১ ফেব্রুয়ারি ১৭৬৭, এক কবোষ্ণ উজ্জ্বল সকালে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের রচফরগ বন্দরে অভিযাত্রার জন্য প্রস্তুত ফরাসি রাজকীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ‘ইতোয়াল’ (নক্ষত্র)-এর অভিযাত্রী এবং নাবিকেরা খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, চারদিকে হাঁকডাক। খানিক বাদেই নোঙর তুলে যাত্রা করবে দুর্গম, ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ উত্তাল সমুদ্রপথে অজানাকে জানতে, বহু দূরের অচেনা অজানা দেশ, জনপদের উদ্দেশে।

নিকটজনেরা অনেকেই তাই বন্দরে ভিড় করেছেন কাছের পুরুষ মানুষটিকে বিদায় দিতে। কেননা এসব দুঃসাহসী, প্রচণ্ড পরিশ্রমী নাবিক, অভিযাত্রীদের আত্মীয়-পরিজনেরা জানতেন, ভাগ্য অনেক বেশি সুপ্রসন্ন থাকলে বহু বছর পরে আবারও দেখা হবে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে। তবে তখনকার দিনে ফের দেখা না হওয়ার সম্ভাবনাই অনেক বেশি ছিল। আর তাই কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, কেউবা চোখের জল লুকিয়ে বিষণ্ন অবয়বে জোর করে ফুটিয়েছেন কৃত্রিম হাসি। যেমনটা ঘটে অন্তিম বিদায়ের সময়।
ফিলিবার্ত কমারসন। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স।

ঠিক এই সময়ে তড়িঘড়ি করে হাজির হলেন একজন টগবগে তরুণ, বয়স মাত্র ২৬, চেহারায় কমনীয়তার ছাপ থাকলেও উজ্জ্বল চোখে বুদ্ধির দীপ্তি সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। এই অভিযানের মধ্যমণি চিকিৎসক এবং প্রকৃতিবিদ ফিলিবার্ত কমারসনের সঙ্গী হয়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তরুণটি। নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে জানালেন, তিনি একজন উদ্ভিদবিদ এবং গাছপালা চিনতে তিনি বিশেষ পারদর্শী।

ফিলিবার্ত কমারসন এই দৃঢ়চেতা তরুণকে তাঁর সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিতে কর্তৃপক্ষকে রাজি করলেন।

একটু পরেই জাহাজ নোঙর তুলবে, তাই এ নিয়ে কারও মাথা ঘামাবার সময় ছিল না। আর তা ছাড়া, ফিলিবার্ত কমারসন ছিলেন অসুস্থ। কারণ বহুদিন থেকে তাঁর পায়ে একটা দুষ্ট ক্ষত বাসা বেঁধেছে। কিছুতেই সারছে না। নিজে চিকিৎসক হয়েও প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন প্রচণ্ড কষ্টদায়ক দীর্ঘস্থায়ী বেদনার সঙ্গে।

সে জন্য তাঁকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা, সেবা-শুশ্রূষা করা এবং উদ্ভিদ, প্রাণী, পাথর, শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ, সংরক্ষণ, ক্রমানুসারে সাজানো, তালিকাভুক্ত করা থেকে বর্ণনা লিপিবদ্ধ করতে সাহায্য করার জন্য একজন সহকারী সঙ্গে নিতে পারেন বলে আগে থেকেই জানানো হয়েছে। এ জন্য যা খরচ হবে, তা রাজকোষাগার দেবে।

এ সময় হঠাৎ করে এই সুদর্শন তরুণের আগমন যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। তবে ফিলিবার্ত কমারসন মোটেই অবাক হননি। তিনি যেন আগে থেকেই যেন জানতেন এমনটা ঘটবে।

জাহাজের অভিযাত্রীদের একজন হিসেবে তাঁর নাম লেখা হলো জঁ বারে, জন্মতারিখ ২৭ জুলাই ১৭৪০, লিঙ্গ পুরুষ, পদবি সহকারী এবং খানসামা।

জঁ বারে। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স।

এই পরিচয়ে জন্মতারিখ সঠিক হলেও, তিনি কখনোই পুরুষ নন, তিনি ছিলেন একজন আপাদমস্তক নারী। আর নামের বানান খানিকটা হেরফের করেছিলেন পুরুষালি করার জন্য। ১৮ শতকে নারীদের এমন কষ্টসাধ্য এবং বিপজ্জনক অভিযানে সঙ্গী করার কথা কেউ ভাবতেও পারত না। তা ছাড়া বহু আগে অধ্যাদেশ জারি করে রাজা তা একদম নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। রাজার আদেশের অন্যথা হওয়ার কোনো উপায় নেই।

সে কারণেই এমন ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া জঁ বারের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। একাধারে মনিব, শিক্ষাগুরু এবং প্রেমিক ফিলিবার্ত কমারসনের প্রতি ভালোবাসার টান এবং অদম্য জ্ঞানপিপাসা তাঁকে এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছিল।

এই যাত্রার অধিনায়ক ছিলেন ফরাসি রাজকীয় নৌবাহিনীর একজন চৌকস এডমিরাল লুই আঁতোয়ান দ্য বুগেনভিল। তিনি ১৭৬৫ সালে ফ্রান্সের রাজা পঞ্চদশ লুইয়ের নির্দেশে বুঁদোজ এবং ইতোয়াল নামের দুটি জাহাজ নিয়ে বিশ্ব প্রদক্ষিণের আয়োজন করেন। এটি ছিল ফরাসি অভিযাত্রীদের জলপথে বিশ্ব প্রদক্ষিণের প্রথম আয়োজন। এ যাত্রায় দুটি জাহাজে নাবিক-খালাসি, অভিযাত্রী মিলিয়ে ছিলেন প্রায় ৪০০ জন পুরুষ এবং পুরুষের ছদ্মবেশে মাত্র একজন নারী জঁ বারে। এ অভিযানের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল, জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করা। আর তাই এডমিরাল লুই আঁতোয়ান দ্য বুগেনভিল তাঁর সঙ্গে সঙ্গী হতে সেকালের নামকরা শৌখিন এবং পেশাদার বিজ্ঞানী, ভূতাত্ত্বিক, জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জীববিজ্ঞানী, প্রকৃতিবিদদের আমন্ত্রণ জানান।

১ ফেব্রুয়ারি ১৭৬৭ সালে রচফরগ বন্দর থেকে যখন ফরাসি রাজকীয় নৌবাহিনীর জাহাজ ‘ইতোয়াল’ ছেড়ে যায়, তখন ফিলিবার্ত কমারসন ছিলেন বয়সে তরুণ। সে বয়সেই তিনি ছিলেন চিকিৎসক এবং ফরাসি রাজার পরিচিত উদ্ভিদবিদ। সেই সূত্রে অভিজাত মহলে বিশেষ নামডাক ছিল ফিলিবার্ত কমারসনের। সে জন্য তিনি খুব সহজে ফরাসি রাজকীয় জাহাজে জায়গা পেয়েছিলেন।

কে এই জঁ বারে?

জঁ বারের ছোটবেলা সম্পর্কে ইতিহাসবিদেরা তেমন কিছু জানেন না। যতটুকু জানেন তা হলো, তাঁর পিতা ছিলেন একজন গরিব বর্গাচাষি। লেখাপড়া কিছুই জানতেন না। জঁ বারে যে স্কুলে গেছেন, সে কথা কোথাও উল্লেখ নেই। তবে তিনি যে স্বাক্ষর করতে পারতেন, অনেক নথিতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

তরুণ বয়সে মা-বাবাকে হারিয়ে জীবিকার প্রশ্নে জঁ বারের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, এমন সময় ফিলিবার্তের বাড়িতে তাঁর কাজ জুটে যায়।

তাঁদের দুজনার যখন প্রথম দেখা হয়, তখন জঁ বারের বয়স ২২ আর ফিলিবার্তের ৩৫। ৪ বছরের বেশি সময় ধরে অসুস্থ এবং সদ্য বিপত্নীক ফিলিবার্তের গৃহপরিচারিকা এই জঁ বারে। ঘরের সব রকমের কাজের সঙ্গে ফিলিবার্তের সেবা করা ছাড়াও তাঁর উদ্ভিদ নমুনা সংগ্রহ, সংরক্ষণ, শনাক্তকরণসহ নানা কাজে নিষ্ঠার সঙ্গে সহযোগিতা করতেন তিনি।

ফিলিবার্তের বাড়িতে কাজের সময় জঁ বারে নিজের চেষ্টায় এবং ফিলিবার্তের আন্তরিক সহযোগিতায় ও উৎসাহে নিজেকে সমৃদ্ধ করেন। তা ছাড়া ফিলিবার্তের বাড়িতে সে সময় প্যারিসের অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তির আসা-যাওয়া ছিল। অনেক কাছে থেকে তাঁদের দেখার সুযোগ হয়েছিল তাঁর। উদ্ভিদের প্রতি একান্ত ভালোবাসা এবং জ্ঞানপিপাসু ছিলেন বলেই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াও নিজেকে একজন উদ্ভিবিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন তিনি।

প্রণয়

ফিলিবার্তের সঙ্গে জঁ বারের সম্পর্ক মনিব-ভৃত্য থেকে প্রেমিক-প্রেমিকায় উন্নীত হয়। ফলে জঁ বারে ১৭৬৪ সালের ডিসেম্বরে এক পুত্রসন্তানের কুমারী মা হন। তৎকালীন সময়ে ফরাসি সমাজ এখনকার মতো উদার ছিল না। মনিব-ভৃত্য মেলামেশা এবং বিয়ের মন্ত্র না পড়েই সন্তান ধারণ ছিল অনেকটাই অলিখিত আইনে নিষিদ্ধ, বিশেষ করে ফিলিবার্তের মতো যাঁরা নিজেদেরকে খানদান বলে দাবি করতেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এমনটাই হতো। তাই অহেতুক লোকনিন্দা এড়াবার জন্য এই সন্তানের পিতার পরিচয় ঊহ্য রাখা হয়। কয়েক মাস পর শিশুসন্তানটির মৃত্যু হয়।

প্রণয়ীকে যে মনে মনে নিজের কাছে রাখতে চাইতেন ফিলিবার্ত, জঁ বারে সে কথা জানতেন। তিনিও চাইতেন ফিলিবার্তের সঙ্গে থাকতে। তাই জাহাজের পুরুষ নাবিকদের দৃষ্টি এড়াতে এবং এই দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নিতে জঁ বারেকে পুরুষ নাবিকের ছদ্মবেশ ধারণ করতে হয়েছিল। সে কারণেই তিনি পুরুষ পরিচয়ে প্রকৃতিবিদের সহকারী এবং খানসামা হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।

জাহাজের জীবন

জাহাজে নারী পরিচয় গোপন রাখতে গিয়ে কল্পনাতীত কষ্ট মেনে নিতে হয়েছিল জঁ বারেকে। প্রতিটি মুহূর্ত সতর্ক থাকতে হতো। তিনি প্রকৃতিবিদ ফিলিবার্ত কমারসনের সহকারী হিসেবে তাঁর সঙ্গে থাকতেন। আর ফিলিবার্ত আলাদা স্নানাগার, টয়লেটসহ জাহাজের কাপ্তানের প্রশস্ত কেবিনটি পেয়েছিলেন বলে গোপনীয়তা বজায় রাখতে জঁ বারের খানিকটা সুবিধা হয়েছিল।

পুরুষ ছদ্মবেশের জন্য জাহাজের পুরুষ নাবিকদের সঙ্গে কখনো কখনো পাল্লা দিয়ে কাজ করতে হতো জঁ বারেকে। তার পরও তাঁর শরীরের অনুচ্চ গড়ন, স্ফীত বক্ষ, শ্মশ্রু-গোঁফমুক্ত কমনীয় অবয়ব, গলার স্বর, খানিকটা ভারী নিতম্ব সাধারণ নাবিকদের মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছিল। তা ছাড়া কেউ তাঁকে কখনোই নগ্ন দেখেনি। এসব নিয়ে সাধারণ নাবিকেরা কানাঘুষা করলেও জাহাজের অফিসাররা তা পাত্তা দিতেন না।

তবে ফিলিবার্তের সঙ্গে জাহাজের চিকিৎসকের সম্পর্ক ভালো ছিল না বলে চিকিৎসকটি তাঁর রোজনামচায় জঁ বারেকে নারী হিসেবে উল্লেখ করে অনেক কথা বাড়িয়ে লিখে থাকতে পারেন বলে অনেকে মনে করেন। তবে এ কথা ঠিক যে, পায়ের ব্যথায় অনেকটাই কাতর ফিলিবার্তের সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করা ছাড়াও ফিলিবার্তের সুবিশাল কর্মযজ্ঞের জঁ বারের অংশগ্রহণ ছিল অতুলনীয়।

তাঁদের জাহাজ যখন বিশাল আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে তাঁদের প্রথম গন্তব্যস্থল উরুগুয়ের রাজধানী শহর মন্টিভিডিওতে পৌঁছায়, তখন এই দুজন রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে উঁচু-নিচু দুর্গম বনে-জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন লতা-গুল্ম সংগ্রহ করতে প্রচণ্ড পরিশ্রম করেন। এরপরের গন্তব্যস্থল ছিল ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো। এই অঞ্চলে জাঁ বারে একটি চমৎকার নতুন প্রজাতির উজ্জ্বল গোলাপি এবং বেগুনি ফুল মেশানো উদ্ভিদের সন্ধান পান। জাহাজের এডমিরালের সম্মানার্থে এই উদ্ভিদের নামকরণ করা হয়েছিল Bougainvillea brasiliensis।

বোগেনভেলিয়া। ছবি: লেখক।

এভাবে একের পর এক বন্দরে নেমে নিকটবর্তী অঞ্চল চষে বেড়াচ্ছিলেন জঁ বারে। কারণ পায়ের ব্যথা এবং সমুদ্রপীড়ায় ফিলিবার্ত বেশির ভাগ সময় শয্যাশায়ী থাকতেন। তাই ভ্রমণকালে জঁ বারে নিজের উদ্যোগেই উদ্ভিদ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যান। তিনি সর্বমোট পাঁচ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের নমুনা সংগ্রহ করেন। এই বিপুল পরিমাণ উদ্ভিদ প্রজাতি সংগ্রহ শুধু জঁ বারের জন্যই সম্ভব হয়েছে।

নারী পরিচয় ফাঁস

১৭৬৮ সালের এপ্রিল মাসে তাঁদের জাহাজ তাহিতি পৌঁছালে বিপত্তি ঘটে। বুঁদোজ এবং ইতোয়াল এই দুটি জাহাজই এখানে নোঙর করেছে। বন্দরে ফরাসি নাবিকেরা যত্রতত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেনাকাটা করছেন, পানাহারেও ব্যস্ত কেউ কেউ। ফিলিবার্ত এবং জঁ বারে তাহিতির মাটিতে পা ফেলামাত্রই উন্মত্ত একদল স্থানীয় লোকজন জঁ বারেকে ঘিরে ফেলে। তারা সবাই সমস্বরে ‘নারী, নারী’ বলে চিৎকার করে তাঁকে আক্রমণ করে বসে এবং তাঁকে উলঙ্গ করার চেষ্টা করে।

এ ঘটনায় জঁ বারে ভয়ে ফরাসি ভাষায় আর্তচিৎকার করে উঠলে এক অদ্ভুত পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। বন্দরে উপস্থিত নাবিক খালাসিরা নারী কণ্ঠের চিৎকারে শুনে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। দ্রুত ঘোর কেটে যেতেই স্থানীয় লোকজনের হাত থেকে জঁ বারেকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় অভিযাত্রীদের মধ্যে বেশ চাঞ্চল্য দেখা দেয়। প্রায় ১৪ মাস, দিনের পর দিন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে পরিচয় লুকিয়ে রাখতে সক্ষম হলেও তাহিতির অধিবাসীরা তাঁকে দেখেই চিনতে পেরেছিল।

পরিচয় প্রকাশ পেলে জঁ বারেকে আর জাহাজে রাখা সম্ভব হচ্ছিল না। জাহাজে বহুবার তিনি যৌন হয়রানির, ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। জঁ বারের পক্ষে এমন নির্যাতন সহ্য করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। তাই জঁ বারে মরিশাস দ্বীপে নেমে যেতে চাইলে ফিলিবার্ত কমারসন তাঁর সঙ্গে মরিশাসে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এডমিরাল লুই আঁতোয়ান দ্য বুগেনভিল তাতে বাধা দেননি। তিনি জানতেন, জঁ বারেসহ ফ্রান্সে ফিরে গেলে রাজার আদেশের বরখেলাপ হবে। ভাগ্যক্রমে মরিশাসের গভর্নর পিয়ার পইভো ছিলেন নিজে একজন উদ্ভিদবিদ এবং ফিলিবার্তের পুরোনো বন্ধু। সেই সুবাদে গভর্নরের আতিথ্যে নিজ বাসভূম থেকে বহু যোজন দূরের এই দ্বীপে আশ্রয় হয় দুই প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের।

পেনসিল স্কেচ। তাহিতিতে আক্রমণের শিকার জঁ বারে। ছবি: মার্ক বুর্ন।মরিশাসে থাকাকালীন তাঁরা চুপচাপ বসে থাকেননি। এ সময় আশপাশের দ্বীপগুলোতেও খুঁজে ফিরেছেন লতা-পাতা, ফুল-ফল। সখ্য গড়েছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে। প্রচণ্ড পরিশ্রমে আগে থেকেই অসুস্থ ফিলিবার্ত কমারসনের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ছিল। ১৩ মার্চ ১৭৭৩ তারিখে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন ফিলিবার্ত কমারসন। এ মৃত্যুতে ইতি হলো ফিলিবার্ত এবং জঁ বারের ১১ বছরের অসম্ভব সুন্দর এক প্রণয়কাহিনি।

বিয়ে এবং ফ্রান্সে ফেরা

ফিলিবার্ত কমারসন এর মৃত্যুতে জাঁ বারে একা হয়ে পড়েন। এরপর একদিন তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় ফরাসি নৌবাহিনীর একজন অফিসারের, নাম জঁ দুবারনা। নিঃসঙ্গ জীবনে নতুন সঙ্গীর প্রেমে পড়েন জঁ বারে এবং ১৭৭৪ সালের ১৭ মে তারিখে বিয়ে হয় তাঁদের। বিয়ের পর তাঁরা ফিরে আসেন ফ্রান্সে। ১৭৭৫ সালে জাহাজ যখন ফ্রান্সের বন্দরে এসে পৌঁছে, পৃথিবীর প্রথম নারী হিসেবে পুরো পৃথিবী একবার ঘুরে এসে জঁ বারে ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

তিনি ৩৪টি বিশাল বক্সে করে ফ্রান্সে পাঠিয়ে দেন ৫,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ নমুনা। এর মধ্যে ৩,০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ ছিল তখন পর্যন্ত উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের অজানা। সমগ্র ইউরোপের উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের জন্য যা ছিল এক অমূল্য জ্ঞানভান্ডার। বছরের পর বছর অপরিসীম পরিশ্রম, মেধা, ধৈর্য, নিষ্ঠা, ত্যাগের ফলেই এমন বিশাল কর্মযজ্ঞ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করতে পেরেছিলেন জঁ বারে। মানবসভ্যতাকে এক ধাপ এগিয়ে দিতে তিনি নিজের জীবন এবং সম্ভ্রম বাজি রেখেছিলেন।

অথচ দুঃখের বিষয় যে, এই প্রচণ্ড মেধাবী, পরিশ্রমী, উদ্যমী এমন প্রজ্ঞাবান মানুষ, শুধু নারী হয়ে জন্ম নেওয়ার জন্য জীবিত অবস্থায়, এমনকি মৃত্যুর পরও তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু পাননি।

স্বীকৃতি হিসেবে ছিল ১৭৮৫ থেকে তৎকালীন ফরাসি রাজা ষোড়শ লুইয়ের দেওয়া রাজকীয় ভাতা। আর রাজা তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘একজন অসাধারণ মহিলা’। তাঁর সম্মানে ২০১২ সালে একটি উদ্ভিদের নামকরণ করা হয় Solanum baretiae। আর ২৬ এপ্রিল ২০১৮ বামন গ্রহ প্লুটোর একটি পর্বতমালার নামকরণ করা হয় ‘বারে পর্বতমালা’।

Solanum baretiae -এর ফুল। ছবি: সংগৃহীত।
জঁ বারে যে জাহাজে করে বিশ্বভ্রমণ শুরু করেছিলেন সে জাহাজের নাম ছিল ‘ইতোয়াল’, অর্থ হচ্ছে নক্ষত্র। কাকতালীয় হলেও সত্য, নিজের জীবন এবং সম্ভ্রম বাজি রেখে মানবসভ্যতা একধাপ এগিয়ে দিয়ে ইতিহাসের পাতায় তিনি নিজেও পরিণত হয়েছেন একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রে। ৬৭ বছর বয়সে ৫ আগস্ট ১৮০৭ সালে এই নক্ষত্রের পতন হলেও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া দ্যুতি আজও প্রকৃতিবিদদের পথ দেখায়।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews