ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে চার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ (এস কে সিনহা) ১১ জনের বিরুদ্ধ মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংস্থার পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে গতকাল বুধবার কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন।

মামলায় ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম শামীমসহ ব্যাংকটির ছয় কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। আসামি করা হয়েছে এস কে সিনহার কথিত একান্ত সচিব (পিএস) টাঙ্গাইলের রনজিৎ চন্দ্র সাহা ও তাঁর স্ত্রী সান্ত্রী রায় সিমিকে।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জানুয়ারি মাসে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনার অনুসন্ধান শুরু হয়। ফারমার্স ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টি দুদকের নজরে আসে। এরপর সংস্থার পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন ও সহকারী  পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। অনুসন্ধান শেষে তারা কমিশনে প্রতিবেদন দেয়। গতকাল কমিশন মামলার অনুমোদন দিলে সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলার বাকি আসামিরা হলেন—ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুত্ফুল হক, টাঙ্গাইলের বাসিন্দা মো. শাহজাহান ও একই এলাকার নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা।

মামলার এজাহারে ঘটনার সময় দেখানো হয়েছে ২০১৬ সালের নভেম্বর থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর। মামলাটি দায়ের করা হয়েছে দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২), (৩) ধারায়।

এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চার কোটি টাকা ভুয়া ঋণ সৃষ্টি করে ওই টাকা একই দিনে পে-অর্ডারের মাধ্যমে এস কে সিনহার ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করেন। পরে তিনি ওই টাকা ব্যক্তিগত হিসাব থেকে নগদে এবং চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে অন্য হিসাবে হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেন। পাশাপাশি ওই টাকার উৎস ও অবস্থান গোপনের মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে পাচার বা পাচারের চেষ্টায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

এজাহারে আরো বলা হয়, আসামি মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি চলতি হিসাব খোলেন। এর পরদিনই তাঁরা দুই কোটি করে চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং ঋণ আবেদনপত্রে দুজনই তাঁদের ঠিকানা বাড়ি নম্বর-৫১, সড়ক নম্বর-১২, সেক্টর-১০, উত্তরা আবাসিক এলাকা উল্লেখ করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই বাড়িটি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ব্যক্তিগত বাড়ি। ঋণ আবেদনে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসেবে রনজিৎ চন্দ্র সাহার স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের সাভারে অবস্থিত ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করেন। তাঁরা দুজনও সাবেক প্রধান বিচারপতির পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন।

এজাহারে বলা হয়েছে, ঋণসংক্রান্ত আবেদন দুটি কোনো রকম যাচাই-বাছাই, রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ এবং ব্যাংকের কোনো নিয়ম-নীতি না মেনেই শুধু গ্রাহকের আবেদনের ওপর ব্যাংকের শাখা তত্কালীন ব্যবস্থাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঋণ প্রস্তাব তৈরি করে হাতে হাতে সেটা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যান। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অফিস নোট তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর দিয়ে তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমের কাছে নিয়ে যান। ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ নীতি অনুযায়ী ঋণ দুটির প্রস্তাব অনুমোদন করার ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের না থাকা সত্ত্বেও তিনি এ-সংক্রান্ত কোনো যাচাই-বাছাই বা নির্দেশনা না দিয়ে ওই ঋণ প্রস্তাব দুটির অনুমোদন দিয়ে দেন। ঋণ অনুমোদন হওয়ার পরের দিনই আবেদনকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে ঋণ হিসেবে অনুমোদিত চার কোটি টাকার আলাদা দুটি পে-অর্ডার সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নামে ইস্যু করা হয়। পরে ওই পে-অর্ডার সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার হিসাবে জমা হয়। তিনি বিভিন্ন সময় ক্যাশ ও চেক/পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে ওই হিসাব থেকে টাকা তোলেন। পরে আরেকটি ব্যাংকে তাঁর ভাইয়ের হিসাবে দুই কোটি টাকার বেশি স্থানান্তর করেন এবং পরে ওই হিসাব থেকে বিভিন্ন সময় নগদ ও চেকের মাধ্যমে টাকা তোলেন। রনজিৎ সাহা ব্যাংকে উপস্থিত থেকে ঋণ আবেদন দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির (এস কে সিনহা) নাম করে প্রভাব বিস্তার করেন। ঋণ আবেদনকারী নিরঞ্জন রনজিতের ভাতিজা এবং শাহজাহান ছোটকালের বন্ধু। তাঁরা দুজনই অত্যন্ত গরিব এবং কখনো ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি বা তাঁদের কোনো ব্যবসা নেই—প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান হয়েছে।

এর আগে গত বছর জিজ্ঞাসাবাদের পর নিরঞ্জন ও শাহজাহানের আইনজীবীরা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি সিনহাকে চার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে তাঁর বাড়ির দাম। ফারমার্স ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে সিনহার ব্যাংক হিসাবে ওই টাকা দেওয়া হয়।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরে ছুটি নিয়ে বিদেশে যান তখনকার প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা। পরে বিদেশে থেকেই তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

মামলার বিষয়ে সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন সংস্থাটির সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত। সিনহাকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশের আইনে সব ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদের ক্ষেত্রে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাঁর ক্ষেত্রেও সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews