টেমস নদীর তীরে হাত ধরাধরি করে হাঁটছে কপোত-কপোতী। তাদের দেখে এক বৃদ্ধার সকৌতুক প্রশ্ন, ‘হাজব্যান্ড অ্যান্ড ওয়াইফ?’ সুদেহী সুপুরুষের ত্বরিত উত্তর, ‘নো, ম্যান অ্যান্ড উওমেন।’ সেই সুদর্শন সুপুরুষ একমেবাদ্বিতীয়ম ইমরান খান। আর লাস্যময়ী ললনা সেসময়কার বলিউড অভিনেত্রী জিনাত আমান। আশির দশকের শুরুর দিকের ঘটনা এটি। ফ্ল্যাশব্যাক থেকে ফিরে আসুন নিঠুর বর্তমানে। রাওয়ালপিন্ডির কুখ্যাত আদিয়ালা জেলের ছয় ফুট বাই আট ফুটের কক্ষে ৪৬ বছর আগের সেই রমণীমোহন ক্যাসানোভা বন্দি। ১৪ ও ১৭ বছরের জন্য দুর্নীতির দুটি মামলায় দণ্ডিত ইমরান আটটি কারাকক্ষের একটি সেলে নির্জনতার সঙ্গে দিনাতিপাত করছেন। পরিপার্শ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। বাকি সাতটি কক্ষ জনমানবশূন্য। এর মধ্যে একটি খান সাহেবের হেঁশেল। সেখানে তার জন্য রান্নাবান্না করেন আরেক কয়েদি।
নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস! যার হাত ধরে পাকিস্তান প্রথম ও একমাত্র বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে ১৯৯২তে, ক্রিকেট-উইকেটের অলিগলি পেরিয়ে রাজনীতির জীর্ণশীর্ণ পাঠশালায় ভর্তি হয়ে ২৫ কোটি মানুষের দেশের ‘ওয়াজিরে আজম’ (প্রধানমন্ত্রী) পর্যন্ত হন এলো কেশের অক্সফোর্ড পড়ুয়া। কিন্তু ‘তখত’ (ক্ষমতা) ও ‘তাজ’ (মুকুট) শ্রাবণের রোদ। এই আছে এই নেই। ২০২৩ সালের ৯ মে, ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার এক বছর পর দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার হন ইমরান। দিনকয়েক পর জামিনে ছাড়া পেলেও ওই বছর আগস্টে আবারও জেলযাত্রা। সেই থেকে ৯০০ দিনেরও বেশি হলো, এই সাবেক প্লেবয় ক্রিকেটার জেলবাসী। আদিয়ালা জেলে কয়েদি নম্বর ৮০৪ নিঃসীম একাকিত্বে সমর্পিত।
একবার রটেছিল ইমরান নেই। পরে জানা যায়, তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি ৮৫ শতাংশ ক্ষয়ে গেছে। আদিয়ালা জেলের ‘ডেথ সেলে’ নেলসন ম্যান্ডেলার ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম’, বিখ্যাত ব্যক্তিদের নেওয়া ওরিয়ানা ফ্যালাচির সাক্ষাৎকার, রুমি, ওটোমান সাম্রাজ্য ও হেনরি কিসিঞ্জার পড়ছেন খান সাহেব। পাকিস্তানের বর্তমান ক্ষমতাসীনরা তাকে কারারুদ্ধ করে হয়তো ভেবেছে-‘আঁখ ওঝাল, পাহাড় ওঝাল’। মানে, চোখের আড়াল হলে পাহাড়ও অদৃশ্য হয়ে যায়। ভুল ভেবেছে তারা।
সারা বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সমাদৃত একমাত্র পাকিস্তানি ইমরান খান। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন আফগানিস্তান আক্রমণ করে, ইমরান তখন তার দেশের সবচেয়ে বড় ক্রিকেট তারকা, বার্লিন প্রাচীর যখন ভেঙে ফেলা হয়, ইমরান তখন নৈশ পার্টিতে সুন্দরী পরিবেষ্টিত-যেন তিনি পাকিস্তানি জেমস বন্ড। ৯/১১-র সময় এই সাবেক তারকা অলরাউন্ডার রীতিমতো দুঁদে রাজনীতিবিদ এবং যখন কোভিড মহামারি বিশ্ব গ্রাস করে, খান সাহেব তখন প্রধানমন্ত্রী (২০১৮)।
তাকে কারারুদ্ধ করে রাখা যাবে। ক্রোধের কুয়াশায় ঢেকে ফেলা যাবে না। দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে