ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে রাজশাহীতে অসহায়, হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া বিশেষ ভিজিএফ কার্ড নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি চলছে। জেলার ৭২টি ইউনিয়ন, ১৪টি পৌরসভা ও একটি সিটি করপোরেশন এলাকায় এবারের ঈদ উপলক্ষ্যে ৭০ হাজার বিশেষ ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটি থেকে বরাদ্দ হওয়া এসব কার্ডের তালিকা উপজেলা ত্রাণ কমিটির তত্ত্বাবধায়নে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বিতরণ করার কথা। কিন্তু রাজশাহী সিটি করপোরেশনে নেই মেয়র। সিটির ৩০টি ওয়ার্ডে নেই কাউন্সিলর। ৭২টি ইউনিয়ন পরিষদের অধিকাংশতেই নেই চেয়ারম্যান। ১৪টি পৌরসভাতেও মেয়র-কাউন্সিলরা নেই। ফলে বিশেষ ভিজিএফের এসব কার্ড ভাগাভাগির দায়িত্ব গেছে দলীয় লোকদের হাতে। তারা নিজেরা ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন অসহায়দের জন্য আসা এসব বরাদ্দ-এমন অভিযোগ উঠেছে। কার্ডের তালিকা নিয়ে কোথাও কোথাও বিশৃঙ্খলাও হচ্ছে।

গোদাগাড়ী : জানা গেছে, রাজশাহীর গোদাগাড়ী পৌরসভা এলাকায় ৪ হাজার ৬০০টি বিশেষ ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ এসেছে। গত ৪ মার্চ এসব কার্ডের মধ্যে থেকে এক হাজার ৩০০টি জামায়াতকে এবং আরও এক হাজার ৩০০টি বিএনপি নেতাদের দেওয়া হয়েছে বণ্টন করার জন্য। বাকি দুই হাজার কার্ড পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিজের কাছে রেখেছেন। এ নিয়ে গোদাগাড়ীর অসহায় গরিবদের মাঝে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত নির্বাচনে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক মজিবুর রহমান সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকেই জামায়াতের নেতাকর্মীরা স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন কাজে প্রভাব খাটাচ্ছেন। সরকারে বিএনপি থাকায় বিএনপির নেতাকর্মীরাও প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরি করছেন বিভিন্ন বরাদ্দের নিয়ন্ত্রণ নিতে। এই সুযোগে স্থানীয় প্রশাসন কিছু কার্ড রেখে দিয়ে পৃথক ব্যবস্থাপনায় তালিকা তৈরির কাজ করছে। আরও জানা গেছে, এই কার্ড বিতরণে মাথা ঢুকিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মী ও জুলাই যোদ্ধারাও। ফলে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরিতে একটা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। গোদাগাড়ীর ৯টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা এলাকাতে বিশেষ ভিজিএফ নিয়ে চলছে টানাটানি। গোদাগাড়ী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. নওশাদ আলী অভিযোগে বলেন, অসহায় গরিব মানুষদের জন্য আসা এসব সাহায্যের তালিকা তৈরি হবে নিরপেক্ষভাবে। কিন্তু কার্ড ভাগাভাগি হচ্ছে। ভাগাভাগির পর দুই হাজার কার্ড ইউএনও নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ইউএনও কীভাবে নিজে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরি করবেন। দুই হাজার কার্ড কাদেরকে দেওয়া হবে-এটাই বড় প্রশ্ন। জানতে চাইলে গোদাগাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুস সাদাত বলেন, মোট দুই হাজার ৬০০ কার্ড দিয়েছি জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের। বাকি দুই হাজার কার্ডের তালিকা আমরা করছি বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে। আগামী ১২ মার্চের মধ্যে তালিকা তৈরি ও চাল বিতরণ সম্পন্ন করতে হবে। তিনি বলেন, গোদাগাড়ীর অধিকাংশ ইউনিয়ন ও পৌরসভায় চেয়ারম্যান-মেয়র ও কাউন্সিলর নেই। এ কারণে বিকল্প উপায়ে এসব কাজ করা হচ্ছে।

দুর্গাপুরে কার্ড চাইতে গিয়ে মারধরে আহত ২ : জেলার দুর্গাপুরের জয়নগর ইউনিয়নের বহ্মপুর গ্রামে ভিজিএফের কার্ড চাইতে গিয়ে গত ৩ মার্চ স্থানীয় বিএনপি নেতা সুলতান আলীর মারধরে আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন আলিমন বিবি (৬৫) ও তার পুত্রবধূ রেশমা বিবি (৩৬)। রেশমা বিবি বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটে। ১০ কেজি চালের একটা কার্ডের জন্য গেলে বিএনপি নেতারা বেধড়ক পেটায়। যারা দল করে তাদেরকে কার্ড দেওয়া হচ্ছে। যারা কার্ডের তালিকা করছে তারা নিজেদের আত্মীয়স্বজনের নামে দিচ্ছে। আমরা বলতে গেলেই গায়ে হাত দিয়েছে।’

জানা গেছে, দুর্গাপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট চার হাজার ৮১৩টি বিশেষ ভিজিএফ কার্ড বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে দুর্গাপুর পৌরসভায় তিন হাজার ৮৫টি কার্ড পেয়েছে। বাকি এক হাজার ৭২৮টি বরাদ্দ হয়েছে সাতটি ইউনিয়নের জন্য। দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সভাপতি মাশতুরা আমিনা জানান, উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও সদস্যরা নেই। আগে হতদরিদ্রদের তালিকা তৈরির দায়িত্ব পালন করতেন তারাই। এখন দলীয় লোক ছাড়াও সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষদের দিয়ে তালিকা করা হচ্ছে। তালিকায় যেন প্রকৃত হতদরিদ্ররা স্থান পায় সে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ ভিজিএফ কার্ড তৈরিতে কোনো দলীয়করণ অথবা বৈষম্য হচ্ছে কিনা-জানতে চাইলে উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব অধ্যাপক জুবায়েদ হোসেন বলেন, অসহায় দরিদ্রদের তালিকা তৈরিতে কোনো বৈষম্য করা হচ্ছে না। যারা প্রকৃত গরিব মানুষ তাদের নাম তালিকায় দেওয়া হচ্ছে।

বাঘা : সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাঘা উপজেলায় ১৩ হাজার ৯৭৫টি কার্ড বরাদ্দ হয়েছে। এর মধ্যে বাঘা পৌরসভায় চার হাজার ৬৮০টি ও আড়ানী পৌরসভায় তিন হাজার ১৮০টি। বাকি সাতটি ইউনিয়নে ছয় হাজার ১১৫টি কার্ড বরাদ্দ হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দুই পৌরসভাকে বেশি কার্ড দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বিএনপি নেতারা প্রভাব খাটিয়ে বেশি বরাদ্দ নিয়েছেন। জানা গেছে, অন্যান্য স্থানের মতো বাঘার অধিকাংশ পৌরসভা ও ইউনিয়নে মেয়র ও চেয়ারম্যানরা পদে নেই। গত ১৮ মাস ধরে স্থানীয় সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। জানা গেছে, ঈদ উপলক্ষ্যে বিশেষ ভিজিএফ বিতরণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের। তারা তালিকা তৈরি করে উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির কাছে দিয়েছেন। আগামী ১২ মার্চ থেকে চাল বিতরণ হবে। জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিটির সভাপতি শাম্মী আকতার বলেন, দুই পৌরসভায় মেয়র ও অনেক ইউনিয়নে চেয়ারম্যান নেই। ফলে দলীয় লোক ও বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দরিদ্রদের কার্ডের তালিকা হয়েছে। উপজেলা ত্রাণ কমিটির সদস্যরা তৈরি তালিকা যাচাই বাছাই করছেন। অনিয়ম হলে সেটা বাদ দেওয়া হবে।

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে জেলায় বরাদ্দ হওয়া ৭০ হাজার বিশেষ ভিজিএফ বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে রাজশাহী জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার বলেন, এসব খাদ্যসহায়তা বিতরণ এতদিন উপজেলা ও ইউনিয়ন ত্রাণ কমিটির মাধ্যমে হয়েছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনেক ইউনিয়ন ও পৌরসভায় চেয়ারম্যান-মেয়ররা নেই। এখন উপজেলা ত্রাণ কমিটিকে সঠিকভাবে তালিকা করে এসব সহায়তা বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও অনিয়মের অভিযোগ হলে তা খতিয়ে দেখা হবে।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews