তারা স্বেচ্ছা-বিলুপ্তিতে চলে গেছেন। '৭১-এর যুদ্ধে এমন বহু মানুষ শহীদ হয়েছেন, জীবিত থাকলে যারা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দিতেন। মেধাবান অনেক তরুণ বিদেশে চলে গেছে; এদের বেশিরভাগই বামপন্থি আন্দোলনে থাকত, যদি সে আন্দোলন বেগবান হতো।দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জোর হাওয়া বইছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যক হলো মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং আস্থাভাজন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। এই দুটির কোনোটিই নেই-এই অভিমত অনেকেরই। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নানা আইনি-বেআইনি পন্থায় খর্ব করা হচ্ছে। গণমামলা ও গণগ্রেফতার ইতিমধ্যে কম হয়নি। এই অভিযোগও অসত্য নয় যে, সরকারবিরোধীরা নির্বাচনী প্রচারের যথার্থ সুযোগ পাচ্ছে না। এগুলোর কোনোটাই নির্বাচনের জন্য নিঃশঙ্ক পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক নয়। তারপরও আশা করব, পরিবেশ উন্নত করা হবে। কেননা সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। জনগণ যে হারবে, সেটা নিশ্চিত। আগেও তারা হেরেছে, এবারও তারা হারবে। এর প্রধান কারণ তাদের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দল নেই। যারা জিতবে, তারা সবাই দেখা যাবে টাকাওয়ালা; সবাই তারা পুঁজিবাদী আদর্শে দীক্ষিত এবং বড় দলের লোক। তাদের টাকা আছে। বস্তুত টাকাই তাদের প্রধান জোর, টাকা না থাকলে তাদের পক্ষে বড় দল থেকে নমিনেশন পাওয়াই সম্ভব হবে না, জেতা তো পরের কথা। নির্বাচন বাণিজ্যে যারা অর্থ বিনিয়োগ করবে, তারা সে অর্থ বহুগুণে তুলে নেবে। ওই অর্থ জনগণের, যাদের শ্রমে দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। নির্বাচনের পরের দিন থেকেই দেখা যাবে, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণ থেকে দূরে সরে গেছে এবং নিজেদের স্বার্থে জনস্বার্থের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এটাই তো বাস্তবতা।ইতিমধ্যে রাজনীতিতে নানারকম মেরুকরণ ঘটেছে। ভোটকেন্দ্রিক জোট হয়েছে এবং ভোটের রাজনীতিতে এই মেরুকরণের নানারকম সমীকরণও চলছে। বামপন্থিদের জোটটা আলাদা; আমরা সেভাবেই একে দেখতে চাই। অন্য জোটগুলোর উদ্দেশ্য একটাই, নির্বাচনে জেতা। বুর্জোয়াদের বড় যে দুটি দল রয়েছে, তাদের ভেতর সমঝোতা সম্ভব নয়। কারণ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে তারা একে অপরের মুখ্য প্রতিদ্বন্দ্বী। এই দুই দলকে কেন্দ্র করেই বড় দুটি জোট হয়েছে। জোট গড়ার প্রধান কারণ হলো, বড় দুই দলের কারোই এমন নৈতিক ও জনসমর্থনগত জোর নেই, যার ওপর ভরসা করে তারা এককভাবে নির্বাচনে দাঁড়াতে পারে। তাই তারা অন্যদের কাছে টানতে চায়। এই অন্যরা ছোট ছোট দল। এদেরকে কিছু আসন ছেড়ে দিলেই চলবে। আর এই ছোট দলগুলোর এমন জনসমর্থন নেই যে, তারা নিজেদের পায়ে দাঁড়াবে। দাঁড়ালে জামানত যে বাজেয়াপ্ত হবে, এটা নিশ্চিত। তাই তারা জোটে আসছে। মিলনটা মোটেই আদর্শগত নয়, পুরোপুরি বৈষয়িক স্বার্থগত।আশা করব, বামপন্থিদের জোটটা নির্বাচনী জোট হবে না। এই আশার ভিত্তি হলো এই সত্য যে, নির্বাচনে এরা যে জিতবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। এদের টাকা নেই, এদের পক্ষে কাজ করার প্রচারমাধ্যম নেই। এ দুটিই বড় অসুবিধা। বামপন্থিরা যদি নির্বাচনে যায়, তবে যাবে কাজটাকে আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। নির্বাচনকে তারা তিনটি কাজে ব্যবহার করতে পারবে- এক. জনসংযোগ ও মতাদর্শ প্রচার; দুই. সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি ও তিন. নির্বাচনে যে জনগণ জেতে না, নির্বাচন যে আসলে কার হাতে পরবর্তী ৫ বছর ধরে জনগণ লাঞ্ছিত হবে, সেটা বেছে নেওয়ার একটা পদ্ধতিমাত্র, সেই সত্যটাকে উন্মোচিত করে দেওয়া। বামপন্থিদের দায়িত্ব সমাজ বিপ্লব সম্ভব করা। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সমাজ বিপ্লব ঘটবে না; তবে নির্বাচন সমাজ বিপ্লবের কাজকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। বামপন্থিদের এমন জোট আগে কখনও হয়নি। জোট কাদের নেতৃত্বে এগোবে, সেটা স্থির হয়ে যাবে আন্দোলনে কার কতটা ভূমিকা তার দ্বারাই।সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতিই ভরসা। সে রাজনীতির জন্য ইতিবাচক পরিস্থিতি ক্রমশ পরিপকস্ফ হচ্ছে এবং ইতিবাচক উপাদান কীভাবে এগোয়, তার ওপরই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি এগোবে। কারণ মানুষ বিদ্যমান অবস্থাকে মেনে নেবে না, তাদের বাঁচার লড়াই সমাজ পরিবর্তনের লড়াইয়ে পরিণত হবে। মুক্তির জন্য এ দেশের মানুষের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাসটা মিথ্যা নয়; সংগ্রামের সেই অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসই বলছে যে, মুক্তির সংগ্রাম এগোবে। ডান দিক থেকে সরে এসে তাকে বাম দিকেই এগোতে হবে। আমাদের সমষ্টিগত ভবিষ্যৎ এবং বাম আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এক ও অভিন্ন।শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে। এটা আপাত ছোট; কিন্তু আসলে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে গত ২৮ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতি। এমনটা পাকিস্তান আমলে ঘটা সম্ভব ছিল না; এমনকি ব্রিটিশ আমলেও নয়। দেশের রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারি দলের নেতা, সবাই বলেন ছাত্র সংসদ থাকা উচিত; হাইকোর্টও রায় দিয়েছেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা দরকার। কিন্তু ব্যবস্থা করা হচ্ছে না। এর অর্থ পরিস্কার। ছাত্ররা সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে জ্ঞানের চর্চা করুক। এ ব্যাপারে শাসকশ্রেণির কোনো আগ্রহ নেই। এটা প্রতীকের মতো ঘটনা। শিক্ষাঙ্গনে যে প্রাণ নেই, এ ঘটনা তার সাক্ষীও বটে। শিক্ষার্থীরা সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে বিকশিত হচ্ছে না, শিক্ষাকে গ্রহণ করার ক্ষমতাও তারা হারিয়ে ফেলছে। তাদের জীবনে সুস্থ বিনোদন নেই। ছেলেমেয়েরা হতাশায় ভুগছে। তারা মাদকে আসক্ত হচ্ছে। অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ছে। বুর্জোয়াদের যখন যে দল রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পায়, তখন তাদের ছাত্র সংগঠন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দলীয় আধিপত্য ও সন্ত্রাস কায়েম করে। ভিন্ন মতপ্রকাশের সুযোগ তারা লুপ্ত করে দেয়। ভবিষ্যতের নেতৃত্বের জন্য পথ তৈরি করা হচ্ছে না। তবে সে পথ অবশ্যই তৈরি হবে। তরুণ প্রজন্ম পথের রুদ্ধ দশাকে মেনে নেবে না। তারা পথ তৈরি করে নেবে; নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় যেমন করে তৈরি করে নিয়েছিল। তারা রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন। কিন্তু সমাজ তো বদলাবে না, যদি না মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করা যায়। তরুণরা সেটা বুঝবে বলেই আশা করি। বিশেষভাবে বুঝবে তারা অবস্থার ক্রমবর্ধমান চাপেই।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews