বছরের পর বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে আঞ্চলিক আধিপত্যের খোঁজে প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে সৌদি আরব ও ইরান। দুই পক্ষের মধ্যে এই শত্রুতা দিন দিন বেড়েছে। ২০১৫ সালে ছয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বশক্তির সঙ্গে পরমাণু সমঝোতায় পৌঁছায় তেহরান। কিন্তু শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে ইরানের এ সংক্রান্ত চুক্তির বিরোধীতা করে আসছে সৌদি আরব। এ নিয়ে দুই দেশের বাকযুদ্ধ তখন ব্যাপক আকার ধারণ করে। তবে নিজ ভূখণ্ড ছাড়িয়ে দুই দেশই প্রক্সি যুদ্ধে মেতেছে সিরিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননে। যার শিকার হয়েছেন লাখ লাখ সাধারণ মানুষ।

ইরানের পারমাণবিক চুক্তি অনুযায়ী দেশটি কোনও পারমাণবিক বোমা তৈরি করবে না। পরবর্তী ১০ বছরের জন্য তারা বোমা তৈরির জন্য যথেষ্ট উপাদান মজুত করতে পারবে না। এর বিনিময়ে আন্তর্জাতিক অবরোধ প্রত্যাহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল বিক্রিসহ নানা আর্থিক সুবিধা পায় ইরান। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের এমন সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেন সৌদি আরব। ফলে প্রকাশ্যেই তারা এ চুক্তির সমালোচনা করতে থাকে।

সৌদি সফরে এসে ৪ নভেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট বলছে, ৩ নভেম্বর ২০১৭ শুক্রবার সন্ধ্যায় লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একটি বিমান রিয়াদে অবতরণ করে। সঙ্গে সঙ্গেই এটি ঘিরে ফেলে সৌদি পুলিশ সদস্যরা। একদল পুলিশ সদস্য বিমানে উঠে হারিরি’র মোবাইল ফোনটি জব্দ করে। সরিয়ে ফেলা হয় তার দেহরক্ষীদের। পরদিন শনিবার ইরান ও হিজবুল্লাহ’র পক্ষ থেকে নিজের প্রাণনাশের হুমকির কথা জানিয়ে তিনি লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। এরপর থেকেই তিনি নিমজ্জিত হয়েছেন পিনপতন নিরবতায়। এরপর সর্বশেষ রবিবার রাতে কিছু সময়ের জন্য তাকে টেলিভিশনে দেখা যায়।

লেবাননের ফিউচার টিভিতে সম্প্রচারিত এক ভাষণে সাদ হারিরি বলেন, রিয়াদে আমি নিজের ইচ্ছায় মুক্ত অবস্থায় আছি। আমাকে কেউ বন্দি করে রাখেনি।

টেলিভিশনে হারিরি’র ওই ভাষণ সম্প্রচারের পরও তাকে নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না তার লেবানিজ সহযোগীদের। দেশটির কর্মকর্তারা বলছেন, হারিরি’কে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য করার পর তাকে এখন সৌদি আরবে আটক রাখা হয়েছে। একই রকম কথা বলছেন, লেবাননের জোট সরকারের শরিক শিয়াপন্থী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ।

আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ি এবং সালমান বিন আবদুলআজিজ

হাসান নাসরুল্লাহ’র ভাষায়, ‘ফিউচার পার্টি’র প্রধান ৪৭ বছর বয়সী প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি’কে সৌদি আরবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার সঙ্গে কাউকে যেতে দেওয়া হয়নি। রিয়াদে যাওয়ার পর তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। তারা এখন লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীকে বলপূর্বক আটকে রেখেছে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মারাত্মকভাবে হস্তক্ষেপ করেছে। লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে সৌদি আরব।’

তিনি বলেন, সাদ হারিরি যে ভাষায় পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন তা থেকে পরিষ্কার হয় যে, তাকে এসব বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

হাসান নাসরুল্লাহ বলেন, ‘লেবাননে সামরিক আগ্রাসন চালাতে সৌদি আরব ইহুদিবাদী ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা কোটি কোটি ডলার খরচ করতে প্রস্তুত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হিজবুল্লাহ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধের অজুহাতে সৌদি আরব লেবাননকে ধ্বংস করতে চায়। এই সৌদি আরবই ছিল ২০০৬ সালে হিজবুল্লাহ-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রধান কারিগর।’

এখন সাদ আল হারিরি’র পদত্যাগের ঘোষণায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নাম উঠে আসছে। কারণ লেবাননকে ইরানবিরোধী ‘ছায়াযুদ্ধের নাট্যমঞ্চ’বানিয়ে সৌদি আরবের এ খেলা প্রত্যক্ষ করার আগেই দৃশ্যপটে আসে সৌদি রাজপরিবারের সদস্য ও দেশটির শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীদের ধরপাকড়ের বিষয়টি। ৪ নভেম্বর রাতে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নির্দেশে রাজপরিবারের অন্তত ১১ সদস্যকে আটক করা হয়। এ পর্যন্ত আটকের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়েছে। এই ধরপাকড়ের মধ্যেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন সৌদি সফররত লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী সাদ আল-হারিরি। ফলে রাজপরিবারের বিষয়টিকে সৌদি যুবরাজের আঞ্চলিক রাজনীতির খেলা হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তারা বলছেন, যুবরাজ একইসঙ্গে রাজপরিবার ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করতে কাজ শুরু করেছেন। এটা তারই ধারাবাহিকতা মাত্র।

বিশ্লেষকরা বলছেন, লেবানিজ প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য করার মাধ্যমে সৌদি আরবের ইরানবিরোধী খেলায় একটি নতুন মাত্রা যোগ করতে চাইছেন সৌদি যুবরাজ। লেবাননে ইরানের প্রভাববলয় গুঁড়িয়ে দিতে চাইছেন তিনি।

লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটি’র পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইমাদ সালামি। আল জাজিরা’কে তিনি বলেন, লেবাননে সুন্নি মুসলিমদের সম্পর্কের ব্যাপারে সৌদি আরবের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। সম্ভবত এখানে তারা একটি নতুন ফ্রন্ট খুলবে।

লেবাননে সৌদি আরবের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নতুন। সদ্য পদত্যাগের ঘোষণা দেওয়া প্রধানমন্ত্রী সাদ আল হারিরি’সহ দেশটির ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকদের সঙ্গে রিয়াদের ঘনিষ্ঠতা অনেক পুরনো বিষয়।

অধ্যাপক ইমাদ সালামি বলছেন, হিজবুল্লাহ’র বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরব তার প্রভাবশালী লেবানিজ বন্ধুদের ব্যবহার করেনি। বর্তমান সৌদি যুবরাজের কাছেও হয়তো বিষয়টি লাভজনক বা ফলপ্রসূ মনে হবে না। নিজ দেশে কথিত দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে লোকজনকে আটক করে তিনি আসলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান। এ কারণেই সৌদি আরবে যখন ধরপাকড় চলছে; একই সময়ে দেশটি সফরে গিয়ে লেবানিজ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন।

পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের এই শিক্ষক মনে করেন, সৌদি যুবরাজ তার ক্ষমতা কুক্ষিগত করার বিষয়টি শুধু নিজ দেশে সীমাবদ্ধ রাখতে চাইছেন না। সীমান্তের বাইরেও তিনি নিজের ক্ষমতাবলয়কে ছড়িয়ে দিতে চান।

সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন ও লিবিয়ায় ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রক্সি যুদ্ধে তাই নিজের সামরিক সক্ষমতার ওপর ভর করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। সূত্র: আল জাজিরা।



Contact
reader@banginews.com

Bangi News app আপনাকে দিবে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা যা আপনি কাগজের সংবাদপত্রে পাবেন না। আপনি শুধু খবর পড়বেন তাই নয়, আপনি পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে উপভোগও করবেন। বিশ্বাস না হলে আজই ডাউনলোড করুন। এটি সম্পূর্ণ ফ্রি।

Follow @banginews