বৈরী আবহাওয়ায় হাওরপাড়ের বাসিন্দাদের পক্ষকাল ধরেই অস্বস্তিতে সময় কাটছে। লাখ লাখ কৃষক মুখিয়ে আছেন বোরো ধান ঘরে তুলতে। কিন্তু শুক্রবার আবারও পাহাড়ি নদী যাদুকাটা, বৌলাই পাঠলাই ও সুরমা বেসিনে পানি বাড়তে শুরু করেছে। এদিকে ‘সোনার ফসল’ আর ‘হাওর রক্ষা’ বাঁধ নিয়ে গভীর সংকটে আছেন সরকারের উচ্চ মহলের কর্মকর্তারা, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন। তবে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাঁধ রক্ষার কাজ চলছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার ঘোষ গতকাল সন্ধ্যায় গুরমার হাওর থেকে ইত্তেফাককে বলেন, ‘পানি বাড়ায় আমরা চিন্তিত। অবশ্য বাঁধ রক্ষায় লোকজন প্রস্তুত রয়েছেন।’ ভারতের বরাক ও লোভা নদীর পানি বেড়ে সুরমায় ৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল শুক্রবার বিকাল ৫টায়। যাদুকাটা ও পাটনই নদীর পানিও বাড়ছে।

সিলেট কৃষি বিভাগ জানায়, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সিলেটের চার জেলায় মোট ৪১ হাজার ৬২৭ হেক্টর জমির বোরো ধান কাটা হয়। এর মধ্যে সুনামগঞ্জে ২২ হাজার ৩৮৮ হেক্টর কাটা হয়েছে। এবার সিলেটে ৪ লাখ ৮৭ হাজার ২০৫ হেক্টরে বোরো আবাদ হয়েছে।

এদিকে অনেক মাঠের ধান পুরোপুরি পাকেনি। তারপরও যেখানেই ধান পাকছে, সেখানেই কাটা হচ্ছে, ৮০ ভাগ ধান পাকলেই তা কেটে ঘরে তোলার নির্দেশনা রয়েছে—এমন মন্তব্য করে সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, ‘কৃষকদের ধন্যবাদ দিতে হয়, সময় নষ্ট না করে তারা দ্রুত ধান কেটে নিচ্ছেন।’ সুনামগঞ্জে ৫০০ ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন্ড হরভেস্টার মেশিন প্রস্তুত রয়েছে। তাহিরপুরসহ বিভিন্ন স্থানে যন্ত্রের সাহায্যে ধান কাটছেন কৃষকেরা। এখন প্রতিদিন ধান কাটার পরিমাণ বাড়বে। গত ২ এপ্রিল থেকে পর পর কয়েক দিন পাহাড়ি  ঢলে সুনামঞ্জের বিভিন্ন স্থানে হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। এদিকে ফস-লহারা কৃষক ও ভাঙ্গা বাঁধ দেখতে কৃষি মন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক আজ দিরাই আসছেন। পরে তার সুনামগঞ্জ সদরের বাহাদুরপুরে ধান কাটা উৎসবে যোগ দেওয়ার কথা।

বাঁধ মেরামতে ব্যাস্ত কৃষকরা।

‘একটির কাজ শেষ হতে না হতেই আরেকটিতে ধস’:

সুনামগঞ্জে একটি হাওর রক্ষা বাঁধের মেরামত কাজ শেষ হতে না হতেই আরেকটি বাঁধ ধসে পড়ার খবর আসছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে টাঙ্গুয়ার হাওরের ওয়াচ টাওয়ারের কাছে ২৩ নম্বর পিআইসিতে ভাঙন শুরু হলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে দ্রুত বাঁশ পাইলিং করে মাঠির বস্তা ফেলে মেরামত শুরু হয়। গত ২ এপ্রিল ঢল নামলে ১৬৮টি পিআইসিতে ২৩৬টি স্থানের ভাঙনের মধ্যে ১৭৩টি বন্ধ করা হয়। আরো ৬৩টির ভাঙন বন্ধ করার কাজ চলছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব কবীর বিন আনোয়ার বুধবার সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকা পরিদর্শন করেন। এর আগে পরিকল্পনা মন্ত্রী এম এ মান্নান, পানি সম্পদ উপমন্ত্রী কে এম শামীম এলাকা পরিদর্শন করেন। অন্যদিকে হাওর রক্ষা বাঁধ নিয়ে নানা অনিয়মের অভিযোগে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা সালমা জাফরিনের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের টিম বিভিন্ন বাঁধ এলাকা পরিদর্শন করেন। তারা কৃষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলেছেন। তারা কাজের গুণমানসহ অন্য বিষয় তদন্ত করবেন। এ টিমের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রবীর কুমার ঘোস্বামী, জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গির হোসেন রয়েছেন। সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসকও পাঁচ সদস্যের আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন।

সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক মো.মোশারফ হোসেন বলেন, ঢলে সিলেট ও সুনামগঞ্জে কৃষির ক্ষতির হিসাব নিরূপণ চলছে। এ পর্যন্ত ফসলের ১০০ কোটি টাকার ক্ষতি পারে। স্থানীয় সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জে বাঁধ ভেঙে ২৫ হাজার কৃষকের ক্ষতি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দিশাহারা কৃষক। জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গির হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

হাওরে বেড়েছে পানি।

বাঁধ ভেঙে ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ায় পিআইসির (প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটি) অবহেলা ও অনিয়মকে দায়ী করছেন এলাকাবাসী। তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল, হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, বাঁধের কাজ অনেক দেরিতে শুরু হয়। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন ও বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম হয়েছে। পিআইসির দুর্বল ফসল রক্ষা বাঁধের কারণে কৃষকদের ফসল আজ হুমকির মুখে। সুনামগঞ্জে এবার ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর বোরো জমি চাষের আওতায় আসে। জেলার ৩৭টি হাওরের জন্য ১২২ কোটি টাকা বরাদ্দে ৫২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ-পুনর্নির্মাণ ও ১৩০টি ক্লোজার বন্ধকরণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকৃতি সহায় থাকলে আশা করা হচ্ছে, ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকার ধান কৃষকের গোলায় উঠবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews